kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

মাদকাসক্তির কারণে ৯৪ পুলিশ সদস্য চাকরি হারিয়েছেন

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১১ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাদকাসক্তির কারণে ৯৪ পুলিশ সদস্য চাকরি হারিয়েছেন

প্রতীকী ছবি

মাদকাসক্তির কারণে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৯৪ জন সদস্য গত দুই বছরে চাকরি হারিয়েছেন। মাদক কারবারিদের সঙ্গে মেলামেশা, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তির মতো কারণে পুলিশের এই সদস্যরা মাদকে ঝুঁকে পড়েন। ডিএমপি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

পুলিশের নিজস্ব অনুসন্ধানে একে একে ১১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

এরপর অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবে মাদকাসক্তি শনাক্তের পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) করা হয় তাঁদের। তাঁদের বিরুদ্ধে ১০৯টি বিভাগীয় মামলা হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চাকরিচ্যুতির চূড়ান্ত আদেশ হয়েছে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে।

ডোপ টেস্টে অভিযুক্তদের মধ্যে ৮৫ জন কনস্টেবল, ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই), সাতজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), সাতজন নায়েক ও একজন সার্জেন্ট।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো এ বিষয়ে ১৩টি মামলা তদন্তাধীন। সাময়িক আদেশ হয়েছে দুজনের বিরুদ্ধে। দুজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলছে।

এর আগে বিভিন্ন সময় কিছু পুলিশ সদস্য মাদক সেবন বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচ্ছিন্নভাবে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। তবে ডোপ টেস্ট করে মাদকাসক্ত সদস্যদের শনাক্ত করার প্রয়াস আগে দেখা যায়নি। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

ডিএমপি কমিশনার মুহা. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের দায়িত্ব। সেই পুলিশ যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করবে কিভাবে। তাই তালিকাভুক্ত ১১১ পুলিশ সদস্যের মধ্যে মাদকাসক্ত ৯৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, শুরু হয় মাদক সেবন দিয়ে, এরপর হয়ে পড়ে মাদক কারবারি, অতঃপর সহকর্মীদের সঙ্গে নেয়। পরে পেশাদার মাদক কারবারিরা তাদের বন্ধু হয়ে ওঠে। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। এই পদক্ষেপ নেওয়ার পর সরকার এখন আর ডোপ টেস্ট না করে কাউকে চাকরি দিচ্ছে না।

ডিএমপি কমিশনার কালের কণ্ঠকে বলেন, এই শাস্তি দেওয়ার আগে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। যাঁরা নিজেদের শোধরাননি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি ডিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগদান করে বলেছিলাম, মহানগরের কোনো পুলিশ সদস্য যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন, তাঁরা যেন আমার কাছে আসেন। তাঁদের ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। কিন্তু স্বেচ্ছায় কেউ সাড়া দিয়ে আসেননি। এ জন্য ডিএমপি থেকে উদ্যোগ নিয়ে ডোপ টেস্ট করতে হয়েছে। ’

গত বছরের জুলাই থেকে ডিএমপিতে পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট শুরু করা হয়। পর্যায়ক্রমে সন্দেহভাজন সব পুলিশ সদস্যকে ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, মাদকবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে পুলিশের ভাবমূর্তি বাড়ছে। প্রমাণ হচ্ছে, অপরাধ করলে মাফ পাওয়ার সুযোগ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পর্যায়ের এক পুলিশ সদস্য (কনস্টেবল) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে নেওয়া উদ্যোগে আমি খুশি। কয়েকজন মাদকাসক্ত সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীর সুনাম নষ্ট হচ্ছে। ’

আরেকজন এসআই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশ ছাড়া মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। সেই পুলিশ যদি মাদক সেবন করে, মাদক কারবারিদের পক্ষ নেয়, তাহলে মাদক নির্মূল হবে না।  

যেভাবে শুরু : গত বছরের শুরুতে প্রথম দফায় সাতজনের ডোপ টেস্ট করলে বেশির ভাগের ফল পজিটিভ আসে। পরে বিভিন্ন ইউনিটের আরো ১৮ জনের পরীক্ষা করলে একজনের পজিটিভ আসে। এতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সতর্ক হন।

ডিএমপি সূত্র জানায়, মাদকবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর বিভিন্ন সূত্র থেকেও পুলিশের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তের তথ্য মিলতে থাকে। এরপর রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক সিন্ডিকেটের ২১ কারবারিকে গ্রেপ্তার করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্ট থানার কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। কারবারিদের সহযোগিতাকারী হিসেবে প্রথমে শিল্পাঞ্চল থানার এক এসআইয়ের নাম আসে।

এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাসিক অপরাধ সভায় উপস্থিত ডিএমপির ৫০ থানার ওসিদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। সভায় ডিএমপি কমিশনার মাদকের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেন।

যেভাবে তালিকা হচ্ছে : বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে ডিএমপি কমিশনারের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা (ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিসিস ডিভিশন-এনআইডি) পুলিশের মাদক সেবন ও মাদক সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত করতে শুরু করে। পাশাপাশি ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি ইউনিট ও বিভাগের উপকমিশনারদের চিঠি দিয়ে সন্দেহভাজন মাদকাসক্ত সদস্যদের তালিকা করতে বলা হয়। বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের উপকমিশনাররা তালিকা পাঠালে তা যাচাই-বাছাই করে সন্দেহভাজন শতাধিকজনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। পরে তাঁদের ডোপ টেস্ট করানো হয়। জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, পুলিশের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সারা দেশের পুলিশ সদস্যদের এই ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে বাহিনীর মাদকবিরোধী কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সদস্যরা যেন মাদকে না জড়ান সে বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও নিতে হবে।



সাতদিনের সেরা