kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

পুরস্কৃত হলো শ্রম অর্থনীতি ও কার্যকারণ সম্পর্ক গবেষণা

সাব্বির খান, সুইডেন থেকে   

১২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পুরস্কৃত হলো শ্রম অর্থনীতি ও কার্যকারণ সম্পর্ক গবেষণা

শ্রম অর্থনীতি ও কার্যকারণ বিষয়ক গবেষণায় এবার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তিন অর্থনীতিবিদ ডেভিড কার্ড, জশুয়া ডি অ্যাংগ্রিস্ট ও গুইডো ডাব্লিউ ইমবেন্স। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও নতুন অভিবাসীদের আগমনে কর্মসংস্থানে ধস নামে বলে প্রচলিত ধারণাটি সত্য নয়—এই তত্ত্বের জন্য ডেভিড কার্ড এবং কার্যকারণ সম্পর্ক বিশ্লেষণে পদ্ধতিগত (মেথডোলজিক্যাল) অবদানের জন্য অ্যাংগ্রিস্ট ও ইমবেন্সকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়।

গতকাল সোমবার সুইডেনের দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স ২০২১ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এই তিনজনের নাম ঘোষণা করে। তাঁদের মধ্যে ডেভিড কার্ড পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি সুইডিশ ক্রোনার অর্ধেক পাবেন এবং বাকি অর্ধেক অ্যাংগ্রিস্ট ও ইমবেন্সকে ভাগ করে দেওয়া হবে।

দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের প্রধান গোরান হ্যানসন তাঁদের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, এই তিন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের যোগসূত্র বুঝতে প্রাকৃতিক পরীক্ষা (ন্যাচারাল এক্সপেরিমেন্ট) কাজে লাগিয়েছেন। তাঁরা এক অভিনব পদ্ধতির অবতারণা করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, প্রাকৃতিক পরীক্ষা থেকে কারণ ও প্রভাব সম্পর্কে কিভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেতে পারে। তাঁদের প্রচারিত এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায়োগিক গবেষণায় অসাধারণ বিপ্লব ঘটিয়েছে।

নোবেল কমিটির মতে, পুরস্কার বিজয়ীরা তাঁদের গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, প্রচলিত প্রাকৃতিক পরীক্ষার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ‘কারণ ও তার প্রভাব’ সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব। ডেভিড কার্ডের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়গুলোর অধ্যায়ন এবং অ্যাংগ্রিস্ট ও ইমবেন্সের পদ্ধতিগত প্রচেষ্টার যৌথ সম্মিলনে দেখানো সম্ভব হয়েছে যে প্রাকৃতিক পরীক্ষাগুলো জ্ঞানের একটি সমৃদ্ধ উৎস।

অর্থনীতিবিদ কার্ড তাঁর গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে কর্মসংস্থানের ওপর ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ফলাফল মূল্যায়ন করেন। তাঁর গবেষণার ফলাফল শ্রমের মূল্যবৃদ্ধিতে কর্মসংস্থান সর্বদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়—গবেষকদের এই চিন্তা বদলাতে বাধ্য করে। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে শুরু হওয়া তাঁর গবেষণা বিশ্বের প্রচলিত জ্ঞান বা প্রজ্ঞাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। এর মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের বিশ্লেষণ এবং অন্তর্দৃষ্টির উদ্ভাবন ঘটে। তিনি দেখিয়েছেন, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি শ্রমবাজারকে দেউলিয়াত্বের দিকে পরিচালিত করে না। একটি দেশে নতুন অভিবাসনকারীরা কখনোই সে দেশে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের আয়ের মাত্রাকে সংকুচিত করে না।

প্রচলিত নিয়মে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে পাওয়া উপাত্ত ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে একদল শিক্ষার্থীর এক বছরের জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষা বাড়িয়ে দেওয়া হলে তাদের দলের প্রত্যেককে সমানভাবে প্রভাবিত করবে না। বিদ্যালয়ে সেই অতিরিক্ত বছরের প্রভাব সম্পর্কে স্বাভাবিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া কি সম্ভব? ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জশুয়া অ্যাংগ্রিস্ট ও গুইডো ইমবেন্স এই পদ্ধতিগত সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তাঁরা দেখিয়েছিলেন যে স্বাভাবিক বা সনাতন পদ্ধতিতে নেওয়া এক্সপেরিমেন্টগুলো থেকে ‘কারণ ও প্রভাব’ সম্পর্কে কিভাবে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

ডেভিড কার্ড ১৯৫৬ সালে কানাডার গুয়েলফে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিয়োজিত।

জশুয়া অ্যাংগ্রিস্ট ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর কলম্বাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৯ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি  যুক্তরাষ্ট্রে কেমব্রিজের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যাপনায় নিয়োজিত।

গুইডো ইমবেন্স ১৯৬৩ সালে নেদারল্যান্ডসের আইন্ডহোভেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে ফলিত অর্থনীতির এই অধ্যাপক যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত।

১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও সম্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে নোবেল পুরস্কার। আলফ্রেড নোবেলের উইল করা পাঁচটি বিষয়ে পুরস্কারের মধ্যে অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়ার বিষয়টি ছিল না। ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রবর্তন করার কথা ঘোষণা করে। তখন থেকে অর্থনীতির পুরস্কারটি নোবেলের অন্যান্য পুরস্কারের মতো একই সময় ঘোষণা ও প্রদান করা হয়।

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের সব কটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা শেষ হলো। রীতি অনুযায়ী ১০ ডিসেম্বর পুরস্কারের জনক আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম এবং নরওয়ের রাজধানী অসলোতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারির কারণে গত বছরের মতো এবারও নোবেল কমিটি সব অনুষ্ঠান বাতিল ঘোষণা করেছে। তবে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে নোবেল কমিটির দূত মারফত বিজয়ীদের নিজ নিজ দেশে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

 



সাতদিনের সেরা