kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

যুবক-ডেসটিনির পথ ধরে ই-কমার্স প্রতারণা

আর ফেরত আসে না বিনিয়োগের টাকা

► ৬০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের তালিকা, ৩০টির নামে সারা দেশে শতাধিক মামলা
► দেনা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর পথে পথে ঘুরছে লাখো গ্রাহক-বিনিয়োগকারী

এম সায়েম টিপু   

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




আর ফেরত আসে না বিনিয়োগের টাকা

একসময় ছিল ‘যুবক’ ঢেউ, পরে এলো ‘ডেসটিনি’ হাওয়া। সরল বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠান দুটির জালে আটকা পড়ে এখনো খাবি খাচ্ছে। কষ্টের সঞ্চয় যুবক-ডেসটিনির মতো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়ে এখনো অনেক গ্রাহক ফেরত পাননি সেই বিনিয়োগের টাকা। এখন নতুন করে ই-কমার্সের খোলসে সাধারণ মানুষকে ঘায়েলে নেমেছে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান। কয়েক মাস ধরেই দেশে আলোচনার কেন্দ্রে ডিজিটাল ই-কমার্সের প্রতারণা।

অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান। এর বড় একটি অংশই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। আর প্রতারণার শিকার হয়ে পথে পথে ঘুরছেন নিঃস্ব গ্রাহক-বিনিয়োগকারীরা।

আর্থিক কেলেঙ্কারির এসব ঘটনায় সরকার বিব্রত, নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসনও। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেকোনো ঘটনা প্রকাশের পর সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ব্যাপক তত্পরতার কথা বলা হয়। নেওয়া হয় নানা উদ্যোগও। পরে সময়ের পরিক্রমায় সেসব উদ্যোগে ভাটা পড়ে। ফলে একের পর এক এমন আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেই চলেছে।

অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এরই মধ্যে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে এমন ৬০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছে। প্রতারণার অভিযোগে অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে সারা দেশে শতাধিক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, নিরাপদ শপ, রিং আইডি, টোয়েন্টিফোর টিকিট ডটকম, এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস, ধামাকা, কিউকম ও এহসান গ্রুপ রয়েছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা এসব মামলায় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগ করেছেন। নজরদারিতে রয়েছে বাকি ৩০টি প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের আর্থিক খাতে প্রথম বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন। সেখানে টাকা রেখে প্রতারিত হয়েছেন তিন লাখের বেশি গ্রাহক। দীর্ঘ ১৪ বছরেও তাঁরা আমানত ফেরত পাননি। আরেকটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটায় ডেসটিনি গ্রুপ। বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতারণার শিকার প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ। যুবক ও ডেসটিনির ঘটনায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিলে বর্তমান সময়ে এমন ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের জন্ম হতো না।

এদিকে সময়ের আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, শুধু ইভ্যালি নয়, যুবক-ডেসটিনির ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরাও যেন তাঁদের পাওনা বুঝে পান, সেটা তিনি চান। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান দুটির বিপুল সম্পদ আছে, এসব বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনার বেশির ভাগই পরিশোধ করা সম্ভব। কারণ এসব সম্পদ বর্তমান বাজারে অনেক দাম বেড়েছে।’ 

এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা থাকলেও সম্পদ বিক্রিতে আইনি জটিলতা আছে। বহুস্তরের বিপণন (এলএলএম) ব্যবসা ছিল যুবক ও ডেসটিনির। এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সম্প্রতি ই-কমার্স ব্যবসার ভোক্তাদের সংকট সমাধানে অগ্রাধিকার দিতে চায় সরকার।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যুবক ও ডেসটিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ছয় হাজার ছয় শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর সর্বশেষ অভিযুক্ত ৩০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রতারণা অভিযোগ উঠেছে। লাখ লাখ গ্রাহকের এসব টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

এদিকে আর্থিক প্রতারণা বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তত্পর হলেও কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অসত্ ব্যবসার আগ্রাসী তত্পরতা থেমে নেই। ক্রেতা ও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে অস্বাভাবিক নানা অফার নিয়ে তত্পর তারা। সর্বশেষ আরো চারটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার উদ্দেশ্যে অস্বাভাবিক অফার দিয়ে অসত্ ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে।

যুবক : দেশের আর্থিক খাতে প্রথম বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটে যুবকের নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেনে। ১৯৯৬ সালে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত হয় যুবক। অবশ্য এর প্রায় তিন বছর আগে থেকেই গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে টাকা রেখে প্রতারিত হয়েছেন তিন লাখের বেশি গ্রাহক। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের পাওনা পরিশোধ করে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাস্তবতা হলো, ১৪ বছরেও গ্রাহকরা ফেরত পাননি তাঁদের আমানত।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ব্যাপারে ত্বরিত পদক্ষেপ না থাকাতেই পরবর্তী সময়ে সুযোগ হয়েছে অন্যান্য ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেঙ্কারির।

যুবকের সমস্যা নিষ্পত্তি করতে ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে চেয়ারম্যান করে কমিশন গঠন করা হয়। এ ছাড়া সাবেক সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে ২০১১ সালের ৪ মে দ্বিতীয় একটি কমিশন গঠন করে সরকার। পাশাপাশি ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এসংক্রান্ত একটি আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়।

ড. ফরাসউদ্দিন তাঁর প্রতিবেদনে বলেন, যুবকের গ্রাহক দুই লাখ ৬৭ হাজার ৩০০ জন। যুবকের কাছে তাঁদের পাওনার পরিমাণ দুই হাজার ১৪৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তবে যুবকের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের দায়দেনা পরিশোধ করা সম্ভব।

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন লাখ তিন হাজার ৭০০ গ্রাহকের কাছ থেকে দুই হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যুবক। এই টাকা গ্রাহককে ফেরত দিতে ও সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য যুবকে প্রশাসক নিয়োগের সুপারিশ করে কমিশন। কিন্তু কমিশন ও কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

এ ব্যাপারে যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন মুকুল বলেন, ‘সাড়ে তিন লাখ গ্রাহকের সঙ্গে দেড় কোটি ভুক্তভোগী অসহায় মানুষের এখন একমাত্র দাবি প্রশাসক নিয়োগ করে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সরকারের নজরদারি না থাকায় আমাদের সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।’

ডেসটিনি : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) নামে বিতর্কিত ডেসটিনি গ্রুপ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছে। ডেসটিনির নিজস্ব রেকর্ড অনুসারে, তাদের গ্রাহক, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। ২০১২ সালে তাদের কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর দীর্ঘ ৯ বছরেও বিনিয়োগকারীরা টাকা ফেরত পাননি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের দুটি মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি।

এ ব্যাপারে ডেসটিনির গ্রাহক হাসিবুল হক বলেন, ‘ডেসটিনির হাজার হাজার গ্রাহক বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে আন্দোলন করলেও কোনো সুফল আসেনি। তাই বিনিয়োগের প্রায় সাত লাখ টাকার কথা ভুলে কয়েক বছর ধরে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। সরকার চাইলে টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে গ্রাহকের টাকায় কেনা ডেসটিনির সম্পদ বিক্রি করে। সরকারের উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে আছি আমরা।’

 



সাতদিনের সেরা