kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চলে গেলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম

ছিলেন জাতিসত্তার অনন্য ঠিকানা

বিশ্বজিৎ ঘোষ

১ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ছিলেন জাতিসত্তার অনন্য ঠিকানা

রফিকুল ইসলাম। জন্ম : ১ জানুয়ারি ১৯৩৪, মৃত্যু : ৩০ নভেম্বর ২০২১

রফিকুল ইসলাম। ভাষাসংগ্রামী রফিকুল ইসলাম। জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। দীর্ঘ ৫০ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

আমাদের সংস্কৃতির, আমাদের সাহিত্যের, আমাদের জাতিসত্তার অনন্য এক ঠিকানা রফিকুল ইসলাম। আজ এই বিপন্ন মুহূর্তে স্যারকে নিয়ে কিছু লিখতে আমার কলম চলছে না। গত ১৯ নভেম্বরই যাঁর কাছে লেখার জন্য ফোনে অনুরোধ করেছি, খানিকটা কথা বলেছি—সেই স্যারকে নিয়ে লিখতে বসে আজ আমার কলম থেমে গিয়েছিল। তবু এটা অমোঘ সত্য, স্যার আর নেই আমাদের সঙ্গে—কিংবা আছেন আরো গভীরভাবে পরোক্ষভাবে আমাদের প্রতিদিনের সংগ্রামে।

রফিকুল ইসলামের বহুমাত্রিক কৃতির মধ্যে প্রথমেই মনে আসে ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তাঁর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার কথা। ক্যামেরা নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত দিনে তিনি যেসব ছবি তুলেছেন—তা এখন আমাদের গৌরবের অংশ। শুধু আমাদের বলি কেন, তা তো আজ বিশ্বমানবেরই গৌরবের উৎস। এখন যত ছবি আছে রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক, তার প্রায় ৭০ শতাংশ ছবিই রফিকুল ইসলামের ক্যামেরায় তোলা। বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রফিকুল ইসলাম তখন ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। এসব ভূমিকার কারণে ১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট তাঁকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম অত্যাচার করে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তিনি মুক্তিলাভ করেন। উত্তরকালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একাধিক বই রচনা করেন রফিকুল ইসলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৫০ বছর শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত ছিলেন রফিকুল ইসলাম। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগকে গড়ে তুলতে তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দীর্ঘকাল ছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। আমৃত্যু বাংলা একাডেমির সভাপতি। জাতির ক্রান্তিকালে রফিকুল ইসলাম সব সময় সামনে থেকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নজরুল বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর খ্যাতি উভয় বাংলায়। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে রফিকুল ইসলামের গবেষণা সঞ্চার করেছে অনন্য মাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নজরুলকে সমাধিস্থ করার ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রফিকুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নজরুল অধ্যাপক, ছিলেন নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক। তাঁর তত্ত্বাবধানে নজরুল বিষয়ে গবেষণা করে ১০ জন গবেষক এমফিল/পিএইচডি উপাধি পেয়েছেন। নজরুলের গানের স্বরলিপি বিন্যাসেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাতত্ত্ব, বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ—এসব বিষয়ে তাঁর গ্রন্থগুলো পণ্ডিতসমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘বাংলা ব্যাকরণ’ গ্রন্থ রচনায় তিনি পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

রফিকুল ইসলাম ছিলেন ব্যতিক্রমী এক সংগঠক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভিন্ন অনুষ্ঠান উদযাপন, বাংলা অ্যালামনাইয়ের অনুষ্ঠান—এসব ক্ষেত্রে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কথা আমাদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বাংলা বিভাগের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি পালন করে গেছেন ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

আলোকিত মানুষ রফিকুল ইসলাম আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আছে তাঁর কর্ম, তাঁর সংগ্রামী জীবনকথা, আছে তাঁর অমূল্য গ্রন্থরাজি। রফিকুল ইসলামের জীবনদর্শন ও সংগ্রামের পথ ধরে গণতান্ত্রিক মানবিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে শামিল হওয়াই হবে তাঁর প্রতি সম্মান দেখানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। যেখানেই থাকবেন, ভালো থাকবেন আমাদের প্রিয় স্যার।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 



সাতদিনের সেরা