kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

চালে আর্সেনিক কমানো সম্ভব

আয়রন প্রয়োগে কমে ক্যাডমিয়াম

তৌফিক মারুফ   

২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চালে আর্সেনিক কমানো সম্ভব

ধানের চাষপর্যায়ে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে চালে আর্সেনিকের মাত্রা কমানো সম্ভব। আবার মাটিতে আয়রন প্রয়োগ করে ক্যাডমিয়ামেরও মাত্রা কমানো যায়। তাতে রোগের ঝুঁকি অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। চালে ওই দুটি রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে করা দুটি আলাদা গবেষণায় এমন ফল পেয়েছেন দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানীরা ধাপে ধাপে পরীক্ষা করে দেখেছেন পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার পর চালে আর্সেনিকের মাত্রা অর্ধেক কমে গেছে। আর ক্যাডমিয়ামের মাত্রা কমেছে ৪৬ শতাংশ।

ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে এই দুটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার দ্য নিউ ক্যাসেল ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, সৌদি আরবের কিং সৌদ ইউনিভার্সিটি, লন্ডনের সেন্ট জর্জ ইউনিভার্সিটি এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন বিজ্ঞানী।

চলতি বছরের ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স’-এ ধান-চালে ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি দূর করতে আয়রনের ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোসংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। আর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক কৃষি জার্নাল ‘অ্যাগ্রোনমি’তে প্রকাশিত ধান-চালে আর্সেনিক উপস্থিতি, পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আর্সেনিকের উপস্থিতি কমানো এবং এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সংক্রান্ত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করে দেশে চাল ছাড়াও ডাবের পানি, লালশাক, মুলা ও হেলেঞ্চাশাকে ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি মিলেছে। সাতক্ষীরা, যশোর, বরিশাল, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার মানুষের মধ্যে আর্সেনিকজনিত সংক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এরপর আর্সেনিকমুক্ত পানি নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অসংক্রামক রোগ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক বছর আগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে অন্তত ৬৫ হাজার রোগী রয়েছে, যারা আর্সেনিক বিষের সংক্রমণে ভুগছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে একটি জরিপের উদ্যোগ নিয়েছে, যা থেকে হালনাগাদ পরিস্থিতি জানা যাবে।’

আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়াটার এইডের দক্ষিণ এশীয়া অঞ্চলের পরিচালক ড. খাইরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, সর্বশেষ ইউনিসেফের উদ্যোগে করা একটি জরিপ গত বছর প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালে করা ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সহনীয় মাত্রা ০.০৫ পিপিএম ধরে মোট জনসংখ্যার ১১.৮২ শতাংশ আর্সেনিকের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সহনীয় মাত্রার আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ১৮ শতাংশ মানুষ এই ঝুঁকিতে আছে।

আর্সেনিকের প্রভাব সম্পর্কিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, শস্যজাতীয় অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে ধানে ১০ গুণ বেশি আর্সেনিক থাকে। পানি থেকে মাটিতে যায় আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিভিন্ন ধাতু। গবেষণায় পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে দেখা গেছে, ধানগাছের মূল, কাণ্ড, পাতা, শীষ, ধান ও চালে পর্যায়ক্রমে ধাতুর পরিমাণ কমতে থাকে। এর ভিত্তিতে গবেষকরা বলছেন, পানি থেকে মাটিতে যদি ওই সব ক্ষতিকর পদার্থের প্রবাহ কমানো যায় তাহলে ফসলেও তা কমতে থাকে।

ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে আর্সেনিক নিয়ে গবেষণাটি হয়েছে সাতটি ধাপে। প্রথম ধাপে সাতটি পাত্রের প্রতিটিতে আট কেজি পরিমাণ কৃষি জমির মাটি নেওয়া হয়, যা পানিতে ডুবে ছিল। ওই সব পাত্রে ব্রি-২৮ ধানের চারা রোপণ করা হয়। চাষ পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়েছে ধানক্ষেতে জমা প্রাকৃতিক পানি। প্রথমে মাটি ও পানি পরীক্ষা করে আর্সেনিকের মাত্রা নিরূপণ করেছেন গবেষকদল। ধান তোলার আগ পর্যন্ত চাষ পর্যায়ে প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর তাঁরা মাটি, পানি, ধানগাছ পর্যবেক্ষণ করেন। ধান হওয়ার পর সেটা চাল করে আবার পরীক্ষা করা হয়।

