kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভুল রেফারিং কাঁদাল বাংলাদেশকে

শাহজাহান কবির, মালদ্বীপ থেকে

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভুল রেফারিং কাঁদাল বাংলাদেশকে

গল্পটা অন্য রকমও হতে পারত। ২০০৫ সালের পর সাফ ফুটবলের ফাইনালের দুয়ারেই ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ বেলায় রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পাওয়া পেনাল্টিতে ফাইনালে ওঠার পথ রুদ্ধ হয় বাংলাদেশের। ম্যাচ শেষে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দলের খেলোয়াড় আর কোচিং স্টাফরা। ছবি : সংগৃহীত

ম্যাচের পরও গ্যালারি উত্তাল। সমুদ্রের ফুঁসে ওঠা ঢেউ যেন। বাঁধ দিয়ে কোনো রকম আটকে রাখা। ছাড়া পেলেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কিছুক্ষণ আগেই মাঠের মধ্যে বাংলাদেশের বিপক্ষে হওয়া অন্যায়। বাংলাদেশ জয়ের পথেই ছিল। সুমন রেজার প্রথমার্ধে করা গোলটি ধরে রেখে নেপালকে আটকে রাখছিলেন তপু বর্মণরা।

আনিসুরের একটি ভুলে ১০ জনের দল হয়ে পড়েও লাল-সবুজের মনোবলে একটুও চিড় ধরেনি। কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়ার মিনিট কয়েক বাকি থাকতে ভুল করে বসলেন উজবেক রেফারি আখরোল রিজকুলায়েভ! নেপালের ফ্রি কিকে ছোট বক্সে একসঙ্গে লাফিয়েছিলেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। সাদ উদ্দিনের সামনে থাকা অঞ্জন বিষ্টা পেছনের দিকে পা মেলে পড়ে গেলেন, আর রেফারি দৌড়ে এসে কিনা বাজালেন পেনাল্টির বাঁশি! কিভাবে ফাউলটা হয়েছে যেন নিজেও পরিষ্কার ছিলেন না। জয়ের বন্দরে ভিড়তে থাকা তরিটা কেউ যেন বেখেয়ালে ফুটো করে দিল। এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ বাঁশি বাজার পর তাই কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে তপু, টুটুলরা তেড়ে যান রেফারির দিকে। পুলিশকে ছুটে আসতে হয়, তাঁদের ঠেকিয়ে রাখতে কঠোরও হতে হয়। ছুটে আসেন ব্রুজোন, রিজকুলায়েভের মুখের ওপর তালি বাজান তিনি। গ্যালারি তখন ক্ষোভের আগুন, হতবাক। পুলিশের পাহারা পেরিয়ে মাঠে ঢুকেও পড়েছিল এক দর্শক। শেষ পর্যন্ত বঞ্চনার জ্বালা নিয়েই ফিরতে হয়েছে তাদের। কান্নায় ভেঙে পড়েন খেলোয়াড়রা। ১৫ বছর পর ফাইনাল ছোঁয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে যে থেমে যেতে হলো বাংলাদেশকে। পেনাল্টি থেকে অঞ্জন বিষ্টার করা গোলে ১-১ ড্র নিয়ে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম সেই ফাইনাল ছোঁয় নেপাল।

ড্রয়ের সমীকরণ নিয়ে নামা নেপালিরা অবশ্য ম্যাচের শুরুতেই গোল বের করে নিতে চেয়েছিল। তৃতীয় মিনিটেই বাংলাদেশের ডিফেন্স ভেঙে ঢুকেও পড়েছিলেন নবযুগ শ্রেষ্ঠা, তপু ফাউলে তাঁকে থামান বক্সের বাইরে। ফ্রি কিকে সেই সুযোগটা অবশ্য কাজে লাগাতে পারেনি তারা। ওদিকে শুরুর ধাক্কা সামলে বাংলাদেশও নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে আক্রমণে ওঠে। দেরি হয় না গোল পেতেও। বাঁ দিকে রাকিব বল নিয়ে বেরিয়ে গেলে ফাউলের শিকার হন। সেখান থেকে জামালের ফ্রি কিক নেপালের এক ডিফেন্ডার আগেভাগে ক্লিয়ার করতে চেয়েও পারেননি। দ্বিতীয় পোস্টে তখন সুমন রেজা। উড়ে আসা সেই বলেই লাফিয়ে উঠে নেওয়া তাঁর হেড খুঁজে পায় নেপালের জাল।

