kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

কলেজজীবনের শুরুতে খোয়া গেল তিন মাস

শরীফুল আলম সুমন   

১০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কলেজজীবনের শুরুতে খোয়া গেল তিন মাস

এ বছর শিক্ষার্থীদের কলেজজীবনের ছন্দঃপতন ঘটল। গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর আগমুহূর্তে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়, কিন্তু এ বছর এখনো এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে তাদের পরীক্ষা শুরুর কথা রয়েছে। অথচ গত জুলাই মাসে একাদশের শিক্ষার্থীরা দ্বাদশ শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। এর পর থেকে একাদশ শ্রেণি রয়েছে শিক্ষার্থীশূন্য। এরই মধ্যে তিন মাস পার হয়েছে। এ অবস্থা কমপক্ষে আরো তিন মাস থাকবে বলে জানা গেছে, যা একটি বিরল ঘটনা, বলছেন শিক্ষকরা।

প্রতিবছর সাধারণত মে মাসে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। জুলাই মাসে একাদশ শ্রেণিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। একই সময়ে একাদশের শিক্ষার্থীরা দ্বাদশ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। আর এপ্রিল মাসে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বসে। একটা নিয়মচক্রের মধ্যে চলে উচ্চ মাধ্যমিকের কলেজজীবন।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একাদশ শ্রেণিতে যে তিন মাস ধরে শিক্ষার্থী নেই তা আমি আগে কখনো শুনিনি। শিক্ষার্থী না থাকায় আমি বিচলিত বোধ করছি। তবে করোনা একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ঘটনা। এর ফলে অনেক জীবন থেমে গেছে। এই মহামারি আগে কেউ দেখেনি। এত দীর্ঘ সময় আগে কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকেনি। ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, ‘আমার মনে হয়, শিক্ষাকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, যেভাবে শিল্প ও কলকারখানাকে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষায় পিছিয়ে গেলে শিল্প ও কলকারখানায়ও পিছিয়ে যাবে। আর শিক্ষার্থী না থাকলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যাপারটিও আটকে যাবে। মোট কথা, শিক্ষাকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে আরো দায়িত্ব নিতে হবে।’

আন্ত শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণ শিক্ষার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজ রয়েছে চার হাজার ৫৫১টি। এর মধ্যে প্রায় ৬৫০টি সরকারি কলেজ রয়েছে। আর দুই হাজার ৫২৪টি কলেজ এমপিওভুক্ত। বাকি এক হাজার ৩৭৭টি সম্পূর্ণ বেসরকারি কলেজ। এর বাইরে কারিগরি ও মাদরাসার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের আরো আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকা থেকেই এসব শিক্ষকের বেতন দিতে হয়। কিন্তু করোনাকালীন এসব শিক্ষক তেমন কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এমনকি গত ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল-কলেজ খুললেও বেশির ভাগ বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এর বড় কারণ হলো একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী নেই। এভাবে মাদরাসা শিক্ষায় আলিম পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কারিগরি শিক্ষায়ও একই অবস্থা।

খুলনা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। একাদশে তিন মাস ধরে শিক্ষার্থী নেই। দ্বাদশে ১২০ জন শিক্ষার্থী। আর এইচএসসি পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছে আরো ১২০ জন। যারা এইচএসসি পরীক্ষা দেবে তাদের দুই বছরের কোর্স। ফলে জুন মাসের পর আর বেতন নেওয়ার সুযোগ নেই। করোনাকালে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে এমনিতেই শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি দেয় না। এর ওপর তিন মাস ধরে একাদশে শিক্ষার্থী নেই। ফলে আমরা খুবই সমস্যায় আছি।’

শিক্ষকরা বলছেন, এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা দিতে না পারায় তারা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে পড়বে। ফলে তাদের দুই বছরের কোর্স দেড় বছরে শেষ করতে বেগ পেতে হবে। এমনকি অনেক দুর্বল শিক্ষার্থীর পক্ষে তাল মেলানো কষ্টকর হয়ে যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এইচএসসির কোর্স দুই বছর হলেও সেটা নানা কারণে দেড় বছরে শেষ হয়। তাহলে এ বছর যারা এসএসসি পাস করবে, তারা দেড় বছরের কোর্সে এক বছর সময় পাবে। আমার প্রস্তাব, এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ কয়েক মাস বাড়ানো দরকার, যাতে তাদের শিখন কার্যক্রম মোটামুটিভাবে শেষ করানো যায়। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষকদের তৎপর হতে হবে, প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে যেতে হবে। ছাত্ররা যেভাবে শিখবে, সেভাবে তাদের শেখাতে হবে।’ 

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বছরের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হবে ২৩ নভেম্বর। ফল প্রকাশে দুই মাস সময় প্রয়োজন হলেও আমরা এক মাসের মধ্যেই ফল দেব। এরপর দ্রুততার সঙ্গে একাদশে ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরু করব, যাতে আগামী জানুয়ারিতে এসব শিক্ষার্থী ক্লাস করতে পারে। আর এ বছরের এসএসসি উত্তীর্ণরা ২০২৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। তারা ছয় মাস কম সময় পেলেও কিভাবে তাদের সম্পূর্ণ সিলেবাস শেষ করানো যায়, সে ব্যাপারে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’

শুধু এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরাই নয়, যারা গত বছর পাস করেছে তারা অনলাইনে ক্লাস করে এরই মধ্যে একাদশ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। তবে করোনাকালে শহরের কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করতে পারলেও মফস্বলের শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে তা জোটেনি। গ্রামের কলেজগুলোতে অনলাইন ক্লাস হয় না। আবার কোনো কোনো কলেজ কিছু ক্লাস আপলোড করলেও তা শিক্ষার্থীরা দেখতে পারছে না। কারণ বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরই ক্লাস করার উপযোগী ডিভাইস নেই। ইন্টারনেটের উচ্চ দাম ও ধীরগতির কারণেও অনেকে ক্লাস করতে পারছে না। এর পরও তারা প্রয়োজনীয় পড়ালেখা ছাড়াই দ্বাদশ শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।

আবার রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের বড় কলেজগুলোতে অনেক দূর-দূরান্তের ও গ্রামের শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হয়। কিন্তু গত ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরাসরি ক্লাস না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও একাদশ শ্রেণিতে তার কলেজই দেখার সৌভাগ্য হয়নি। ফলে ভালো কলেজে ভর্তি হয়েও অনেক শিক্ষার্থী কলেজে পড়ার আমেজই উপভোগ করতে পারেনি।

আন্ত শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। আর গত বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫২৩ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়, যারা গত জুলাই মাসেই দ্বাদশ শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা