kalerkantho

শনিবার । ৮ মাঘ ১৪২৮। ২২ জানুয়ারি ২০২২। ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

শতভাগ দিতে চায় বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান   

১৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শতভাগ দিতে চায় বাংলাদেশ

পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টির আগে অনুশীলনে বেশ ফুরফুরেই ছিল তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে একবারই আনন্দের আভা ছড়াল মাহমুদ উল্লাহর চোখেমুখে। গত পরশু বিশ্বকাপ ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমালোচকদের যেভাবে থামিয়েছেন, তাতে আপ্লুত বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘আলহামদুলিল্লাহ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনেক ধন্যবাদ। এটা আমাদের দলের জন্য অনেক ইতিবাচক একটা কথা। আমরা শতভাগের চেয়েও বেশি দেওয়ার চেষ্টা করব।

বিজ্ঞাপন

আজ মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টির আগে অধিনায়কের পক্ষে আরেকটি অনুষঙ্গ আছে—গ্যালারিতে দর্শকের ফেরা। করোনার কারণে প্রায় দুই বছর পর আবার গ্যালারিতে উঠবে ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’ স্লোগান। আপাতত মাঠের বাইরে যা কিছু ইতিবাচকতা মাহমুদদের জীবনে।

আর মাঠের ভেতর পাকিস্তানের ব্যাটার-বোলারদের বিশালাকৃতির ছায়াই শুধু দেখা যাচ্ছে! মিডিয়া সেন্টার প্রান্ত থেকে বল হাতে ছুটে যাচ্ছেন শাহীন শাহ আফ্রিদি, উল্টো দিক থেকে ১৪৫ কিলোমিটার গতির হারিস রউফ। গতির ঝড়ের পর শাদাব খানের লেগস্পিন ঘূর্ণি সামলাতে হবে তরুণদের নিয়ে গড়া মাহমুদের দলের ব্যাটারদের। এরপর বোলারদের পালা। বাবর আজম, মোহাম্মদ রিজওয়ানের পর ব্যাটিং অর্ডারের ৮ নম্বর পর্যন্ত অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনি টি-টোয়েন্টিসুলভ বিস্ফোরক উপাদানও আছে পাকিস্তানের। অতি সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফর্ম বিবেচনায় নিলে সিরিজের শুরুতেই ফল লিখে দেওয়া যায় ৩-০, পাকিস্তানের পক্ষে।

তবে খেলাটা অনিশ্চয়তার ভারী চাদরে ঢাকা ক্রিকেট। সকালেই যদি ক্রিকেটের দিন বোঝা যেত, তাহলে সুপার টুয়েলভের সব ম্যাচ জেতা একমাত্র দল পাকিস্তানের তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা। সেই দলটির অধিনায়ক বাবর আজমকে কিনা এখন ঢাকায় বসে নতুনভাবে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের শোক প্রকাশ করতে হচ্ছে! তাই অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর প্রত্যাশামতো যদি সব বিভাগের সবাই একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, তবে সব হিসাব পাল্টেও দিতে পারে বাংলাদেশ।

সমস্যা হলো, এমন আশাবাদ বাংলাদেশ দল থেকেও শোনা যায়নি। বরং চোটের কারণে অনেক দিন হলো তামিম ইকবাল নেই। একই সমস্যা নিয়ে এখন আমেরিকায় আছেন সাকিব আল হাসান। আর সর্বশেষ মিডল অর্ডার  থেকে মুশফিকুর রহিমকে বাদ দেওয়ায় অভিজ্ঞতার শিখণ্ডী একজনই—মাহমুদ উল্লাহ। স্কোয়াডে ছয়টি পরিবর্তন হয়েছে, তাঁদের মধ্যে চারজন আবার অভিষেকের অপেক্ষায়। সদ্যঃসমাপ্ত বিশ্বকাপ বাদ দিলে ডাক পাওয়া ছয়জনের কেউই এক মাস আগেও নির্বাচকদের টি-টোয়েন্টির ভাবনায় ছিলেন না।

দুটি দলের বর্তমানই নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। করোনাকালের নীরবতা আগেই ভেঙেছে মিরপুরে। সিরিজ উপলক্ষে হাজারো কর্মীর ভিড় যুক্ত হয়েছে গত দুই দিন। পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের বিশাল সব ম্যাটে রঙের আঁচড় পড়ছে। কিন্তু মিরপুরের সবুজ চত্বরের কোথাও বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখছেন না কেউ। সিরিজকেন্দ্রিক কর্মী বাহিনী, সংবাদমাধ্যম—কোনো আউটলেটেই মাহমুদদের জন্য আশাবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি গতকাল। তবে আধাকিলোমিটার দূরের টিকিট কাউন্টারে ঠিকই উপচে পড়া ভিড়, কালোবাজারির খবরও পাওয়া গেছে। আশ্চর্য বৈপরীত্য, নিজ দলের ওপর ভরসা না থাকলেও টিকিটের জন্য হাহাকার আছে!

নিশ্চিতভাবেই এই দর্শকদের অকুণ্ঠ সমর্থনও পাবে বাংলাদেশ দল। প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনের প্রসঙ্গ উঠতেই মাহমুদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষায় একটি বিষয় পরিষ্কার—আরেকটি ‘চান্স’ চাচ্ছেন তাঁরা। সমর্থনের দাবি দল ঘোষণার দিনও করেছিলেন প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন। মাঠে ব্যর্থতার অংশীদার বলেই কিনা, প্রকাশ্যে সমর্থন চাননি মাহমুদ। তবে আজকের গ্যালারির দিকে সমর্থনের জন্য নিশ্চিতভাবেই তাকিয়ে থাকবেন তিনি এবং তাঁর সতীর্থরা।

তবে এটা তো আর ঘোষণার কিছু নেই যে পরিষ্কার ফেভারিটের মুকুট মাথায় সিরিজ শুরু করছে পাকিস্তান। তবু দলটির অধিনায়ক বাবর আজম সংযত, ‘ওরা (বাংলাদেশ) নিজেদের মাঠে খেলবে। তাই হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ’ সেই ‘সুযোগ’ তিনি এতটাই কম মনে করছেন যে সাকিব-তামিম-মুশফিকের অনুপস্থিতিতেও স্বাগতিকদের হৃতশক্তির ভেবে ঝিমিয়ে পড়ছেন না বাবর, ‘যারা আছে, তারাও কম না। এরা সবাই বিপিএলে খেলে। ’

বছর পাঁচেক আগে বিপিএল খেলে গেছেন বাবর আজম। তিনি তো আর জানেন না যে পরের বছরগুলোতে মিরপুরের উইকেট কতটা সংহারী হয়েছে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের ক্রিকেটের জন্য। এই মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ে যা, অস্ট্রেলিয়াও তা-ই! প্রসঙ্গটি ওঠায় বাবর আজমও বাংলাদেশ নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছেন। তবে একই উইকেটে অস্ট্রেলিয়া আর পাকিস্তান যেন সমশক্তির দল নয়, সেটি জানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের টুকটাক খবর রাখা অনুসারীও।

বরং বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর মিরপুরেও স্পোর্টিং উইকেট তৈরির রব উঠেছে। যদিও স্পোর্টিং উইকেটের সঠিক সংজ্ঞা মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটের জানা আছে কি না, সেটি নিয়ে সংশয় দীর্ঘদিনের। আর যদি ধীর এবং উঁচু-নিচু বাউন্সের চরিত্র বদলে ব্যাটার-বোলারদের সমঅধিকারের উইকেটে খেলা হয় আজ তাতেও কি পাকিস্তানের বিপক্ষে বাড়তি কোনো সুবিধা পাবে বাংলাদেশ দল?

বাংলাদেশ অধিনায়ককে প্রায়ই বাড়তি বোঝা বহন করতে হয়। মাঠ এবং মাঠের বাইরের অগুনতি বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। খারাপ সময়ে আরো নতুন সব সমস্যা অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরে অধিনায়ককে। মাহমুদকে যেমন গতকাল জেঁকে ধরেছিল মুশফিকুর রহিম ইস্যু। ম্যাচের আগে এই বিতর্কে হাত না পুড়িয়ে মাহমুদ বলেছেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর ম্যানেজমেন্টের কাউকে করলে ভালো হয়। তবে আমরা ম্যাচে মুশফিককে মিস করব। ’

এই সিরিজে মুশফিক ইস্যুর আয়ু নির্ভর করছে মাহমুদদের নৈপুণ্যের ওপরই। বিশ্বকাপ ব্যর্থতার সমালোচনার গতিপথও বাঁক নিতে পারে প্রশংসায়। টি-টোয়েন্টির মুখোমুখিতে ১০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ দলের কাছে এমন দাবি যদিও বাড়াবাড়ি। তবু মানুষ আশায় বুক বাঁধে। পাওয়ার প্লেতে শাহীন শাহ আফ্রিদির সুইংয়ের ছোবল কিংবা মোহাম্মদ রিজওয়ানের দেশাত্মবোধ এখন একটা ট্রেন্ড। তবে ট্রেন্ড কিন্তু ভাঙেও!

পারবেন মাহমুদ উল্লাহরা এই প্রচলন ভেঙে নতুনের গান গাইতে? নিঃসন্দেহে এটা প্রবল উচ্চাশা। তবে আশা করতে তো সমস্যা নেই। নাকি বিনোদনের টি-টোয়েন্টির ষোলো আনা আস্বাদ নেবেন আজ?

সিদ্ধান্ত যার যার।

 



সাতদিনের সেরা