kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

১২০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার দরজা বন্ধ

তৌফিক মারুফ   

৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



১২০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার দরজা বন্ধ

জনবল না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ত্রিশাল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি। ছবি : কালের কণ্ঠ

নওগাঁর নিয়ামতপুরের শিবপুর ইউনিয়নে বছর দুয়েক আগে নির্মাণ করা হয় ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি তিনতলা এই কেন্দ্রটি এখনো চালুই করা যায়নি। কারণ যাঁরা চালাবেন তাঁরা কেউ নেই। পদায়ন হয়নি। এই জেলায় এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে আরো তিনটি। একটি এখনো বুঝে পায়নি জেলা পরিবার কল্যাণ দপ্তর। বাকি দুটি বুঝে পেলেও নেই জনবল। মাঝে মধ্যে আশপাশের অন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে দু-একজন কর্মী ডেকে এনে জরুরি কাজ সারা হয়।

শুধু নওগাঁ নয়, আরো কয়েকটি জেলায় নতুন নির্মিত এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিত্র এমনই। পরিসর বাড়িয়ে নতুন নকশায় প্রায় ১০০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্মাণকাজ হলেও খালি পড়ে আছে। আর আগে করা দোতলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ১২০০ পরিত্যক্ত বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। নতুনগুলো যেমন চালু করা যাচ্ছে না জনবলের অভাবে, তেমনি পুরনোগুলোও জনবলের অভাবে অচল থাকতে থাকতে ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

নওগাঁ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. কস্তুরি আমিনা কুইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভবনগুলো খুবই সুন্দর। ভেতরে আসবাব-যন্ত্রপাতি সবই আছে। কিন্তু জনবল নেই। চালাব কী করে। শুধু নতুনগুলোই নয়, পুরনোগুলোও জনবলের অভাবে চালাতে হচ্ছে জোড়াতালি দিয়ে। পরিত্যক্ত কোনো কোনো পুরনো ভবন আবার তৈরির প্রস্তাব মাঠ পর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’

তিনতলা নতুন ভবনগুলোতে চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রহরী পর্যন্ত সবার জন্য আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। পুরনো ভবনগুলোতেও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (স্যাকমো) ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক (এফডাব্লিউভি) থাকার জন্য আলাদা কক্ষ আছে। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই থাকছেন না। এ ছাড়া দালালের খপ্পরে পড়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে চলে যাওয়াও এসব কেন্দ্র অচল হয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

মাঠ পর্যায়ে আগে করা কেন্দ্রের নাম দেওয়া হয়েছিল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। আর নতুন ১০ শয্যার কেন্দ্রের নাম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে দেওয়া হয় বিনা মূল্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, গর্ভবতী সেবা, গর্ভোত্তর সেবা, এমআর (মাসিক নিয়মিতকরণ) সেবা, সাধারণ রোগীর সেবা, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সেবা, প্রজননতন্ত্রের যৌনবাহিত রোগের সেবা, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাস্তবায়ন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শ দান, খাবার বড়ি, জন্মনিরোধক, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষামূলক সেবা।

নতুনভাবে করা কেন্দ্রগুলোর প্রতিটিতে দুইজন মেডিক্যাল অফিসার, চারজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক (এফডাব্লিউভি), একজন ফার্মাসিস্ট, একজন কম্পিউটার অপারেটসহ ১৪ জনের জনবল কাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন রাজস্ব খাতে আর চারজন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করার কথা।

পুরনো কেন্দ্রগুলোতে স্যাকমো ও এফডাব্লিউভির পদ রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে একজন মেডিক্যাল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন গিয়ে রোগী দেখার কথা।

বরিশাল জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘খুবই মায়া লাগছে ভবনগুলোর পরিত্যক্ত অবস্থা দেখে। তাই মাঝে মধ্যে চেষ্টা করছি বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন ধার করে হাসপাতালগুলো একটু খোলা রাখার। রোগীও ডেকে আনার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের সব জায়গায়ই একই অবস্থা, কোত্থেকে কতজন আনব।’ বরিশালে এখন পর্যন্ত ১০ শয্যার ৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বুঝে পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য জনবল তো দূরের কথা, একজন গার্ড পর্যন্ত নেই—যে এই ভবনগুলো অন্তত পক্ষে পাহারা দিয়ে রাখবে।’

