kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জন্মদিনেই বাসচাপায় মৃত্যু

চালক, সহকারী ও সুপারভাইজার গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চালক, সহকারী ও সুপারভাইজার গ্রেপ্তার

রাজধানীর রামপুরায় বাসচাপায় নিহত শিক্ষার্থী মাঈনুদ্দিনের মরদেহ গতকাল ঢাকা মেডিক্যালের মর্গ থেকে বের করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর মা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ছেলেটার ছিল আজ জন্মদিন। দিনভর লেগে ছিল মুখে হাসি। রাতে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় কিছু টাকা চেয়েছিল। আমি ১০ টাকা দিই।

বিজ্ঞাপন

আমার বুকের ধন তাতেই খুশি। বলি, দ্রুত বাসায় ফিরে এসো। বলেছিল, চিন্তা কোরো না বাবা, ফিরে আসব। কিন্তু আর ফিরল না। ’ রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বাসচাপায় ছেলে মো. মাঈনুদ্দিনের (১৯) মৃত্যুর খবর শুনে  এভাবেই প্রলাপ বকছিলেন চায়ের দোকানি বাবা আব্দুর রহমান ভাণ্ডারি।

মাঈনুদ্দিনকে ঘিরে ছিল সব কিছু। বড় ছেলে লেখাপড়া করেনি, তাই ছোট ছেলেকে নিয়ে পরিবার বুনেছিল স্বপ্নবীজ। লেখাপড়াই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। পরিবারের দরিদ্রতা তার সামনে বাধা হতে পারেনি। ভবিষ্যতে চাকরি করে পরিবারের নাটাই হাতে নেওয়ার দুরন্ত সাহস দেখাত ছেলেটি।

কান্নার রোল তুলে মাঈনুদ্দিনের চাচাতো ভাই বাদশা বলছিলেন, ‘ছেলেটি ছিল পরিবারের ভরসা, কারো পরিবারে যেন এমন অন্ধকার নেমে না আসে। ’

গত সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে পূর্ব রামপুরার মোল্লাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় মাঈনুদ্দিনের স্বজন ও প্রতিবেশীদের আর্তনাদ আর আহাজারি। এ সময় আশপাশের অনেকেই বলছিলেন, ‘এত ভালো ছেলেটাকে এভাবে পিষে মারল বাস!’

কয়েক মাস আগে মাঈনুদ্দিন নিজের ফেসবুকে লিখেছিল, ‘ঠিক ততটা আঁধারে হারিয়ে যাব, যতটা অন্ধকারে হারালে কেউ সন্ধান পাবে না। ’

ঠিকই সে হারিয়ে গেল, যেখান থেকে ফিরবে না আর কখনো। রাজধানীতে অনাবিল পরিবহনের একটি বাসের চাপায় সোমবার রাত পৌনে ১১টার দিকে মাঈনুদ্দিন নিহত হয়। রামপুরা বাজারের সামনের এ ঘটনার জের ধরে রাতেই ওই সড়কের ১২ গাড়িতে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এর ঝাঁজ লেগে থাকে ওই এলাকায়।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঈনুদ্দিনের জন্ম ২০০২ সালের ২৯ নভেম্বর। গত সোমবার ছিল তার জন্মদিন। আর এই দিনেই বাসচাপায় সে চলে গেল অনন্তলোকে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে মাঈনুদ্দিন ছিল সবার ছোট। সে এ বছর স্থানীয় একরামুন্নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আব্দুল আহাদ জানান, এ ঘটনায় মাঈনুদ্দিনের মা রাশেদা বেগম গতকাল বাদী হয়ে অনাবিল পরিবহনের ওই চালকের বিরুদ্ধে রামপুরা থানায় মামলা করেছেন। সড়ক পরিবহন আইনের ১০৫ ধারায় মামলাটি হয়েছে। মামলায় আসামির নাম উল্লেখ করা না হলেও তাঁর ছেলে নিহত হওয়ার ঘটনায় অনাবিল পরিবহনের একটি নির্দিষ্ট নম্বরধারী বাসের চালককে দায়ী করা হয়েছে। এ ঘটনায় চালক সোহেল, সুপারভাইজার গোলাম রব্বানী ওরফে বিন রহমান ও চালকের সহকারী চান মিয়াকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চালকের সহকারী চান মিয়া র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, গাড়ির অতিরিক্ত গতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, ওই ঘটনায় ১২টি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবগুলো বাসই আগুনে পুড়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, অনেকগুলো বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। রাস্তা থেকে আমরা ছেলেটির লাশ উদ্ধার করি। ’

ঘরজুড়ে আর্তনাদ : বেঁচে থাকতে একটি ভালো কলেজে পড়ার ইচ্ছা ছিল মাঈনুদ্দিনের। পরীক্ষা ভালো হয়েছে বলে বাবার কাছে আবদার করে বলেছিল, ‘আমি ভালো কলেজে পড়তে চাই। ’ গত সোমবার দুপুরে একসঙ্গে ভাত খেতে বসে বাবাকে এভাবেই নিজের মনের কথা বলে সে। বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘আমি গরিব, ভিক্ষা করে হলেও তোকে পড়াব বাবা। ’

মৃত্যুর পর মাঈনুদ্দিনের পকেটে ছিল চার টাকা। তাই দেখে বাবা বলেন, ‘ছেলে আমার অনেক হিসাব করে চলত। ’ তখন পাশেই কেঁদে কেঁদে মা রাশেদা বেগম আর্তনাদ করছিলেন। বলে ওঠেন, ‘আমার ছেলেটাকে বড় করতে চেয়েছিলাম। পড়াশোনা করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একি সর্বনাশ হয়ে গেল। ছেলেটা জন্মদিনেই মারা গেল। ’

এ সময় পাশেই ছিল মাঈনুদ্দিনের বন্ধু মারুফ ইসলাম। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘রাস্তা পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতির বাসটি মাঈনুদ্দিনকে চাপা দেয়। আমরা চালকের বিচার চাই। ’

আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যায় সরাইলের হালুয়াপাড়ার নানার বাড়ির কবরস্থানে মাঈনুদ্দিনের লাশ দাফন করা হয়। এর আগে বিকেল ৫টায় গ্রামে পৌঁছায় তার লাশ।

মাঈনুদ্দিনের ভাতিজা রায়হান আলম বলে, ‘সে আমার সমবয়সী। বাড়িতে এলেই একসঙ্গে ঘুরতাম। সড়ক দুর্ঘটনায় আমি আহত হয়েছি শুনে সে আমাকে ফোন দেয়। আজ সে নিজেই চলে গেল। ’

 



সাতদিনের সেরা