kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জলবায়ু সম্মেলন-২০২১

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধের ঘোষণা

কুন্তল রায়

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধের ঘোষণা

গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন গেল গতকাল বৃহস্পতিবার। বিকেল সাড়ে ৪টায় যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ২০টিরও বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে তারা কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরাসরি আন্তর্জাতিক সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে। পাশাপাশি তারা নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগে প্রাধান্য দেবে।

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এই ঘোষণায় যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো প্রভাবশালী দেশ ও প্রতিষ্ঠান।

এই ঘোষণার বিশেষ তাৎপর্য আছে, একই সঙ্গে কিছুটা ফাঁকও আছে। এবারই প্রথমবারের মতো কয়লার পাশাপাশি তেল ও গ্যাসে সরকারি বিনিয়োগ বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো। পাশাপাশি এই প্রতিশ্রুতি শুধু ‘আন-অ্যাবেটেড’ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অর্থাৎ যেগুলোতে কোনো কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি নেই।

কার্বন ক্যাপচার হলো সেই প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রে নিঃসৃত কার্বন বায়ুমণ্ডলে মেশার আগেই তা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এই প্রযুক্তি খুবই ব্যয়বহুল।

নতুন এই প্রতিশ্রুতি অনুসারে, বছরে অন্তত ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তিতে যাবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক প্রভাবশালী আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখতে হলে শুধু কয়লা নয়, বরং তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরকারি বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়া জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল ও ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জি-২০ জোটভুক্ত দেশগুলোর সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো বিভিন্ন দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিতে প্রায় ১৮৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। একই সময়ে তারা মাত্র ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে নবায়নযোগ্য শক্তিতে। ২০১৪ সাল থেকে এ খাতে সরকারি অর্থায়ন প্রায় স্থবির হয়ে আছে। আইইএর মতে, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ প্রায় চার ট্রিলিয়ন ডলার হওয়া দরকার।

ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থের ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স প্রগ্রাম ম্যানেজার কেট ডি অ্যানজেলিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ বন্ধ করে দেবে। আমরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই, সেই সঙ্গে আশা করি যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশ তার প্রতিশ্রুতিতে অটুট থাকবে।’

তবে এ ঘোষণায় যোগ দেয়নি আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগকারী সবচেয়ে বড় দেশ জাপান, কোরিয়া ও চীন। জি-২০ জোটের এই তিনটি দেশ বিশ্বের মোট বিনিয়োগের ৪৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে পরিবেশবাদীরা আশা করছেন, খুব শিগগির এসব দেশ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেবে। 

বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাবিষয়ক কর্মজোটের সদস্যসচিব হাসান মেহেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে অভিনন্দন জানাতে চাই, কারণ এর ফলে আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে বায়ুশক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক এখন সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে হতাশার বিষয় হলো জাপান ও চীন এ ঘোষণায় যোগ না দেওয়া। আমরা আশা করছি, তারাও জলবায়ু সংকট নিরসনের অঙ্গীকার অটুট রেখে খুব শিগগির যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দলে যোগ দেবে।’

ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এই যৌথ বিবৃতিতে সই করায় পরিবেশবাদীরা এখন দাবি করছেন, বড় বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)—এদেরও বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ থেকে সরে যাওয়া উচিত। যৌথভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে।



সাতদিনের সেরা