kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

ভাগ্যান্বেষণে সৌভাগ্যের চট্টগ্রামে বাংলাদেশ

মাসুদ পারভেজ, চট্টগ্রাম থেকে   

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাগ্যান্বেষণে সৌভাগ্যের চট্টগ্রামে বাংলাদেশ

সাফল্যও যে সর্বনাশা হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম ইতিহাসেই ঢুকে পড়েছে এক রকম। সেখানকার ধীরগতির অসমান বাউন্সের স্পিন সহায়ক উইকেটে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে হারানো যে বাংলাদেশ দলে ভুল বিশ্বাসের বার্তাই ছড়িয়েছিল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর তা নিয়ে দ্বিমত করার লোকও খুঁজে পাওয়া যায় না তেমন। বিশ্বকাপের পর সেই মিরপুরেই আবার ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা। তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও পাকিস্তানের কাছে বিধ্বস্ত।

তবে আজ যখন পাকিস্তান ম্যাচ দিয়েই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসর শুরু করতে চলেছে বাংলাদেশ, তখন সর্বনাশের ভিত্তিভূমি মিরপুর ছেড়ে বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমিতে সৌভাগ্যের আশায় মমিনুল হকরা। এমন নয় যে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী  স্টেডিয়ামেও স্পিন উপযোগী উইকেট বানিয়ে পাল্টা বিপদে পড়ার দুর্ঘটনা ঘটেনি। তা কিছু কিছু ঘটলেও এখানকার উইকেট আবার মিরপুরের মতো প্রায় সব সময়ই ব্যাটারদের জন্য বধ্যভূমিও নয়।

চাইলে এখানকার উইকেটও অনেকটা ব্যাটিং উপযোগী করা যায়। তাতে স্বাগতিক দলের ব্যাটারদের ব্যাটেও রানের প্রবাহ আসে। আর পাকিস্তানের ব্যাটাররাও স্পিন খুব ভালো খেলেন বলে এবার ব্যাটিং সহায়ক উইকেটের চাহিদাপত্রই যে দিয়ে ফেলেছেন মমিনুল হক, সেটিও তাঁর কথা থেকে অনুমান করে নিতে সমস্যা হয় না, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে খুব ভালো ব্যাটিং উইকেটই হবে। আপনারা তো জানেনই যে চট্টগ্রামের উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য ভালোই হয়।’

ভালো যে হয়, এর উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়কও এসে যান সবার আগেই। নিজের ১১টি টেস্ট সেঞ্চুরির সাতটি তো আর মমিনুল এই মাঠে এমনি এমনি করে ফেলেননি। তাই টানা ব্যর্থতায় ঘুরপাক খেতে থাকা দলের হাল টেস্ট সিরিজে ধরতে এসে তাঁর মুখেও ফুটে ওঠে হালকা হাসির রেখা। কিন্তু সমস্যা হলো টেস্টে ভালো কিছু করার আগ পর্যন্ত গত কিছুদিনের বাজে পারফরম্যান্সই এত বেশি দৃশ্যমান যে বাবর আজমের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হওয়া পাকিস্তানি সাংবাদিকরা তা নিয়েই পড়ে থাকতে চাইলেন। কেউ কেউ দুই টেস্টের এই সিরিজটিকে উর্দুতে ‘আম সিরিজ’ অর্থাৎ সহজ সিরিজ বলতেও দ্বিধা করলেন না।

পাকিস্তান অধিনায়ক অবশ্য তা মানলেন না। টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচটিতে বাংলাদেশের প্রায় জিততে জিততেও না জেতার প্রসঙ্গ কেউ একজন তুলতেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেনই না শুধু, বলেও রাখলেন যে ‘পার্থক্য এখানে কন্ডিশন। ওদের ঘরের মাঠ, নিজেদের কন্ডিশন। ওদেরকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। ওদের কয়েকজন ক্রিকেটার নেই, দলটি তরুণ। তবে যারা আছে, এই কন্ডিশনেই তো খেলে। আমাদের জন্য কাজটি তাই কঠিনই হবে। ওরা অবশ্যই আমাদের কঠিন সময় দিতে পারে।’

কঠিন সময় উপহার দেওয়ার লক্ষ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশকে একই সময়ে আবার দলের পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। এবং সেটি বাধ্য হয়েই। চার মাস আগেই টেস্ট থেকে অবসর নেওয়া মাহমুদ উল্লাহকে পাওয়া যাবে না, সেটি জানা ছিল। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ঘনিয়ে আসতে আসতে চোটে ছিটকে পড়েছেন তামিম ইকবাল আর সাকিব আল হাসানও। দারুণ বোলিং করতে থাকা পেসার তাসকিন আহমেদও যখন খেলতে পারছেন না, তখন হুট করে অভিজ্ঞ বাংলাদেশ পরিণত তারুণ্যনির্ভর এক দলেই।

এই দল নিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নামার আগে যেন দিশাহারা টিম ম্যানেজমেন্ট আর নির্বাচকরাও। পাকিস্তান শিবির যেখানে এই টেস্টের জন্য কলেবর কমিয়ে গতকাল দুপুরেই ১২ জনের দল ঘোষণা করে দিয়েছে, সেখানে জৈব সুরক্ষা বলয়েই থাকা দুই পেসার খালেদ আহমেদ ও শহীদুল ইসলামকে সন্ধ্যায় মূল দলের সঙ্গে যোগ করে নিয়েছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে দলে এখন পাঁচজন পেসার। এঁদের মধ্যে একাদশে আবু জায়েদ রাহির সঙ্গে বড়জোর আর একজনেরই সুযোগ পাওয়ার কথা। সঙ্গে দুজন স্পিনার যোগ করে বোলিং আক্রমণও চারজনের বেশি হওয়ার কথা নয়। কারণ অভিজ্ঞ একাধিক ব্যাটারকে হারিয়ে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের গভীরতা বাড়াতে চাইবে স্বাভাবিক।

সাতজন বিশেষজ্ঞ ব্যাটারের একজন হিসেবে আজ মাহমুদুল হাসান জয়েরও টেস্ট অভিষেক হয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা। গত দুই দিনের অনুশীলনে কোচদের তাঁকে নিয়ে পড়ে থাকা সে রকমই বুঝিয়েছে। সাদমান ইসলামের সঙ্গে সাইফ হাসান নন, তাঁরই ওপেন করার সম্ভাবনা আরো বাড়িয়েছেন ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্স। গতকাল গ্রানাইট পাথরের স্ল্যাবে এই তরুণকে ক্রমাগত শর্ট বল খেলানোর অনুশীলন করিয়ে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ। অধিনায়ক মমিনুলও দলে এই টপ অর্ডার ব্যাটারের ভূমিকাটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন এভাবে, ‘ব্যাকআপ ওপেনার হিসেবেই নেওয়া হয়েছে ওকে। যদি সে খেলে, তাহলে ওপেনিংয়েই খেলবে।’

খেললে এমন সময়ে খেলবেন, যখন দলের বাজে পারফরম্যান্স নিয়ে চারদিক সমালোচনামুখর। এই সময়ে নিজেদের মধ্যে ডুবে যাওয়াতেই সমাধান দেখেন মমিনুল, ‘দিন শেষে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়া উচিত। বাইরের কথা বা মানুষের মুখ আপনি বন্ধ করতে পারবেন না। তবে নিজের কান আপনি বন্ধ রাখতে পারবেন।’

কান বন্ধ রেখে ভালো করার লক্ষ্যে আছে সর্বনাশের ভিত্তিভূমি মিরপুর ছেড়ে আসার স্বস্তিও!

 



সাতদিনের সেরা