kalerkantho

রবিবার । ৯ মাঘ ১৪২৮। ২৩ জানুয়ারি ২০২২। ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কুমিল্লায় কাউন্সিলর খুন

তিন কারণ মাথায় রেখে তদন্তে পুলিশ

কুমিল্লা সংবাদদাতা   

২৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তিন কারণ মাথায় রেখে তদন্তে পুলিশ

কার্যালয়ে ঢুকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ সোহেল এবং তাঁর সহযোগীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সুমন নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাতে ১১ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আটজনকে আসামি করে নিহত সোহেলের ভাই মো. রুমন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দু-এক দিনের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যাবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মামলায় প্রধান আসামি পাশের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সুজানগর পূর্বপাড়া বউবাজার এলাকার মৃত জানু মিয়ার ছেলে শাহ আলম (২৮)।

বিজ্ঞাপন

অন্য আসামিরা হলেন নবগ্রাম এলাকার সোহেল ওরফে জেল সোহেল (২৮), সুজানগর পানির ট্যাংক এলাকার মো. সাব্বির হোসেন (২৮), সংরাইশ এলাকার সাজন (৩২), সুজানগর পূর্বপাড়া বউবাজার এলাকার সুমন (৩২), তেলিকোনা এলাকার আশিকুর রহমান ওরফে রকি (৩২), সুজানগর পূর্বপাড়া এলাকার আলম (৩৫), জিসান মিয়া (২৮), সংরাইশের মাসুম (৩৯), নবগ্রামের সায়মন (৩০) এবং সুজানগরের রনি (৩২)।

কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) কমল কৃষ্ণ ধর বলেন, ‘শাহ আলমের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। তবে আমরা এ পর্যন্ত ছয়টি মামলার খোঁজ পেয়েছি। বাকিগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সব আসামির বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ’

গত সোমবার বিকেলে অন্তত ১০ জন কালো মুখোশধারী সন্ত্রাসী ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে ঢুকে উপর্যুপরি গুলি করে সোহেল ও হরিপদ সাহাকে হত্যা করে। এ ছাড়া পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। তাঁরা কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মঙ্গলবার করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিরা এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী। সবাই একাধিক মামলার আসামি। কাউন্সিলর সোহেল পর পর দুইবার নির্বাচিত হয়ে মাদক কারবার ও সন্ত্রাস বন্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় আসামিরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে কার্যালয়ে ঢুকে গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন আওয়ামী লীগ নেতা হরিপদ সাহা।  

পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই দুই হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে এখন তিনটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। এগুলো মাদক কারবারে বাধা, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রধান আসামির সঙ্গে সোহেলের বিরোধ এবং সামনের সিটি করপোরেশন নির্বাচন।

পুলিশসহ স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেন্দ্র করে কাউন্সিলর সোহেলকে হত্যা করা হতে পারে। দুইবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর সোহেল এবারও দলীয় সমর্থন পাচ্ছেন—এটি অনেকটা নিশ্চিত। তদন্তে এই বিষয়ও মাথায় রাখছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে জয়ী হন মো. সোহেল। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ তিনি কাউন্সিলর হন। এ সময়ে তিনি ১৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, দলের মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য এবং প্যানেল মেয়র-২ নির্বাচিত হন।

গতকাল বিকেলে মামলার বাদী সৈয়দ মো. রুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, যেভাবে খুনিরা তাঁর ভাইকে হত্যা করেছে, তাতেই বোঝা যায় ঘটনাটি গভীর পরিকল্পনার অংশ। মামলার আসামিরা সবাই শাহ আলম গ্রুপের সদস্য। তারা চিহ্নিত মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী। নির্বাচন সামনে রেখে কোনো পক্ষ তাদের দিয়ে খুন করাতে পারে। তিনি আরো বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, খুনিদের পেছনে বড় কেউ আছে, নইলে হত্যাকাণ্ডে খুনিরা এত অস্ত্র পেল কোথায়?’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলে, প্রায় ১০ বছর আগে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শাহ আলমের বাবা জানু মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে এক সন্ত্রাসী। এ ঘটনার কয়েক দিন পর শাহ আলম ওই ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেন। ২০১৫ সালে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে শাহ আলমের পায়ে গুলি লাগে। তিনি একসময় জামায়াতের রাজনীতি করলেও এখন নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা বলেই পরিচয় দেন। তবে দলে তাঁর পদ-পদবি নেই।