এভাবে সাতটি ধাপের পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে প্রতি ধাপেই আর্সেনিকের মাত্রা কমে আসে। তুলনামূলক হিসাবে ধানগাছের গোড়ার দিক, কাণ্ড, পাতা ও তুসের চেয়ে সিদ্ধ চালে আর্সেনিকের মাত্রা অনেক কম। চাষের শুরুতে পানি ও মাটি পরীক্ষা যেখানে আর্সেনিক পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ১২ মিলিগ্রাম, সেখানে চালে প্রতি কেজিতে পাওয়া গেছে ০.৫২ মিলিগ্রাম। এটাকে গবেষকরা বলছেন, স্বাভাবিক চাষ পদ্ধতি, যা কৃষকরা করে থাকেন।

এরপর গবেষকদল একই সংখ্যক পাত্র ব্যবহার করে আরো ছয় ধাপে পরীক্ষা চালিয়েছে। প্রতিটি ধাপে পানির পরিমাণ ও প্রবাহ বাড়িয়ে-কমিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। ওই সব পর্যায়ে কৃত্রিমভাবে আর্সেনিকও প্রয়োগ করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, পানি ব্যবস্থাপনার কারণে আর্সেনিকের মাত্রা কমে আসছে, যার প্রভাব চালেও দেখা গেছে। ধান সিদ্ধ ও শুকানোর ক্ষেত্রে পানি, তাপ ও সময় সমন্বয় করে দেখেছেন গবেষকরা। এসব পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, চালে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি কেজিতে ০.৫২ থেকে ০.২৭ মিলিগ্রামে নেমে এসেছে। সে তুলনায় ধানের খড়-কুটা ও তুসেও যথারীতি চালের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ছিল।

গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি চালে ০.৫২ মিলিগ্রাম মাত্রা আর্সেনিক থাকলে প্রতিদিন একজন মানুষের শরীরে যে পরিমাণ আর্সেনিক প্রবেশ করে তাতে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয় ৪.৮১ শতাংশ। কিন্তু গবেষকদের কৃত্রিম ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত প্রতি কেজি চালে ০.২৭ মিলিগ্রাম আর্সেনিক থাকলে তাতে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে নেমে আসে ২.৫০ শতাংশে।

এই গবেষণায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম (২) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মূলত দেখার চেষ্টা করেছি কিভাবে চালের মধ্যে ক্ষতিকর ধাতুর পরিমাণ কমানো যায় এবং মানুষকে ক্যান্সারের ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায়।’ তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক পানি প্রবাহকে যদি আমরা বিকল্প ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তবে ফসলকে অনেকখানি নিরাপদ রাখতে পারব এবং মানুষও কিছুটা নিরাপদ থাকবে।’

ড. রফিকুল ইসলামসহ আরেকটি দলের গবেষণায় ধান, চাল ও খড়-কুটায় আয়রন ও ক্যাডমিয়ামের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে। এই গবেষণায় ধান-চালে ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি কমাতে মাটিতে আয়রন প্রয়োগ করা হয়। এতে দেখা যায়, ধানগাছের শিকড়ে আয়রনের আবরন তৈরি হয়। এর ফলে ক্যাডমিয়াম শোষণও কম হয়।

এই গবেষক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গবেষণায় আমরা দেখেছি, প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত প্রতি কেজি ধানে ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি ছিল ১.২৩ মিলিগ্রাম। আমরা দুই ডোজে আয়রন প্রয়োগ করে দেখেছি তা ০.৬৬ মিলিগ্রামে নেমে আসে।’



সাতদিনের সেরা