kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিশ্ব ডাক দিবস

১৫ ধাপ পিছিয়েছে ডাকসেবা

কাজী হাফিজ   

৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৫ ধাপ পিছিয়েছে ডাকসেবা

একসময় এসব ডাকবাক্সে ফেলা হতো বহু চিঠিপত্র। ডিজিটাল যুগেও পোস্টবক্সের দেখা মেলে; কিন্তু চিঠিপত্র লেখার চল প্রায় উঠেই গেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

আজ বিশ্ব ডাক দিবস। দিবসটি উদযাপনে দেশের ডাক অধিদপ্তর যখন নির্ধারিত অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত, তখন এ বিভাগের জন্য আবারও নেতিবাচক সংবাদ উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থেকে। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের (ইউপিইউ) সমন্বিত উন্নয়ন সূচকের বার্ষিক র‌্যাংকিংয়ে আবারও ১৫ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অবস্থানও বাংলাদেশের ২১ ধাপ ওপরে। অথচ ২০১৭ সালেও মিয়ানমার এই উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের ৪৮ ধাপ নিচে ছিল। সে সময় বাংলাদেশের র‌্যাংকিং ছিল ৭৮ আর মিয়ানমারের র‌্যাংকিং ছিল ১২৬। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ৬৫ পয়েন্ট হারিয়ে এখন ১৪৩ নম্বরে। আর মিয়ানমার এবার ১২২ নম্বরে। অবশ্য এক বছরে মিয়ানমারও ৪ পয়েন্ট হারিয়েছে। গত বছরে এ দেশটির অবস্থান ছিল ১১৮ নম্বরে।

গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত চলতি বছরের ইন্টিগ্রেটেড ইনডেক্স ফর পোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (২ আইপিডি) রিপোর্টে ইউপিইউ সদস্যভুক্ত ১৬৮টি দেশের মধ্যে ১০.০২ পয়েন্ট পেয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের অবস্থান নেমে গেছে ১৪৩ নম্বরে। প্রতিবেশী ভারত ৪৭.১৬ পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে ৫০ নম্বরে। গত বছর ভারত ছিল ৪১ নম্বরে। এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান এক বছরে ৫ পয়েন্ট এগিয়ে ৬২ নম্বরে স্থান পেয়েছে। শ্রীলঙ্কা ২৬ পয়েন্ট এগিয়ে এবার ৬০ নম্বরে। নেপাল ৯ পয়েন্ট এগিয়ে অবস্থান নিয়েছে ১২৯ নম্বরে। মালয়েশিয়া ১৩ পয়েন্ট এগিয়ে স্থান পেয়েছে ২৩ নম্বরে।

অন্যদিকে এবারও র‌্যাংকিংয়ে সেরা অবস্থানটি ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড। সুইস ডাক বিভাগের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে গত বছর ইউপিইউয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক বিশার এ হুসেন বলছিলেন, ‘তারা আন্তর্জাতিক ডাক খাতের বাকি অংশের জন্য একটি উজ্জ্বল বাতিঘর এবং উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার দৃষ্টান্ত।’

সুইজারল্যান্ডের পরে সেরা দশের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, জাপান, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুর। সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ক্যারাবিয়ান দেশ হাইতি।

প্রতিবেদনটির ভূমিকায় বলা হয়েছে, এটি ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ডাক উন্নয়নের অবস্থা পরীক্ষা করে ১৬৮টি দেশে ডাকসেবার নির্ভরযোগ্যতা, নাগাল, প্রাসঙ্গিকতা ও স্থিতিস্থাপকতা নির্ণয় করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক ডাক অপারেটর এখন করোনা মহামারির নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্যতা তৈরি করে নিচ্ছে।

ধারাবাহিক অবস্থান : ২ আইপিডি র‌্যাংকিংয়ে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ডাকসেবায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর অবস্থান হচ্ছে যথাক্রমে বাংলাদেশ ৭৮, ৮৪, ১১৭, ১২৮ ও ১৪৩; ভারত ১৭, ২৩, ২৬, ৪১ ও ৫০; মালয়েশিয়া ২৩, ২৫, ৩৩, ৩৬ ও ২৩; পাকিস্তান ৯৪, ৭৫, ৬৯, ৬৭ ও ৬২; মিয়ানমার ১২৬, ৯১, ১০০, ১১৮ ও ১২২; শ্রীলঙ্কা ৮০, ৮৩, ৮৪, ৮৬ ও ৬০ এবং নেপাল ১০২, ১৩১, ১২৫, ১৩৮ ও ১২৯ নম্বরে।

