kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার দেশ

কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে সম্প্রতি দেশের কয়েকটি স্থানে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সম্প্রীতি শোভাযাত্রা বের করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার প্রতিবাদ হয়েছে সারা দেশে। গতকাল মঙ্গলবার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো। সারা দেশে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

কভিড মহামারি শুরু হওয়ার পর রাজপথে এটিই প্রথম দলটির বড় কোনো কর্মসূচি পালন। ঢাকায় ‘সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রা’ কর্মসূচিতে দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত হন। সেখান থেকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ার আহবান জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে থাকার ঘোষণা দেন।

এই কর্মসূচিতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও অংশ নেন। অনেক এলাকায় সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ মিছলে অংশ নেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতির নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আয়োজিত এক প্রতিবাদী মানববন্ধনে বলেন, দেশের ১৫ জেলায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার নামে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল ও সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিহিংসামূলক অত্যাচার চালানো হচ্ছে। হামলা ঠেকাতে রাষ্ট্রের প্রশাসন, অন্তত নির্বাহী বিভাগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। অবিলম্বে এই হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, নইলে দেশের ঐতিহ্যিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে।

‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ো’ শিরোনামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এই মানববন্ধনের আয়োজন করে। এতে ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়ার সঞ্চালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক রহমত উল্লাহ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান, ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রাব্বানী, শিক্ষক সমিতির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক লুত্ফর রহমান, নীল দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুস ছামাদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক অহিদুজ্জামান চাঁন, ঢাবি শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রহিম, সদস্য চন্দ্রনাথ পোদ্দার, অধ্যাপক শফিউল আলম ভুঁইয়া, সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা ‘শৈল্পিক’ প্রতিবাদ জানান প্রতিবাদী নাটক পরিবেশনার মাধ্যমে। দুপুরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ওই বিভাগের শিক্ষকদের নির্দেশনায় বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘দেখতে কি পাও, পুড়ছে বাংলা’ শীর্ষক এই প্রতিবাদী নাটক পরিবেশন করা হয়। ‘গোল হয়ে আসুন সকলে, ঘন হয়ে আসুন সকলে’ প্রতিপাদ্যে এই শৈল্পিক প্রতিবাদ সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বিক্ষোভ মিছিল করেন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শতাধিক শিক্ষার্থী। মিছিলটি টিএসসি থেকে শুরু হয়ে কার্জন হল এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সারা দেশে হামলা চালাচ্ছে। অথচ যখনই দেশে এমন কোনো ঘটনা ঘটে তখনই বলা হয় যে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যারা এ দেশকে কখনো চায়নি, এখনো চায় না তারা কিন্তু চুপ করে বসে নেই। তারা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। এখন দেশে যে ধরনের ঘটনা ঘটছে এসব তাদেরই পরিকল্পনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এই মানববন্ধন করে সংগঠনটি।

ঢাকায় যৌথভাবে সম্প্রীতির মিছিল করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও বেশ কিছু সংগঠন। বিকেল সাড়ে ৪টায় বায়তুল মোকাররম থেকে ঢাকেশ্বরী পর্যন্ত মিছিল করার কথা থাকলেও পুলিশের বাধায় সেটি পল্টন মোড় থেকে শুরু হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সাম্প্রদায়িক এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ঘটনার নেপথ্যের কারিগরদের বিচারের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া এসব ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা রয়েছে দাবি করে আগামী ২৪ অক্টোবর তাঁর অপসারণের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষক সমিতি দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বরে মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে সারা দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। অবিলম্বে সব ঘটনার তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। গত কয়েক দিনে যেসব জায়গায় ন্যক্কারজনক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, সেসব জায়গায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রা’ করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শেষ হয়। মিছিলে বিভিন্ন হলের দুই শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।

হবিগঞ্জের সাংস্কৃতিককর্মীরা ‘হিংসা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়ান’ স্লোগানে সম্প্রীতি রক্ষার দাবি নিয়ে রাজপথে নামেন। বিকেলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে শত শত সাংস্কৃতিককর্মী হাজির হন হবিগঞ্জ শহরের টাউন হলের সামনে।

বাগেরহাটের মোংলায় উপজেলা প্রশাসন ও ব্রেভ প্রকল্প দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের আয়োজনে দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে সমাবেশ করা হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে ‘সংঘাত নয়, ঐক্যের বাংলাদেশ চাই’ স্লোগানে স্থানীয় ইমাম, পুরোহিত, ফাদার, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিক, সুধীসমাজের সদস্যসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে এ সম্প্রীতি বন্ধন-সমাবেশে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শাখা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ড. হিমাদ্রী শেখর রায়ের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম। উপাচার্য বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক। তবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল যারা ১৯৭১ সালে পরাজয় স্বীকার করেছে, তারাই মূলত হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরির উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে মন্দির-মণ্ডপসহ হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছে।

সিলেটে গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। বিক্ষোভ সমাবেশ করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, যুব ইউনিয়ন, প্রগতি লেখক সংঘ ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সম্প্রীতি সমাবেশ করে।

এ ছাড়া সিলেটে ধর্মীয় সম্প্রীতি সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন সব ধর্মীয় নেতারা। গত সোমবার রাতে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এক বৈঠকে এই অঙ্গীকার করেন তাঁরা। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্রকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধেরও ঘোষণা দেন তাঁরা।

কুড়িগ্রামে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে একাধিক মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ফরিদপুরে বিকেলে প্রেস ক্লাবের সামনে মুজিব সড়কে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

কুমিল্লার চান্দিনায় চান্দিনা সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত এমপি।

‘জাগো মানুষ, রুখে দাও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস’ প্রতিপাদ্যে সুনামগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংবাদিকরা। বিকেল ৪টায় সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতারা অংশ নেন।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]



সাতদিনের সেরা