kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

গুরনাহর সাহিত্যে ব্যক্তির স্মৃতি ও সমষ্টির ইতিহাস

দুলাল আল মনসুর   

৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গুরনাহর সাহিত্যে ব্যক্তির স্মৃতি ও সমষ্টির ইতিহাস

আবদুলরাজাক গুরনাহ তাঁর লেখায় ‘উপনিবেশবাদের প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক ও মহাদেশীয় বিচ্ছিন্নতায় শরণার্থীদের ভাগ্যের আপসহীন এবং করুণা মিশ্রিত উপস্থাপনার জন্য’ এবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন। আবদুলরাজাক গুরনাহর কথাসাহিত্যের কেন্দ্রে থাকে স্মৃতি; স্মৃতির সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে থাকে তাঁর মাতৃভূমি জানজিবারের মানুষের ইতিহাসকে পুনরায় জীবনদানের স্পৃহা। ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানকে তিনি ভেঙেচুরে নতুন রূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে স্মৃতি তাঁর কাছে হাতিয়ারের মতো। ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমষ্টির দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে ইতিহাসের টানাপড়েনটা কেমন সেটাই গুরনাহ ধরার চেষ্টা করেন তাঁর কথাসাহিত্যে। ব্রিটেনে তাঁর নিজের অভিবাসনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে লেখার কাজে। নিজের অভিজ্ঞতার নির্যাসটাই তিনি চরিত্রদের ভেতর ঢুকিয়ে দেন। তাঁর ‘পিলগ্রিমস ওয়ে’ উপন্যাসের দাউদ, ‘ডোটি’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ডোটি এবং ‘অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’-এর কথকের মতো আরো অনেক চরিত্র বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। তাদের সামনে প্রায়ই দেয়ালের মতো জেগে ওঠে বর্ণবাদের পর্দাও। 

কিছুটা চাপা গদ্যে গুরনাহ নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা, হতাশা এবং ব্যর্থ আশার কথা বলেন। কাহিনি বলার মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকার ইতিহাসের পর্দায় আরো রঙিন সুতা জুড়ে দেন তিনি। কাহিনির ভেতর দিয়েই তিনি স্মৃতির ক্ষমতার প্রমাণ রাখেন। বিশেষ করে মানুষের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে স্মৃতি কতটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে তার উদাহরণ দিয়ে যান অনেকটা না খোলা নিম্নস্বরের ভাষ্যে, সঙ্গে থাকে হালকা রস, করুণা এবং সহানুভূতির যোগ। পশ্চিমা ইহবাদী পরিসরে তিনি মুসলিম পরিচয়ের কল্পনা সাজান, তবে পাশে থাকে এক জাতি থেকে আরেক জাতির অভিজ্ঞতায় পাওয়া মানবিক মূলবোধ : যেমন করুণা, উদারতা ইত্যাদি। পরিবর্তনশীল বহু সংস্কৃতির পরিসরে নারী এবং পুরুষের লক্ষণীয় নিজস্ব বিবর্তনের চিত্রও তুলে ধরেন গুরনাহ। তাঁর মুসলিম পুরুষদের দৃষ্টির সামনে থাকে নতুনতর পৌরুষ অর্জনের লক্ষ্য। নারীরা অর্জন করতে চায় নিজেদের মতো নতুন এবং সমষ্টিক পরিসর।

তাঁর প্রথম তিনটি উপন্যাস ‘মেমোরি অব ডিপারচার’, ‘পিলগ্রিমস ওয়ে’ এবং ‘ডোটি’। এই উপন্যাসগুলোয় তিনি সাম্প্রতিককালে ব্রিটেনে অভিবাসনের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। গুরনাহর চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’। বুকার এবং হুইটব্রেড উভয় পুরস্কারের মনোনয়ন পায় তাঁর এই উপন্যাসটি। ‘প্যারাডাইস’ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। এই উপন্যাসটির পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছেন প্রথম মহাযুদ্ধকালের পূর্ব আফ্রিকা।