জিততেই হবে—সমীকরণ নিয়ে নামা বাংলাদেশের নবম মিনিটেই পাওয়া সেই গোল অনন্য। সেই গোলেই ম্যাচের স্টিয়ারিং সিটে বসে যায় ব্রুজোন। পেছনে পড়ে যায় নেপাল। শুরুর চাপ কাটিয়ে বাংলাদেশও তখন আত্মবিশ্বাসী। গ্যালারির এক-তৃতীয়াংশ ভরিয়ে রাখা বাংলাদেশি সমর্থকদেরও গলা চড়ে তখন আরো উঁচুতে। নেপালের অর্ধে সুমন রীতিমতো আতঙ্ক হয়ে ওঠেন এরপর। ম্যাচের আধাঘণ্টার মধ্যে আরো দুইবার ডিফেন্স ভেঙে ওঠেন তিনি। ব্রুজোন এদিন বড় ধরনের পরিবর্তনই এনেছিলেন একাদেশে। এবারের আসরে প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পান সেন্টার ব্যাক টুটুল হোসেন, খেলেছেন তপুর পাশে। ডানে ফেরেন বিশ্বনাথ। তারিককে অবশ্য তাঁর অনভ্যস্ত বাঁ প্রান্তে খেলতে হয়। পিছিয়ে পড়া নেপাল সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠলেও তপু, টুটুলরা দ্রুত রক্ষণ জমাট করে ফেলছিলেন।

৩৬ মিনিটে অঞ্জনের ক্রসে আইয়ুশ ঘালান পা লাগালে বিপদ হতো, কিন্তু ডিফেন্ডারদের প্রহরায় সে সুযোগ পাননি তিনি। বিরতির আগে আয়ুুশ আরেকটি সুযোগ পেয়েছিলেন রোহিতের ক্রসে, কিন্তু হেডটা পোস্টে রাখতে পারেননি তিনি। বাংলাদেশও তাই ১-০তে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায়, ফাইনালের স্বপ্নটা আরো উজ্জ্বল করে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে খেলে নেপাল। কিন্তু ডিফেন্সের পেছনে আনিসুর রহমান ছিলেন সেরা ফর্মে। আয়ুশের খুব কাছ থেকে নেওয়া একটি হেড ফিরিয়ে বাংলাদেশকে বিপদমুক্ত রাখেন তিনি। পরপরই পাল্টা আক্রমণে নেপাল গোলরক্ষক কিরন চেমজংকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেন সুমন। একাই বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পোস্টে মেরেছিলেন তিনি, কিরন এগিয়ে এসে শরীর দিয়ে ফেরান সেই বল। আনিসুর আরেকবার ত্রাতা হন নবযুগের হেডের সামনে। সময় যত গড়াচ্ছিল বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা তাই বাড়ছিল। গ্যালারিতে লাল-সবুজ সমর্থকরাও সেই মুহূর্তটার অপেক্ষায় ছিল। আয়ুশের বদলে নামা মানিশ ডাঙ্গিকেও একবার হতাশ করেন আনিসুর।

৭৯ মিনিটে সেই আনিসুরকে হারানোটাই ছিল প্রথম বড় ধাক্কা। রাকিবের আচমকা একটা ব্যাক পাস ধরতে বক্স থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে, অনন্যোপায় আনিসুর শরীর দিয়ে বাধা দেন অঞ্জনকে। অঞ্জন পড়ে গেলে রেফারি বাজান ফাউলের বাঁশি, লাল কার্ডও বের হয়ে আসে তাতে। এর পরও বাংলাদেশ ম্যাচেই ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তের ওই সিদ্ধান্তেই এলোমেলো হয়ে গেছে সব কিছু। ফাইনালের আগেই তাই ফিরে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

 



সাতদিনের সেরা