kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

মিয়ানমারের ঐক্য সরকার

পক্ষে এবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টও

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পক্ষে এবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টও

ফ্রান্সের সিনেটের পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টও মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে ৩৩ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করে। ওই প্রস্তাবে মিয়ানমারে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নেওয়া জান্তার নিন্দা জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রস্তাবে জাতীয় ঐক্য সরকার এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা পিডুংজো লুটোর প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি সিআরপিএইচকে মিয়ানমারের জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্য সরকারের সঙ্গে কাজ করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী গত ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখল করে। এরপর ১৬ এপ্রিল অং সান সু চিকে স্টেট কাউন্সেলর করে মিয়ানমারে অভ্যুত্থানবিরোধী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মিলে জাতীয় ঐক্য সরকার গঠন করেন। এটি নির্বাসিত সরকারের আদলে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ও বিদেশে কাজ করছে। মিয়ানমারের ঐক্য সরকারকে স্বীকৃতি দিতে ফ্রান্স সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দেশটির সিনেট গত মঙ্গলবার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এর দুই দিনের মাথায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টও জাতীয় ঐক্য সরকারের পক্ষে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করল। জানা গেছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য আইন প্রণয়ন এবং ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) কর্মকাণ্ড তদারকি করে। তাদের গৃহীত প্রস্তাব ইইউ ও ইসির জন্য পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

প্রস্তাবে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীকে গত বছর নভেম্বর মাসের নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান জানিয়ে অনতিবিলম্বে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি অবস্থার অবসান, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ, সব রাজনীতিক বন্দির মুক্তি এবং নির্বাচিত সব পার্লামেন্ট সদস্যকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট, স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ অন্যদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে। সেখানে আরো বলা হয়েছে, মিয়ানমারে বৈধ কর্তৃপক্ষ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রথম অপরিহার্য ধাপ হতে পারে সব রাজনৈতিক নেতা ও বন্দিদের মুক্তি। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের জন্য মিয়ানমারের জনগণের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে।

সেখানে আরো বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু ধর্মীয়, নৃগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের জনগণের ওপর হামলা, আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিকে কারাবন্দি ও আটক ব্যক্তিদের কাছে যাওয়ার সুযোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে মসজিদ, গির্জাসহ ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।

ইইউতে মিয়ানমারের বাণিজ্য সুবিধা, বিশেষ সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্য সুবিধার বিষয়ে তদন্ত করতে ইউরোপীয় কমিশনকে পার্লামেন্ট আবারও আহ্বান জানিয়েছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচার হামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রস্তাবে বলেছে, সংখ্যালঘু বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের সামরিক অধিনায়কদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রস্তাবে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্যও মিয়ানমারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

অন্যত্র আশ্রয় নিতে আগ্রহী মিয়ানমারের বাসিন্দাদের জন্য সীমান্ত খোলা রাখতে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আহ্বান জানিয়েছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে আসিয়ানকে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং নিরাপত্তা পরিষদে তাদের দায়িত্ব সমুন্নত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারে নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য জাতিসংঘ গঠিত স্বাধীন তদন্ত কাঠামোকে সহযোগিতা করতেও আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্য ও তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ইউরোপীয় কাউন্সিলের নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ অব্যাহত রাখতে কাউন্সিলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইইউভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা মিয়ানমারে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল যাতে মানবাধিকার সমুন্নত রাখে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে বলেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট।

প্রস্তাবে মিয়ানমারে ইইউর প্রতিনিধি এবং সদস্য দেশগুলোর দূতাবাসগুলোতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারে অস্ত্র ও নজরদারি সরঞ্জাম সরবরাহ, চালান, ট্রানজিটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ইইউ সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) আরো তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। গৃহীত ওই প্রস্তাবে মিয়ানমারে বৈধ প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় ঐক্য সরকার, পার্লামেন্টকে প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি, বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘকে পাঠাতে বলা হয়েছে।

এদিকে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র গতকাল শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বর্ধিত উপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি কিয়াও মো তুনকে ‘গণতন্ত্রের নায়ক’ হিসেবে সম্মাননা প্রদানে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ১৯ অক্টোবর ওই সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কয়েকজন সিনেটর বক্তব্য দেবেন। কিয়াও মো তুন জাতিসংঘে মিয়ানমারের জান্তার বিরুদ্ধে সরব ভূমিকা রাখছেন।



সাতদিনের সেরা