আফ্রিকার সাহিত্যের সমালোচক জে ইউ জ্যাকবস মন্তব্য করেন, গুরনাহর এই উপন্যাসটি যোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। জ্যাকবস মনে করেন, এ উপন্যাসের চরিত্র আজিজের কঙ্গো যাত্রার মাধ্যমে ওই এলাকা সম্পর্কে বিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রচলিত পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন গুরনাহ। ইংরেজ কথাসাহিত্যিক অনিতা ম্যাসন বলেন, এই উপন্যাসের অর্থের অনেক স্তর রয়েছে। একদিকে শৈল্পিক সৌন্দর্যে ভরা, অন্যদিকে নতুনত্বের বৈশিষ্ট্যেও উত্তুঙ্গ এই উপন্যাস।

২০০৫ সালে প্রকাশ করেন তাঁর সপ্তম উপন্যাস ‘ডিসার্শন’। এ উপন্যাসটির মাধ্যমে গুরনাহ ইতিহাসকে উপন্যাসের অবয়বে এনেছেন কথাসাহিত্যের উপভোগ্য মুনশিয়ানায়। এখানে আপাত প্রথম পুরুষের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সর্বজনীন অভিজ্ঞতা ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। এখানে বিশেষ চরিত্র ফরিদা, আমিন, জামিলাসহ আরো কজন মানুষের ব্যক্তিগত আনাগোনার মধ্যেই চিরন্তন মানুষ ও সময়ের কথা বলা হয়েছে। একই কাহিনির মধ্যে অনেকের কথা থাকতে পারে। কাহিনি কিছু মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েও সবার জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। সীমাবদ্ধ একটি সময়ের পরিচয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘ পরিসরের কাল—এমন সত্যের উদাহরণ আছে তাঁর এই উপন্যাসে।

গুরনাহ মনে করেন, কোনো জায়গা শুধু ভৌগোলিক অবস্থানে স্থবির হয়ে পড়ে থাকে না। বরং সেখানকার মানুষের সঙ্গে তাদের পরিবর্তিত স্থানেও চলে যেতে পারে। অর্থাৎ অতীতের স্মৃতির সঙ্গে মিশে মানুষের মনের ভেতর জেগে থাকে তার অতীতের প্রিয় জায়গাটি। গুরনাহর উপন্যাস ‘দ্য লাস্ট গিফ্ট’-এর প্রধান চরিত্র আব্বাসের ব্যর্থতার চিত্র দেখানোর সময় তাঁর অতীতের কথা ফিরে আসে বর্তমানের সমান্তরালে। সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করার এক পর্যায়ে ষাট বছর বয়সী আব্বাস অসুস্থ হয়ে পড়েন। পেছনের দিকের ছবিগুলো যখন সামনে আসতে থাকে পাঠক দেখতে পান, আব্বাস একসময় ছিলেন পূর্ব আফ্রিকার ভারত মহাসাগরীয় উপকূলীয় এলাকায়। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির সঙ্গে সমান্তরালে চলে আসে তাঁর অতীতের সংকুচিত অবস্থা : পূর্ব আফ্রিকার ব্যাপক পরিসর থেকে সংকুচিত হয়ে ক্ষুদ্র জানজিবারে।

ইতিহাস, স্মৃতি, অভিবাসনের কারণ, অভিজ্ঞতা এসবই জুড়ে থাকে আবদুলরাজাক গুরনাহর কথাসাহিত্যের জগৎ। ইতিহাসের কঠিন জমিনের সুফলা অবস্থাটাই দেখতে পান গুরনাহর পাঠক। অন্যভাবে বলা যায়, তিনি কথাসাহিত্যের অবয়ব তৈরি করেন ইতিহাসের মাটি দিয়ে।

 



সাতদিনের সেরা