kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘টিকা উৎসবে’ বিপুল সাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘টিকা উৎসবে’ বিপুল সাড়া

এক দিনে সারা দেশে ৮০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার বিশেষ কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অনেকটা উৎসবের আমেজে এই কার্যক্রমে অংশ নেয় মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিনে দেশজুড়ে এই বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় এক দিনে ৭৫ লাখ ডোজ ও নিয়মিত আরো পাঁচ লাখ ডোজ মিলে মোট ৮০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। গতকাল সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় টিকাদান কার্যক্রম। কোথাও কোথাও একটানা রাত পর্যন্তও চলে টিকা দেওয়ার কাজ।

দেশের সব ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি, বেসরকারি, স্বেচ্ছাসেবীসহ প্রায় ৮০ হাজার কর্মী অংশ নিয়েছেন। এই কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে হয় কি না, তা দেখার জন্য সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন। যদিও ঢাকায় কোনো কোনো কেন্দ্রে ভিড় তুলনামূলক কম দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে প্রচারে ঘাটতি ছিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ কেউ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদনগর বউবাজার আরবান হেলথ কেয়ার কেন্দ্রে টিকা নিতে আসা গৃহিণী রেনেসাঁ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম, কিন্তু মেসেজ আসছিল না। এখন প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে টিকা পেয়ে গেলাম। খুবই খুশি লাগছে।’ স্থানীয় কাউন্সিলর মোসাদ্দেক হোসেন জাহিদ বলেন, ‘আজকে সাড়ে ৩০০ টিকা দেওয়া হবে। আগামীকালও (আজ) একই পরিমাণ টিকা দেওয়ার কথা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যার জন্মদিনে ওয়ার্ডবাসীর জন্য এটি অনেক বড় পাওয়া।’

বিকেল ৩টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটারা খিলবাড়ীর টেক এলাকার টিকাদান কেন্দ্রে লোকজনকে টিকা নিয়ে স্বস্তিতে ফিরতে দেখা গেছে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে একে টিকা নিয়েছে তারা। টিকা নিতে আসা ব্যক্তিদের সহযোগিতার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকও ছিলেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন কিছুক্ষণ পর পর।

ঢাকায় কর্মসূচির অগ্রগতি দেখতে দুপুর ১২টায় ধানমণ্ডির একটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন মিয়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশিদ আলমসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। এ সময় মুখ্য সচিব বলেন, ‘সারা দেশে একযোগে টিকাদান কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পালিত হচ্ছে। দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। এই কর্মসূচি আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চলমান থাকবে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কর্মসূচি অনুসারে দেশের চার হাজার ৬০০ ইউনিয়ন পরিষদ, এক হাজার ৫৪টি পৌরসভা, সিটি করপোরেশনগুলোর ৪৪৩টি ওয়ার্ডে টিকা দিতে ৩২ হাজার ৪০৬ জন সরকারি ও ৪৮ হাজার ৫৯ জন স্বেচ্ছাসেবীসহ প্রায় ৮০ হাজার কর্মীকে নিয়োগ করা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি বুথ, পৌরসভায় একটি করে এবং সিটি করপোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে তিনটি করে বুথ করা হয়েছে। আগেই জানানো হয়, সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত কেন্দ্রে টিকা নিতে আগ্রহী নিবন্ধনকৃত মানুষ থাকবে এবং টিকা থাকবে, ততক্ষণ টিকাদান চলবে। টিকাদানের এই বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় শুধু প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। পরবর্তী মাসে একইভাবে বিশেষ কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হবে।

টিকাদান কর্মসূচি শুরুর প্রথম দুই ঘণ্টা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী নাগরিক, নারী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের টিকা দেওয়া হয়। তবে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের টিকা দেওয়া হয়নি।

বগুড়া শহরে থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নের ঘাগুড়দুয়ার উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে সকাল ১১টায় দেখা যায়, সবার হাতে টিকার কার্ড। তারা দল বেঁধে উৎসবমুখর পরিবেশে টিকা নিতে যাচ্ছে। প্রথমে দেখলে মনে হবে, তারা হয়তো কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে। ওই কেন্দ্রে প্রথম টিকা নিয়েছেন ওই ইউনিয়নে রায়নগর গ্রামের মুদি দোকানি আলতাফ মিয়া (৩৮)। টিকা গ্রহণের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, করোনা সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে টিকার বিকল্প নেই।

বগুড়া জেলার ১২ উপজেলার ১০৯টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভার নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রসহ ১৫৫টি কেন্দ্রে এক লাখ ৮৭ হাজার সিনোফার্মের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়।

বগুড়ার সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এক হাজার ৫০০ করে মোট এক লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ জন, বগুড়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ডে ১০ হাজার ৫০০ জন, শেরপুর এবং সান্তাহার পৌরসভায় ছয় কেন্দ্রে তিন হাজার জন টিকা পাচ্ছে।

রংপুরে এক লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ড ও আট উপজেলার ৭৬টি ইউনিয়নসহ মোট ১০৯টি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়।

রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. হিরম্ব কুমার রায় জানান, নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে টিকা দেওয়া হয়।

কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলার ৬৬টি ইউনিয়নের এক লাখ মানুষ টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছে। জেলার বিভিন্ন টিকাকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে দলে দলে মানুষ টিকাকেন্দ্রে আসে। সকালে জেলা সদরের উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ও কলকাকলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় টিকাকেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায়, সেখানে কয়েক হাজার মানুষ টিকা নিতে এসেছে। যাদের বেশির ভাগই নারী।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের টিকাকেন্দ্রে কথা হয় আবুল বাসার নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোমবার সকালে আমি রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম, আজ সকাল ১০টার দিকে মেসেজ পেয়েই আমি টিকা নিতে এসেছি।’

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি টিকাকেন্দ্রে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল।

বাগেরহাটের ফকিরহাটে বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে টিকা নিতে ছুটে আসে মানুষ। সকাল থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে টিকা নিতে আসা মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, ফকিরহাটে আটটি ইউনিয়নে আটটি কেন্দ্রে ২৪টি বুথ করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে এক হাজার ৫০০ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়। এ উপজেলায় মোট ১২ হাজার লোক টিকা নিয়েছে।

এদিকে রাত ১২টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (টিকা কার্যক্রম) ড. শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো সব হিসাব এসে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। তাই আমরা হিসাব সম্পন্ন করতে পারছি না। তবে যতটুকু আভাস পাওয়া যাচ্ছে, টার্গেট পূরণ পুরোটা না হলেও মোটামুটি ভালোই হয়েছে।’

(প্রতিবেদন তৈরির জন্য তথ্য দিয়েছেন রংপুর, বগুড়া, কুষ্টিয়াসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)

 



সাতদিনের সেরা