kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সিলেটে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

সিলেট অফিস   

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সিলেটে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

টাকার বিনিময়ে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়ার অভিযোগ তুলে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। গতকাল বুধবার সিলেট প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই দাবি জানান তাঁরা। পাশাপাশি কমিটি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট এবং বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ছাত্রলীগের তেলিহাওর গ্রুপের নেতা শাহরিয়ার আলম সামাদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা আলা উদ্দিন পারভেজ, সাইফুর রহমান, সায়েদ আহমদ, খালেদুর রহমান, আসরাফুল ইসলাম বাপ্পি, নাঈম রশিদ চৌধুরী প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাদ বলেন, ‘আসলে যাঁরা ত্যাগী এবং যাঁরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে ছিলেন এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য ছিলেন, তাঁদের কাছে কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে টাকার অফার দেওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার মতো অবস্থা নেই বলে এসব প্রার্থী তা প্রত্যাখ্যান করেন। আমাদের ধারণা, এর চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

লিখিত বক্তব্যে সামাদ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উভয়ে এক কোটি ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে অছাত্র, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত সিলেট এমসি কলেজের হোস্টেলে ধর্ষণ মামলার আসামিদের গডফাদার, বিভিন্ন চেক অবমূল্যায়ন (ডিজ-অনার) মামলার আসামি, বিশেষ করে ফ্রিডম পার্টির নেতার নাতিকে নিয়ে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করায় আমরা সিলেটের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লজ্জিত, চরম হতাশ এবং বিব্রত। আমরা ঘোষিত এই কমিটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের অভিভাবক সংগঠন সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ বা অবহিত না করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ টাকার বিনিময়ে সিলেট জেলা ও মহানগর কমিটি ঘোষণা করেছে। সিলেট ছাত্রলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।’

কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে কমিটি দেওয়ার অভিযোগ সংগঠনের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে সামাদ বলেন, ‘এসব কারণে দলের অবশ্যই ক্ষতি হচ্ছে। সে জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চাচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে এ রকম না হয়।’

তবে অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিটি গঠনে টাকার লেনদেনের অভিযোগ পুরোটাই ভুয়া। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নিজের পরিবারতন্ত্র কায়েম করতে চান। এর আগে তাঁর ভাই সভাপতি ছিলেন। এবারের কমিটিতে তাঁর ভাতিজাকে সভাপতি করতে চেয়েছিলেন। সেটা না হওয়ায় তাঁরা নানা ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছেন।’ লেখক ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘যাঁদের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে, তাঁদের কারো রাজনৈতিক ত্যাগ, যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নেতাদেরই কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে।’

দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ : সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর থেকেই উত্তপ্ত সিলেটের রাজপথ। দায়িত্ব পাওয়া একাধিক নেতার বিরুদ্ধে উঠেছে বিভিন্ন অভিযোগ। জেলা সভাপতি নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের আসামিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, চেক ডিজ-অনার মামলা ছাড়াও বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় সদস্য কনক পাল আলোচিত ‘পাঠাকাণ্ড’ মামলার আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। তবে অভিযুক্তরা বলছেন, পদবঞ্চিতরা তাঁদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজমুল এবং এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার আসামিরা ছাত্রলীগের টিলাগড় উপদলের রাজনীতি করেন। এই উপদল ‘রণজিত্ গ্রুপ’ নামে পরিচিত। এতে দুটি বলয় রয়েছে। একটি বলয় ছাত্রলীগের সাবেক জেলা সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপু এবং অন্য বলয় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম পরিচালনা করেন। জাহাঙ্গীর আলম বলয়ে যুক্ত নাজমুল এবং সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলার আসামিরা। নাজমুলের সঙ্গে নিজেদের ছবিও আসামিরা বিভিন্ন সময় তাদের ফেসবুকে পোস্ট করেছে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে নাজমুল তত্পর ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। টিলাগড়ে দলীয় কোন্দলে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দায়ী করা হয় টিলাগড় উপদলকে। এ উপদলের কর্মী হিসেবে এসব ঘটনায় নাজমুলের নামও শোনা যায়।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। কারণ ধর্ষণের ঘটনার পর আমি গ্রেপ্তারের দাবিতে সোচ্চার ছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি। অনেকের সঙ্গেই চলাফেরা হয়। যাঁরা দলের রাজনীতি করেন তাঁদের সঙ্গে ছবি থাকতেই পারি।’

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন রাহেল সিরাজ। তিনি তেলিহাওর উপদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। উপদলটি ‘নাসির গ্রুপ’ নামেও পরিচিত। মূলত সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খানের নামে এ উপদলের নাম। এ উপদলের রাজনীতি করলেও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর একই উপদলের নেতাকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করছেন তাঁর। কমিটি ঘোষণার পর মঙ্গলবার রাতে রাহেলের বাসায় হামলা করেছেন এ উপদলের নেতাকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাহেল তেলিহাওর উপদলের নেতা হলেও তাঁকে বড় পদে চায়নি দলের বড় একটি অংশ। এ উপদল থেকে পদপ্রত্যাশী ছিলেন জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খানসহ একাধিক নেতা। বিশেষ করে জাওয়াদ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খানের ভাতিজা হওয়ায় তাঁর প্রতি নেতাকর্মীদের সমর্থন বেশি ছিল। এ অবস্থায় জাওয়াদকে ডিঙিয়ে রাহেল সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে উপদলে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সদ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া রাহেল সিরাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে ইসলামিক স্টাডি বিষয়ে পড়াশোনা করছি। খোঁজ নিলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, আমার বিষয়ে আনা অভিযোগ সত্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাকে বিতর্কিত করতে অনেক পুরনো ঘটনা সামনে আনা হয়েছে।’

 



সাতদিনের সেরা