kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত ৩’

নরসিংদী প্রতিনিধি   

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত ৩’

নরসিংদী সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়নের নেকজানপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহতদের স্বজনের আহাজারি। গতকাল জেলা সদর হাসপাতাল চত্বরে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে নরসিংদী সদরের দুর্গম চর আলোকবালীতে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক নারীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ও টেঁটাবিদ্ধ হয়ে ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী আবুল খায়েরসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ জন। এর মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ১০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের সময় কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় তালিল নামের এক ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে আটক করেছে পুলিশ। গত রাত পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় মামলা করেনি। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নরসিংদী সদরের আলোকবালী ইউনিয়নে আগামী বৃহস্পতিবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এর আগে গত ২৮ অক্টোবর নরসিংদীর রায়পুরার দুর্গম চর পাড়াতলী ইউনিয়নে নির্বাচনী সহিংসতায় দুজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গত মঙ্গলবার ওই সংঘর্ষে আহত একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। ইউপি নির্বাচন ঘিরে এ নিয়ে নরসিংদীতেই ছয়জনের প্রাণহানি ঘটল। গতকালের নরসিংদীর ঘটনা নিয়ে সারা দেশে এ পর্যন্ত নিহত হলেন ১৪ জন। এর মধ্যে মাগুরা সদরে চারজন, রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে দুজন, সিলেট ও ফরিদপুরের সালথায় একজন করে রয়েছেন।

নরসিংদীতে গতকাল গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ব্যক্তিরা হলেন নেকজানপুর এলাকার পটু মিয়া ছেলে মো. আমির হোসেন (৫০), আবদুল জলিলের ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২২) এবং মৃত আবদুল মনু মিয়ার মেয়ে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের জয়নগর এলাকার আবদুল হকের স্ত্রী খোরশেদা আক্তার খুশি (৫৫)। খুশি তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারান। তাঁরা সবাই আলোকবালীর বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী দোলোয়ার হোসেন দীপুর সমর্থক।

এদিকে গুলিবিদ্ধ ও টেঁটাবিদ্ধদের মধ্যে ২৫ জনকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে  আশঙ্কাজনক নেকজানপুর গ্রামের মো. হানিফ, আকাশ মিয়া, আবুল খায়ের, বাদশা মিয়া, হোসেন মিয়া, খায়রুল মিয়া, মাসুম মিয়াসহ ১০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নরসিংদী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক হাসান আল মূলক বলেন, আশঙ্কাজনক ১০ জনের মধ্যে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ এবং পাঁচজন টেঁটাবিদ্ধ ছিলেন।  

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দীপুর সঙ্গে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুল্লাহ মিয়ার বিরোধ চলছিল। নির্বাচনে দীপু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। আসাদুল্লাহ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে গত ২৬ অক্টোবর কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এতে তাঁর সমর্থকরা ক্ষুুব্ধ হন। ওই দিনই তাঁর সমর্থকরা ইউনিয়নের সাতপাড়া গ্রামের শাহ আলম খান ও কাইয়ুম মিয়া নামের দুজনকে গুলিবিদ্ধ করেন।

এদিকে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী রিপন মোল্লা (মোরগ প্রতীক) ও আবুল খায়েরের (ফুটবল প্রতীক) মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। রিপন আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুল্লাহ মিয়ার সমর্থক এবং খায়ের দেলোয়ার হোসেন দীপুর সমর্থক। গত বুধবার বিকেলে পোস্টার লাগানো নিয়ে রিপন ও খায়েরের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের হস্তক্ষেপে উত্তেজনা ছাইচাপা দিয়ে ঘটনা মীমাংসার জন্য আজ শুক্রবার সময় নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যেই গতকাল ভোর ৫টার দিকে রিপন মোল্লার নেতৃত্বে টেঁটা, আগ্নেয়াস্ত্রসহ কয়েক শ লোক আবুল খায়েরের সমর্থকদের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। এতে খায়েরের তিনজন সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ সময় প্রতিপক্ষের হামলার প্রতিরোধ করতে গিয়ে দুই পক্ষই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে আহত হন কমপক্ষে ৩০ জন।

