kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন

এবারও বিনা ভোটের পথে লাকসাম

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এবারও বিনা ভোটের পথে লাকসাম

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনেও বিনা ভোটের ‘ঐতিহ্য’ ধরে রাখতে যাচ্ছে কুমিল্লার লাকসাম। দ্বিতীয় ধাপে এই উপজেলার নির্ধারিত পাঁচটি ইউপির সব কটিতেই ভোটের লড়াই নাও হতে পারে। পাঁচটি ইউপির চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দলের পাঁচ প্রার্থীই একক প্রার্থী হিসেবে বিনা ভোটে বিজয়ের পথে রয়েছেন।

শুধু চেয়ারম্যান পদেই নয়, ওই পাঁচটি ইউনিয়নের সাধারণ সদস্যের ৪৫টি পদের বিপরীতে ৪৪ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্যের ১৫ পদের সব প্রার্থী বিনা ভোটে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁরাও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। এ উপজেলার শুধু উত্তরদা ইউনিয়নের ১ নম্বর সাধারণ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এই দুজনের একজন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন।

এর আগে উপজেলা পরিষদ এবং পৌর নির্বাচনেও লাকসামে ক্ষমতাসীন দলের সব প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আগামী ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে ৮৪৬ ইউপির মধ্যে চেয়ারম্যান পদের ৩৩টিতে একক প্রার্থী হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা জয়ী হওয়ার পথে রয়েছেন। এ ধাপে গত বৃহস্পতিবার প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আগামীকাল সোমবারের মধ্যে আপিলের নিষ্পত্তি হবে। মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ হবে বুধবার। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের হিসাব বলছে, এ নির্বাচনে চেয়ারম্যানর পদে ৩২টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া অন্য কোনো দলের বা স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেননি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে একক প্রার্থীর সংখ্যা আরো একজন বেড়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ৩ নম্বর জোরারগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় সেখানে এখন আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থী রয়েছেন।

যেসব ইউনিয়নে একক প্রার্থী : চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী রয়েছেন যেসব এলাকায় সেগুলো হলো সিরাজগঞ্জ সদরের সয়দাবাদ, যশোর চৌগাছার ফুলসারা, মাগুরা সদরের হাজরাপুর, বাগেরহাট সদরের গোটাপাড়া, মোল্লাহাটের গাংনী, জামালপুর সদরের রশিদপুর, শেরপুর সদরের কামারের চর, কিশোরগঞ্জ বাজিতপুরের বলিয়ারদি ও হালিমপুর, মানিকগঞ্জের সিংগাইরের বায়রা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া, গোলাকান্দাইল ও ভুলতা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর, মুরাদপুর, কুমিরা ও সোনাইছড়ি, মিরসরাইয়ের করেরহাট, ধুম, ওসমানপুর, কাটাছাড়া, মঘাদিয়া, মায়ানী, হাইতকান্দি, ইছাখালী ও ৩ নম্বর জোরারগঞ্জ, কুমিল্লার লাকসামের কান্দিরপাড়, গোবিন্দপুর, উত্তরদা, আজগরা ও লাকসাম পূর্ব এবং ফেনীর ফুলগাজীর ফুলগাজী ও আনন্দপুর।

এর আগে গত ২০ জুন এবং ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ৩৬৫টি ইউপির মধ্যে ৭৩ জন চেয়ারম্যান একক প্রার্থী হিসেবে বিনা ভোট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে তুলনায় এবার দ্বিতীয় ধাপের বিনা ভোটে নির্বাচিত হতে যাওয়াদের সংখ্যা এখনো কম। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী কমাতে না পারার কারণে এবার একক প্রার্থী কম হতে পারে। যেসব ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী সেসব ইউপি থেকেও বলা হচ্ছে, অনেকেরই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সে ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা হয়নি। দলের বাইরে যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন, তাঁদের কয়েকজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সময় ভালো না। সে কারণে প্রার্থী হয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাইনি।’

মাগুরা সদরের হাজরাপুর ইউপিতে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু দুজন তা জমা দেননি। এঁদের একজন ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমরা দুজন দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জেলা কমিটির কাছে জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদন না পাওয়ায় দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দিইনি।’

দলীয় মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ আছে। সে সুযোগ কেন নেননি—এ প্রশ্নে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন আবেদন ফরম সংগ্রহকারী মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘রাজনীতি করি আওয়ামী লীগের। তাই প্রার্থী হলে এই দলেরই হব। কিন্তু দল মনোনয়ন না দেওয়ায় এখন প্রার্থী হলে দলে বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হব, যা আমার ভবিষ্যতের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হবে।’

যশোরের চৌগাছার ১ নম্বর ফুলসারা ইউপিতে জাকের পার্টির প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন মো. শহিদুল ইসলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করেননি। তিনি বলেন, ‘জামানা বেশি ভালো না। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমি মনোনয়নপত্র জমা দেইনি।’ নাগরিক সংগঠন ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এই পরিস্থিতি সম্পর্কে কালের কণ্ঠকে বলেন, নানা কারণে বর্তমানে সরকারি দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কেউ সাহস দেখাতে পারছেন না বলেই বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, কুমিল্লায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে হামলা নিয়ে যে ধরনের তদন্ত চলছে, সে ধরনের তদন্ত লাকসামের বিনা ভোটের নির্বাচন নিয়েও হওয়া দরকার। সেখানে যাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তাঁদের জনপ্রিয়তার কারণ কী, কেন তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হন না—এসব নিয়ে গবেষণাও হতে পারে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।)



সাতদিনের সেরা