kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

মনোনয়ন গলদে নৌকার বড় হার

তৈমুর ফারুক তুষার   

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মনোনয়ন গলদে নৌকার বড় হার

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বড় ধরনের হারের পেছনে প্রধান কারণ হলো জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়া। আবার যাঁরা মনোনয়ন পেয়েছেন তাঁদের অনেকের প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় বিভেদও পরাজয়ের একটা কারণ। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, তৃণমূল নেতাদের সুপারিশেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।    

গত রবিবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৪৮ শতাংশ প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। নৌকা প্রতীকের কিছু প্রার্থী জামানতও হারিয়েছেন। যেমন : পিরোজপুরের কাউখালীর সয়না রঘুনাথপুর ইউপিতে ১২০ ভোট এবং কক্সবাজারের চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউপিতে ৯৯ ভোট পেয়ে নৌকার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

নোয়াখালীর সেনবাগে একটি ইউনিয়নেও জয় পায়নি আওয়ামী লীগ। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে নৌকার হার হয়েছে। গাজীপুরে নিজেদের ব্যাপক জনসমর্থন আছে দাবি করে থাকেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেই গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এক পৌরসভা ও সাত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মাত্র একটি ইউপিতে নৌকা জিতেছে। ওই ইউপি চেয়ারম্যান আবার জিতেছেন বিনা ভোটে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার ১৪ ইউপির ১১টিতে নৌকা হেরেছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন উপজেলার ১৫ ইউপির মধ্যে ১৪টিতেই নৌকার পরাজয় হয়েছে। আরো অনেক উপজেলায় এমন ভরাডুবির ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর আওয়ামী লীগ নেতারা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রার্থী মনোনয়নে গলদের কারণে নৌকা হারছে। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। মনোনয়ন বোর্ডের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রাখেন এমন নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা মনোনয়নকে প্রভাবিত করছেন। বিশেষ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও প্রভাবিত হয়েছে। এতে এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ নেই এমন ব্যক্তিরাও নৌকা প্রতীক পেয়েছেন। এ কারণে তৃণমূলের জনপ্রিয়, পরীক্ষিত নেতাদের একটা বড় অংশ মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিতেও এসেছেন।

তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের তালিকাকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উপজেলা বা ইউনিয়ন কমিটির প্রস্তাবিত নামের তালিকায় যাঁরা এক নম্বরে থাকেন আমরা তাঁদেরই মনোনয়ন দিই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনোনয়ন বোর্ডের একজন সদস্য বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, প্রভাবশালী কোনো নেতা বা মন্ত্রী যোগ্য কারো জন্য সুপারিশ করেছেন, কিন্তু মনোনয়ন বোর্ডে তাঁর মূল্যায়ন হয় না। বিশেষ কোনো কারণে মনোনয়ন দেওয়া হয় কম জনপ্রিয় ব্যক্তিকে।

কালিয়াকৈর পৌরসভায়ও গত রবিবার নির্বাচন হয়েছিল। সেখানে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজিবুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। রেজাউল ২০১১ সালে পৌর নির্বাচনেও পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ২০১৪ সালে কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ওই পদে পরাজিত হন। তাঁকেই এবার পৌরসভায় মেয়র পদপ্রার্থী করা হয় এবং তিনি হেরে যান।

স্থানীয় নেতারা জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে রেজাউলের দূরত্ব রয়েছে। মন্ত্রীর কর্মী ও সমর্থকদের কাছে রেজাউল গ্রহণযোগ্য নেতা নন। ভোটে তার প্রভাব পড়েছে।  

কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুরাদ কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। আমাদের নেতাকর্মীরা বলেন, ‘এই নৌকা সেই নৌকা নয়, আমরা পছন্দের লোককে ভোট দেব।’ এই নির্বাচনে আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা, প্রার্থীর ভাবমূর্তিসহ নানা বিষয় কাজ করে।”

পঞ্চগড় সদর ও আটোয়ারী উপজেলার ১৫ ইউপির ৯টিতেই নৌকার হার হয়েছে। জানতে চাইলে পঞ্চগড় সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোথাও কোথাও আমরা যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারিনি। যদি যোগ্য ও জনপ্রিয়দের মনোনয়ন দিতে পারতাম তাহলে নৌকা জয়ী হতো।’

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে একটিতে নৌকা জয় পেয়েছে। তিনটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন।

নৌকার পরাজয় প্রসঙ্গে কোটচাঁদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাঁরা সবাই বর্তমান চেয়ারম্যান। দল ক্ষমতায় থাকলেও তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকেননি। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যখন প্রার্থীর তালিকা চেয়েছিলেন, তখন জেলা আওয়ামী লীগ তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রে পাঠায়। আমাদের মতামত নেওয়া হয়নি।’

নোয়াখালীর সেনবাগে একটি পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একটিতেও জয় পাননি আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। জানতে চাইলে সেনবাগ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আমরা যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারিনি। নৌকার পরাজয়ের পেছনে এটিই বড় কারণ।’

নওগাঁর মান্দা উপজেলায় পরাজয়ের বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন মণ্ডল বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগি হয়েছে। তাই দলীয় প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে। এ ছাড়া আরো কিছু কারণ আছে।

পিরোজপুরের কাউখালীর সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কাউখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘সয়না রঘুনাথপুর ইউপি বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী দুর্বল হওয়ায় ভোট কম পেয়েছেন। আমরা কেন্দ্রে পাঠানো প্রার্থী তালিকায় কাজী রফিকুল ইসলামের নাম সবার আগে রেখেছিলাম। খোকনের নাম ছিল দ্বিতীয়। কিন্তু দল কাজী রফিকুল ইসলামকে মনোনয়ন না দিয়ে খোকনকে মনোনয়ন দেয়।’

সার্বিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তো চেষ্টা করছি। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। আসলে একেক জায়গায় একেক কারণে নৌকার পরাজয় হয়েছে। হারের পেছনে কোনো একক প্রবণতা চোখে পড়ছে না।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আমাদের পঞ্চগড় ও ঝিনাইদহ প্রতিনিধি।]

 



সাতদিনের সেরা