শরীয়তপুরের জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোহেল রেজা বলেন, নতুনগুলো বাদে পুরনো ৩৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে ওই জেলায়। সেগুলো কোনো মতে টেনেটুনে চালিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। ২৫৯টি পদের বিপরীতে আছে ১০৬ জন। ছয় উপজেলায় মেডিক্যাল অফিসার আছেন মাত্র একজন। প্রতিটি উপজেলায় সহকারী পরিচালকের পদ থাকলেও ওই জেলায় একজনও নেই।

সোহেলা রেজা জানান, নতুন পাঁচটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বুঝে পেয়েছেন। কিন্তু জনবল নেই। ধার করে চালু রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

২০০৬ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার সদর ইউনিয়নে স্থানীয় আবদুল আজিজ সরকার ও আফাজ উদ্দিন সরকারের দান করা সাড়ে ৩২ শতাংশ জমি ওপর নির্মিত হয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দোতলা ভবন। ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি জনবল সংকটের ফলে চালু করতে না পারায় দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নষ্ট হচ্ছে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম। এটি পরিত্যক্ত থাকায় মানুষকে ছুটতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

ত্রিশালের ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের বাসিন্দা নাজমুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ব্যথা শুরু হলে উপজেলা হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথেই সন্তান প্রসব হয়ে যায়। শুধু আমার স্ত্রীর বেলায় নয় এমন অনেক ঘটনাই এই এলাকায় ঘটেছে।’

জমিদাতা আবদুল আজিজ সরকারের ছেলে সারোয়ার জাহান জুয়েল বলেন, ‘স্থানীয় লোকজন দ্রুত চিকিৎসা সুবিধা পাবে সেটা চিন্তা করেই আমার বাপ-চাচারা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য জমি দান করেছেন। অথচ দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও আমরা সুবিধা বঞ্চিতই রয়ে গেলাম।’

ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক মেডিক্যাল অফিসার ডা. লুত্ফুর কবীর জানান, ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি থেকে জনবলের অভাবে গ্রামের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকের মাধ্যমে কিছু সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

এ ব্যাপারে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাজমুর রওশান সুমেল বলেন, জনবল নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকবার লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে পাঁচবাগ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনটি কয়েক দশক আগে নির্মিত। আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা না হলেও ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে প্রায় ১৫-২০ বছর। এখন কেন্দ্রের চিকিৎসাসেবা চলে পাশেই অবস্থিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আবাসিক ভবনে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাইন উদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনটি পুনর্নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সারা দেশে ২০১৪ সালের আগেই তিন হাজার ৩৮৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ছিল। সবই একই মডেলে তৈরি। এরপর ২০১৪ সাল থেকে আবার ১৫৯টি ১০ শয্যার নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশু) ডা. মোহাম্মদ শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বহু রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবলের। যারা আছে তারাও সমস্যা তৈরি করার কারণে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। কিছু হয় ব্যবস্থার কারণে।’ তিনি জানান, আগের তিন হাজার ৩৮৪টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বশেষ হিসাব অনুসারে এক হাজার ১৮৪টি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর পেছনে কয়েক ধরনের কারণ আছে। দুই হাজার ৫০০ জন স্যাকমোর বিপরীতে আছেন এক হাজার ৭০০ জন, পাঁচ হাজার ৭০০ জন এফডাব্লিউভির বিপরীতে আছেন চার হাজার ২০০ জন। যাঁরা আছেন তাঁদের অনেকেই যার যার কর্মস্থলে নেই। তদবির করে অন্য জায়গায় চলে যান। এমনকি মাঠ পর্যায়ের অনেক পদ খালি রেখে অনেকে ঢাকায় কাজ করছেন। অন্যদিকে বেশির ভাগ কেন্দ্রে প্রহরী নেই, আয়া নেই। এ ছাড়া কৌশল করে এই কেন্দ্রগুলো অচল করে দেওয়ার মতো অভিযোগ আসে। কারো কারো বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

ডা. শরীফ জানান, ২০১৪ সাল থেকে তৈরি হওয়া ভবনগুলোও জনবলের অভাবে পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই কষ্টের। আমাদের প্রায় আট হাজার পদ খালি আছে। তবে এখন আশা করি এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে। এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে এবং মাঠ পর্যায় থেকেও নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। ১০ শয্যার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জনবল কাঠামো এরই মধ্যে অনুমোদন হয়েছে। করোনার কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে।’ তিনি জানান, আগামী ২২ অক্টোবর এক দফা নিয়োগ পরীক্ষা আছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও গফরগাঁও প্রতিনিধি)

 

 



সাতদিনের সেরা