kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

জলবায়ু প্রতিবেদন বদলাতে ৩২ হাজার অনুরোধ

জাতিসংঘ প্যানেলের খসড়া নথি ফাঁস
তদবিরের তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জলবায়ু প্রতিবেদন বদলাতে ৩২ হাজার অনুরোধ

ধরিত্রীকে রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তন রোধে জাতিসংঘ যেসব কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, সেগুলো শিথিল করার চেষ্টা চালাচ্ছে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী কয়েকটি দেশ ও সংগঠন। পরিবেশ দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার আরো বেশ কিছুদিন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা। ফাঁস হওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানায় বিবিসি।

ফাঁস হওয়া তথ্য বলছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী সৌদি আরব এবং অন্যতম প্রধান কয়লা রপ্তানিকারক অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো জাতিসংঘের প্রতিবেদনে পরিবর্তন আনতে তদবির (লবিং) করছে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তনরোধী পদক্ষেপ নমনীয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে আসন্ন কপ২৬ সম্মেলনের সাফল্য নিয়ে জন্ম নিচ্ছে প্রশ্ন। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো নগরে কপ২৬ শীর্ষক এই জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন হতে চলেছে।

ফাঁস হওয়া তথ্য অনুসারে জাতিসংঘ জলবায়ু প্রতিবেদন প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের কাছে বিভিন্ন সরকার, প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পক্ষ সব মিলিয়ে ৩২ হাজার অনুরোধ করেছে। এসব অনুরোধের তথ্য ও জাতিসংঘের প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনের খসড়া পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসের যুক্তরাজ্য শাখার অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছায়। পরে তা বিবিসির হাতে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্ত সরকার প্যানেল (আইপিসিসি) প্রতি ছয় থেকে সাত বছর পর পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করে।

তদবিরের কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক উপদেষ্টা দাবি জানিয়েছেন, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্ত সরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) আসন্ন প্রতিবেদন থেকে যেন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ‘সব পর্যায়ে জরুরি ও আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন’ এমন শব্দগুচ্ছ বাদ দেওয়া হয়। কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে কার্বনহীন উেসর ব্যবহার এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের যে কথা জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিও করছে সৌদি আরব।

জাতিসংঘের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা কয়লাখনি বন্ধের ওপর যে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন অস্ট্রেলিয়া সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

এদিকে কয়লা ব্যবহারের দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড ফুয়েল রিসার্চ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দেশটিতে কোটি কোটি মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ‘বিশাল চ্যালেঞ্জ’ মোকাবেলা করতে গেলে আরো কয়েক দশক ধরে কয়লার ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হতে পারে।

পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের অন্তর্ভুক্ত সব দেশ নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা কার্বন ধরে রেখে মাটির নিচে আটকে রাখার ব্যয়বহুল ও নতুন ধরনের প্রযুক্তি (সিসিএস) ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের দাবি, সিসিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র ও কিছু শিল্প খাত থেকে নিঃসৃত কার্বন হ্রাস করা যেতে পারে। আর্জেন্টিনা ও নরওয়ে এই যুক্তির পক্ষে।

আইপিসিসির খসড়া প্রতিবেদনে সিসিএস প্রযুক্তির ভূমিকা স্বীকার করা হয়েছে। তবে এটিও বলা হয়েছে, এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা এখনো অনিশ্চিত।

ওপেকের বক্তব্য জানতে চাইলে সংস্থাটি বিবিসিকে বলেছে, ‘আইপিসিসির প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অনেক পথ আছে। আমাদের সহজলভ্য সব শক্তির পাশাপাশি দূষণমুক্ত ও আরো কার্যকর সমাধান কাজে লাগাতে হবে। কেউ যেন পিছিয়ে না পরে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে এসব মন্তব্যের ব্যাপারে আইপিসিসি বলেছে, বিজ্ঞানীদের পর্যালোচনার সময় সব পক্ষের মন্তব্য আমলে নেওয়া হয়। কিন্তু এগুলোকে প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা বিজ্ঞানীদের নেই।

আইপিসিসির প্রতিবেদন তৈরি হয় এর বিজ্ঞানীদের কাজের ভিত্তিতে এবং এর বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত—এমন মন্তব্য করে যুক্তরাজ্যের ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক করিন লো কুয়েরা বলেন, ‘ওই সব মন্তব্য গ্রহণ করার কোনো চাপ বিজ্ঞানীদের ওপর নেই। মন্তব্যগুলো যদি লবিংয়ের পর্যায়েও পড়ে, সেগুলো বিজ্ঞান অনুযায়ী যথার্থ না হলে আইপিসিসির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যুক্ত হবে না।’ আইপিসিসির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরিতে এই অধ্যাপকের ভূমিকা ছিল।

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রাণিজ আমিষভোজীদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের বিপক্ষেও জোরালো অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশ। আইপিসিসির প্রতিবেদনে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর জন্য মাংস খাওয়া কমিয়ে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস তৈরির ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার ঘোর বিরোধিতা করছে গরুর মাংসজাত পণ্য প্রস্তুতকারক ও প্রাণিখাদ্য উৎপাদনকারীদের সামনের সারিতে থাকা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো বলছে, মাংসভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখেও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো যায়, এমন প্রমাণ আছে।

কথা উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করা নিয়েও। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলনে ঐকমত্য হয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলো ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ১০ হাজার কোটি ডলার করে দেবে। অর্থ সহায়তার এ লক্ষ্যমাত্রা কখনোই পূরণ হয়নি। তার ওপর এখন সুইজারল্যান্ড বলছে, শুধু উন্নত দেশগুলো নয়, সামর্থ্যবান সব দেশকে সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে।

আইপিসিসির খসড়া প্রতিবেদন ‘আরো ইতিবাচক হওয়া উচিত’ দাবি করে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ সংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণে পরমাণুশক্তির ভূমিকাও আমলে নেওয়া দরকার। সূত্র : বিবিসি



সাতদিনের সেরা