টেঁটাবিদ্ধ মমিন আলী বলেন, ‘ভোরে হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি কাইয়ুম ও রিপনের নেতৃত্বে কয়েক শ লোক দেশীয় অস্ত্র, টেঁটাসহ বিভিন্ন বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করছে।’

নিহত খোরশেদা আক্তার খুশির বড় ভাই ইদন মিয়া বলেন, ‘তারা চারদিক থেকে প্রথমে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। পরে ঘরের গ্রিল ভেঙে ঘরে ঢুকে মারধর ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় আমার ভাই হাসেম মিয়াকে মারার সময় আমার বোন খোরশেদা বাধা দিলে তাকে গুলি করে হত্যা করে। পরে হাসেমকেও গুলি করে গুরুতর আহত করে ঘরে আগুন দেয়।’

আলোকবালীর বর্তমান চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দীপু বলেন, ‘নির্বাচনে আসাদুল্লাহ ভাই আমাকে সমর্থন জানিয়ে মনোনয়নপত্র তুলে নিয়েছিলেন। ভেবেছিলাম, তাঁরা আমার সঙ্গে মিলে গেছেন। কিন্তু না, তাঁরা আমাকে মেনে নিতে পারছেন না। তাই নানা অজুহাতে তাঁরা আমার সমর্থকদের ওপর হামলা চালান।’

অন্যদিকে আলোকবালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ মিয়া বলেন, ‘এই ঝগড়ায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমি দীপুকে সমর্থন জানিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছি।’

পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ : আলোকবালীর স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মামুন হাসান বলেন, ‘সংঘর্ষ হতে পারে, এটা আমরা আগেই টের পেয়েছিলাম। তাই পুলিশকে জানিয়েছি। তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশের জন্য আজ এই ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা মনে করছি। পুলিশ সক্রিয় থাকলে এই তিনটা লোক মারা যেত না।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘সংঘর্ষের সময় আমরা পুলিশকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে আসেনি।’ এদিকে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি সওগাতুল আলম বলেন, ‘পক্ষপাতিত্বের প্রশ্নই আসে না। এক পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের অপপ্রচার কিংবা দোষারোপ করছে। নির্বাচন নিয়ে আমরা সব সময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।’

নরসিংদী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান বলেন, আলোকবালীতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চলছিল। নির্বাচন নিয়ে এ দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়। এরই জের ধরে গতকাল তিনজন নিহত হয়েছেন। 

রায়গঞ্জে নৌকা প্রার্থীর বাড়িতে বোমা নিক্ষেপ : এদিকে সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধুবিল ইউপির নৌকা প্রার্থীর বাড়িতে বোমা নিক্ষেপ এবং সদরের বহুলীতে বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচনী জনসভায় হামলা, চেয়ার-টেবিল ও মাইক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার রাতে ঘটনা দুটি ঘটে।

নগরকান্দায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িতে হামলা : এদিকে ফরিদপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ফরিদপুরের নগরকান্দার কোদালিয়া-শহীদনগর ইউপি নির্বাচন ঘিরে আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমাম-উল ইসলামের ভাজনকান্দা গ্রামের বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। হামলাকারীরা তাঁর ঘরের সব মাল তছনছ ও লুটপাট করে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। গত বুধবার রাতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাকির হোসেন নিলুর নৌকার পক্ষে স্লোগান দিয়ে তিন শতাধিক ব্যক্তি এ হামলা চালায়। এ সময় আহত হয় কমপক্ষে তিনজন। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

হামলার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাকির হোসেন নিলু বলেন, ‘ইমাম-উল ইসলাম নৌকা না পেয়ে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। আমাকে ফাঁসানোর জন্য নিজেরা ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছে। সেখানে আমার কোনো লোক ছিল না।’ 

 



সাতদিনের সেরা