এলাকার বাসিন্দা মো. রাসেল, মহিউদ্দিসহ কয়েকজন বলেন, শাহ আলমের সঙ্গে কাউন্সিলর সোহেলের ঘনিষ্ঠদের সাম্প্রতিক একটি বিরোধ আলোচনায় এসেছে। শাহ আলমের বন্ধু মামলার ৩ নম্বর আসামি সাব্বিরের সঙ্গে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক নারীর অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কিছুদিন আগে গভীর রাতে সাব্বির ওই ওয়ার্ডে গেলে এলাকাবাসী তাঁকে চোর আখ্যা দিয়ে ধাওয়া করে। শাহ আলম এসে তাঁকে রক্ষায় দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। ঘটনাটি পুলিশ ও গণমাধ্যমকে জানান সোহেল। এর জের ধরে সপ্তাহখানেক আগে দুই পক্ষে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। তখনো গুলি ছোড়েন শাহ আলম। এ ছাড়া সোহেল ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হলেও তিনি শাহ আলমের ওয়ার্ডের বিচার-সালিসসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। এসব কারণে সোহেলের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন শাহ আলম।

কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনওয়ারুল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শাহ আলমসহ মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। মামলা করা হয়েছে। নির্বাচন, মাদক কারবার, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার—সব কিছু মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত হত্যার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ’

দু-এক দিনের মধ্যে  কারণ জানা যাবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) এক সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘পুলিশ বাহিনী চেষ্টা করছে। আশা করছি, আমরা আজ-কালের মধ্যে সব রহস্য উদ?ঘাটন করতে পারব। ’

মন্ত্রী বলেন, ‘সব অপরাধের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। সে অনুযায়ী আমরা পুলিশ বাহিনীকে তৈরি করছি। এনটিএমসিকেও আমরা সেভাবে তৈরি করছি। সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে এনটিএমসি আরো শক্তিশালী হবে। ’

একজন গ্রেপ্তার

কাউন্সিলরের কার্যালয়ে ঢুকে জোড়া খুনের ঘটনায় করা মামলার ৪ নম্বর আসামি সুমনকে (৩২) গতকাল সকাল ১১টার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সুজানগর পূর্বপাড়া এলাকার মৃত কানু মিয়ার ছেলে।

কোতোয়ালি থানার ওসি মো. আনওয়ারুল আজিম বলেন, আসামি সুমন হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।

হরিপদের মা জানেন না যে ছেলে নেই

আওয়ামী লীগের কর্মী হরিপদ সাহা ঘটনার দিন দুপুরে প্রতিদিনের মতো মাকে খাইয়ে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর সোহেলের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে যান। সেখান থেকে ফিরে তাঁর কার্যালয়ে বিকেলে গুলিতে নিহত হন। গত মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর শেষকৃত্য হয়েছে। তবে হরিপদের শতবর্ষী মা রেণু বালা সাহা এখনো জানেন না যে তাঁর ছেলে বেঁচে নেই। হরিপদের বাড়ি নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপাড়ায়।

পরিবার সূত্র জানায়, শতবর্ষী রেণু বছর দেড়েক ধরে বিছানায় পড়ে আছেন। হরিপদই ছিলেন মায়ের একমাত্র অবলম্বন। খাওয়াদাওয়া থেকে প্রাকৃতিক কর্ম—সবই তিনি বিছানায় সারেন। হরিপদের বোন ভুলু রানী সাহা বলেন, ‘আমরা এখনো মাকে জানাইনি যে ভাই মারা গেছে। মঙ্গলবার রাতে তার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেছি, হরিপদ বাজারে, কাজে ব্যস্ত আছে। আমরা মাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এখন কে তাঁকে দেখবে?’

 



সাতদিনের সেরা