kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কপালে ভাঁজ ফেলেছে ৪ পণ্য

রোকন মাহমুদ   

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কপালে ভাঁজ ফেলেছে ৪ পণ্য

দাম বাড়ার কারণে এক বছর ধরে মোটা চাল, ভোজ্য তেল, চিনি ও পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন আয়ের মানুষের। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার তথ্য বলছে, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের অক্টোবরের এ পর্যন্ত এই চারটি পণ্য ভোক্তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এ সময়ে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ। আর পাম তেল সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

গত বুধবার থেকে ভোজ্য তেলের দাম আরেক দফা বেড়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, সয়াবিনে বেড়েছে প্রতি লিটারে সাত টাকা আর পাম তেলে বেড়েছে লিটারে তিন টাকা। বোতলজাত সয়াবিন প্রতি লিটারের দাম ১৬০ টাকা। আর খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার ১৩৬ টাকা। কিন্তু গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা ও মানিকনগর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৪০-১৪৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ১৩৭-১৩৯ টাকায়।

গরিবের নাগালে থাকা আমিষের অন্যতম উৎস ডালের বাজারও অস্থির। নিম্নবিত্তের মানুষকেও এখন হিসাব করে ব্রয়লার মুরগি খাওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর ২৬ মার্চ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শুরু হয় আতঙ্কের কেনাকাটা। এর প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। আমদানিনির্ভরতার কারণে ভোজ্য তেল, চিনি ও পেঁয়াজের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। ধানের উৎপাদন বাড়ার কথা বললেও চালের ঘাটতি মেটাতে আমদানি করতে হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে গত ১১ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠক করে। সেই বৈঠকে পেঁয়াজ নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। মুড়িকাটা পেঁয়াজ ডিসেম্বরে বাজারে আসার আগ পর্যন্ত দাম না কমার ব্যাপারে শঙ্কার কথা বলা হয়। দাম নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে তিন দিনের মাথায় গত ১৪ অক্টোবর পেঁয়াজ আমদানিতে আরোপিত ৫ শতাংশ শুল্ক আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রত্যাহার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। একই সঙ্গে চিনির নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। গত রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে চিনির দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

সেপ্টেম্বরেই এ দুটি পণ্যের দাম বাড়ানো হয়।

জানতে চাইলে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হুসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিনিকলগুলো বন্ধ করে শতভাগ আমদানিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে দেশ। অথচ সরকারি উৎপাদন থাকলে দামে ভারসাম্য আনা যায়। ব্যাপক চাল উৎপাদন করেও দাম কমানো যায়নি, কারণ সঠিক মনিটরিং নেই। ’

তবে বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পণ্যের দাম বাড়লে, এটা বলা যাবে না যে বাজারে নজরদারি নেই। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সব সময় এটা হয়। এখন নজরদারি আরো বাড়ানো হয়েছে। ’

চাল : টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক বছরে রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি গড়ে সাড়ে পাঁচ টাকা বা ১৩ শতাংশ। চলতি বছর এপ্রিলে এই মানের চালের দাম ছিল ৪৬-৫২ টাকা। গত বছরের মার্চের শুরুতেও ছিল ৩২-৩৫ টাকা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত বছর বোরো, আমন ও আউশ তিন মৌসুমে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৮৬ লাখ মেট্রিক টন। দেশে ১৭ কোটি জনসংখ্যা ধরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, জনপ্রতি দৈনিক ৪১৬ গ্রাম করে চালের চাহিদা দুই কোটি ৫৮ লাখ টন। অবশ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উৎপাদনের হিসাবে গরমিল রয়েছে।

পেঁয়াজ : চলতি মাসের প্রথম দিকে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৭০-৮০ টাকা কেজি। ভারতে বৃষ্টি ও পূজার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অজুহাত দেন ব্যবসায়ীরা। টিসিবির হিসাবে, গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় এখন পণ্যটির দাম তেমন একটা বাড়েনি। গত জানুয়ারিতে দেশি পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম কমে কেজি ৩০-৩৫ টাকায় নেমে আসে, কিন্তু জুন-জুলাইতে বেড়ে হয় ৪৫-৫০ টাকা। এরপর বাড়তেই থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আগের মৌসুমের তুলনায় গত মৌসুমে পেঁয়াজের উৎপাদন সাড়ে ছয় লাখ টন বেড়েছে। দেশে ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদার বিপরীতে ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৩২ লাখ টন। ফসল তোলা, সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যায়ের ক্ষতি বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ টন। বাকি চাহিদা মেটাতে আমদানির ৯০ শতাংশই আসে ভারত থেকে।

ভোজ্য তেল : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। যার প্রায় সবটাই আমদানি করতে হয়।

চলতি বছরের শুরুতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রোডম্যাপের তথ্য মতে, দেশে উৎপাদিত সরিষা ও সয়াবিন থেকে আসে সাড়ে তিন লাখ টন। আমদানি করা ভোজ্য তেলের মধ্যে ৬০ শতাংশ পাম তেল। বাকিটা সয়াবিন। সার্বিকভাবে শিল্প উৎপাদনে পাম তেলের ব্যবহার বেশি। তবে সয়াবিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ রান্নার জন্য এই পণ্যটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

টিসিবির হিসাবে, গত এক বছরে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে গড়ে লিটারপ্রতি ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। সয়াবিনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পাম তেলের দামও। এ সময়ে পাম তেলের দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ৪৮ টাকা।

চিনি : তেলের মতো চিনির বাজারও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। অপরিশোধিত চিনি এনে দেশের মিলগুলোতে পরিশোধন করে বাজারজাত করা হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, দেশে চিনির চাহিদা রয়েছে ১৮ লাখ টন। গত বছর পর্যন্ত সরকারি চিনিকলে এক লাখ টনের কিছু বেশি উৎপাদন হলেও এখন তা ৫০ হাজার টনে নেমে এসেছে।

টিসিবির তথ্য বলছে, এক বছরে চিনির গড় দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৮ টাকা ৫০ পয়সা বা ৩০ শতাংশ।

অন্যান্য : এ ছাড়া মসুর ডাল, আটা, ময়দা, মাংস, ডিমসহ প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। টিসিবির হিসাবে, গত এক বছরে খোলা আটার দাম ১৯ শতাংশ, খোলা ময়দা ৪৩ শতাংশ ও বড় দানার মসুর ডালের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া মাসখানেক ধরে ক্রমাগত বাড়ছে সব ধরনের মুরগির দাম। ব্রয়লার মুরগির কেজি ২০০ টাকার আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। গত বছরের নভেম্বরে ছিল ১১৮ থেকে ১৩০ টাকা কেজি।



সাতদিনের সেরা