ইউপিইউ সমন্বিত উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের ডাকসেবার এই অবস্থান সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউপিইউ কিভাবে, কাদের, কোন কোন তথ্যের ভিত্তিতে এ জরিপ করেছে তা আমাদের জানা নেই। এ ধরনের র‌্যাংকিংয়ের জন্য জরিপের স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে জরিপকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছে তথ্য চেয়ে পাঠাবে; যেমনটা আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বা আইটিইউ করে থাকে। কিন্তু ইউপিইউ তো সে ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছ থেকে নেয়নি।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি তো দেশে পোস্টাল সেবার অবনতি দেখি না, বরং উন্নতি দেখছি। ডাক বিভাগের ব্যাপকভাবে আপগ্রেডের কাজ চলমান। ডাক বিভাগকে পুরোপুরি ডিজিটাইজেশন করার কাজ চলছে। এসব উদ্যোগের তথ্য জানা থাকলে ইউপিইউ বাংলাদেশের ডাকসেবা সম্পর্কে এ ধরনের র‌্যাংকিং করত না।

ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সিরাজউদ্দিন বিষয়টি সম্পর্কে বলেন, করোনা মহামারির কারণে গত বছর এবং এ বছরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিমান চলাচলে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিদেশ থেকে এবং দেশ থেকে দেশের বাইরে পার্সেলে বিভিন্ন পণ্য পাঠানো এবং আনার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ি। এ কারণে গত দুই বছরে হয়তো ইউপিইউর র‌্যাংকিংয়ে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’

কিন্তু ডাক বিভাগের এই অবস্থার জন্য অনেকে এ বিভাগের দুর্নীতিকেই দায়ী করতে চান। তাঁরা বলছেন, ডাক বিভাগ হচ্ছে সবচেয়ে পুরনো প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এ বিভাগের শারীরিক উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যেতে পারছে না। গত বছরই এ প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক (ডিজি) সুধাংশু শেখর ভদ্রকে (এস এস ভদ্র) দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিদায় নিতে হয়।

ডাক, টেলিযোগাযোগ বিভাগের এক তদন্ত প্রতিবেদনে ডাক বিভাগের প্রায় ৫৪১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি প্রকল্পের ১৬০ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের ৩৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেলেও সেই টাকায় কেনা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অস্তিত্বহীন কেন্দ্রের নামে বরাদ্দ করা অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি নামের ওই প্রকল্পে বড় ধরনের এই অনিয়ম ও লুটপাটের জন্য তদন্ত প্রতিবেদনটিতে ডাক বিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্রকে দায়ী করা হয়।

ডাক বিভাগের এই অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে। আলোচনায় কমিটির সদস্যরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্রকে অপসারণের সুপারিশ করেন।

এর আগে ২০১২ সালে ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক এস এম সালামকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের জন্য দুদকের মামলায় কারাগারে যেতে হয়।

এসব বিষয় সম্পর্কে আঞ্চলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র রিসার্স ফেলো আবু সাঈদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ডাক বিভাগের দুর্নীতির মূল-উৎপাটন না করে এর উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ বিভাগকে দ্রুত বিকাশমান, সম্ভাবনাময় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল খাত মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সেবায় এ বিভাগের অনুপ্রবেশটিও বর্তমান পরিস্থিতিতে অশুভ বার্তা দিচ্ছে।

এদিকে আজ বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ডাক অধিদপ্তর আজ শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ডাক ভবন অডিটরিয়ামে আলোচনাসভা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্র লিখন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে ডাক বিভাগের সেরা কর্মীদের পুরস্কৃত করা হবে। অনুষ্ঠানে গত ২৬ আগস্ট আইভরিকোস্টের আবিদজানে অনুষ্ঠিত ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের ২৭তম কংগ্রেসে বিপুল ভোটে বাংলাদেশের কাউন্সিল অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিএ) সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হবে।

 



সাতদিনের সেরা