kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

পায়রা সেতু উদ্বোধন

ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ঘটনা ঘটানো হচ্ছে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ঘটনা ঘটানো হচ্ছে

গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিএমও

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যোগাযোগের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আর কেউ পেছনে টানতে পারবে না। এর মাঝেই কিছু কিছু ঘটনা মাঝে মধ্যে ঘটছে, ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হচ্ছে, সেটা আপনারা নিজেরাও টের পান। যাতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। সেই সঙ্গে প্রচারও চালানো হয়।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা যতই উন্নতি করি, ভালো কাজ করি, একটি শ্রেণি আছে, বাংলাদেশের বদনাম করতেই তারা ব্যস্ত।’

গতকাল রবিবার সকাল ১১টায় পায়রা নদীর ওপর নির্মিত ‘পায়রা সেতু’র উদ্বোধনকালে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সকালে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি সেতু উদ্বোধন করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেলেও দেশে একটি শ্রেণি রয়েছে, তারা এই উন্নয়ন দেখে না, বরং নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী এদের সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

এ শ্রেণির লোকদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ দেশের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক, তারা কি তা চায় না? একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের একটু কদর বাড়ে। সে জন্য উন্নয়নটা তারা দেখে না, বরং ধ্বংসই সব সময় করতে চায়, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।’

একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক আলাদা ধীরগতির যানবাহনের (এসএমভিটি) লেনসহ ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রকল্পগুলোর ওপর প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস গণভবন থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালী ও সিলেট প্রান্তে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত প্রশাসন, আওয়ামী লীগ নেতা ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ এমপি গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।

আর পটুয়াখালী প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম, সংসদ সদস্য মো. শাজাহান মিয়া, আ স ম ফিরোজ, এস এম শাহজাদা, মো. মহিববুর রহমান, পংকজ দেবনাথ, নাসরিন জাহান রত্না, কাজী কানিজ সুলতানা প্রমুখ।

খুলে দেওয়া হলো পায়রা সেতু : ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী এলাকার পায়রা নদীর ওপর নির্মিত পায়রা সেতু উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বরিশাল ও পটুয়াখালীর সংযোগ সৃষ্টিকারী হবে এ সেতু। আর নদীর নামে একটা সেতু হলে নদীটারও একটা পরিচয় পাওয়া যাবে। যে কারণে এই নামটাই আমি পছন্দ করেছি। আর পায়রা শান্তির প্রতীক। কাজেই এই সেতু হওয়ার পর এই অঞ্চলের মানুষের যে আর্থিক উন্নতি হবে তার ফলে মানুষের মনে একটা শান্তি আসবে। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ফলে তারা ভালোভাবে বাঁচতে পারবে, সেই সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত পায়রা সেতুসহ ছয়টি সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর ফলে এখানে পর্যটনের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হয়ে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও সৃষ্টি হবে। আর সমগ্র বাংলাদেশেও একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করার পর যানবাহন চলাচলের জন্য চার লেনের সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। প্রথম টোল দিয়ে পার হয় কুয়াকাটা থেকে বরিশালগামী ডলফিন পরিবহনের একটি বাস। এ বাসের যাত্রী রত্না জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেতুর প্রথম বাসের যাত্রী হতে পেরে ভালো লাগছে। প্রধানমন্ত্রীকে অনেক ধন্যবাদ।’

টোল প্লাজার কর্মী সজীব দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, সকাল থেকে ফেরি দিয়েই যানবাহন পার হচ্ছিল। সেতুর উদ্বোধনের ঘণ্টাখানেক পর টোল প্লাজা খুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সেতু দিয়েই গাড়ি পার হচ্ছে।

আশা দেখছে দক্ষিণের মানুষ : মামার সঙ্গে পায়রা সেতু দেখতে এসেছে শিশু আদিবা। তার মতো অনেকেই সকাল থেকে ভিড় করে। সেতু ঘিরে ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। তারা আশা করছে, শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি হবে এ অঞ্চলের।

পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুহিববুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পায়রা সেতু খুলে দেওয়ার আগ থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিনিয়োগকারীরা ছুটে আসছেন কলাপাড়ায় বিনিয়োগ করার জন্য।

কলাপাড়া বন্দর ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেডের সভাপতি দিদার উদ্দিন আহম্মেদ মাসুম বেপারী বলেন, পায়রা সেতু চালু হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ঈর্ষণীয় উন্নতি হবে।

কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. ওহিদুজ্জামান সোহেল বলেন, সরাসরি যাতায়াতব্যবস্থার কারণে চলতি মৌসুমে পর্যটক আগমন রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

মহিপুর মৎস্যবন্দরের বিশিষ্ট মৎস্য ব্যবসায়ী ও মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফজলুল হক গাজী বলেন, সড়কপথে মাছ পরিবহনে লেবুখালীর বাধা কেটে গেল।

তবু টোল নিয়ে হতাশা : মো. রাজিবুল ইসলাম নামের এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, তিনি ২০ টাকা টোল দিয়ে সেতু পার হয়েছেন। এত টাকা টোল অযৌক্তিক বলে দাবি করেন তিনি।

বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কের যাত্রীবাহী বাসের চালক আলমগীর হোসেন বলেন, তিনি টোল দিয়েছেন ৩৪০ টাকা। ৫২ আসনের গাড়িতে অনেক সময় আসন পূর্ণ হয় না। প্রতি ট্রিপে তিন সেতুতে টোল দিতে হবে ৪৪০ টাকা। দুই বাসস্ট্যান্ডে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে দিতে হবে আরো ১০০ টাকা। তেলসহ অন্যান্য খরচ মিলে তাঁদের পোষাবে না।

পটুয়াখালী বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির মো. রিয়াজ উদ্দিন মৃধা জানান, যদি টোল হার পুনর্নির্ধারণ না হয় তাহলে বরিশাল-পটুয়াখালী রুটে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন বলেন, ফেরি ও সেতুর টোলের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। সড়ক পরিবহন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে টোল নির্ধারিত হয়ে থাকে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক : ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত আরো ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডর উন্নয়ন প্রকল্প এবং সরকার ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে সিলেট-তামাবিল সড়ক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

সিলেটের সার্বিক উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আমাদের অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রাখছে। সেই কথাটাও আমরা সব সময় স্মরণ করি। কাজেই আমি মনে করি, এই রাস্তাটা হয়ে গেলে যোগাযোগ বাড়বে। তাতে দেশেরই বিশেষ উন্নতি হবে এবং আন্তর্জাতিক সড়ক নেটওয়ার্কেও বাংলাদেশ সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে বাসস ছাড়াও তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল, পটুয়াখালী ও কলাপাড়া প্রতিনিধি)

 



সাতদিনের সেরা