kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভাটা না এলে জ্বলে না চুলা

নিখিল ভদ্র, উপকূল থেকে ফিরে   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভাটা না এলে জ্বলে না চুলা

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন দ্বীপ ইউনিয়ন পদ্মপুকুর। এর ঠিক বিপরীতে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন। দুটি ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থান বন্যাতলায় খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙেছিল ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্ফানে। এখনো সেই বাঁধ মেরামত হয়নি। ফলে প্রতিদিন দুবার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে দুটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন কাজ চলে জোয়ার-ভাটা ঘিরে। ভাটা না এলে চুলা জ্বলে না। এমনকি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে করতে হয় ভাটার অপেক্ষা। আর নারীরা থাকেন রাতের অপেক্ষায়। গত ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে এই দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।

সম্প্রতি দুর্গত ওই এলাকায় গিয়ে এমনই ছবি চোখে পড়েছে। প্রতিবেদকের বহনকারী স্পিডবোটটি দুপুর ১২টার দিকে যখন পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বন্যাতলা গ্রামের বেড়িবাঁধে গিয়ে থামল, তখন শুরু হয়েছে জোয়ার। যে অংশে স্পিডবোট থেমেছে, ঠিক সেখানটায় বাঁধের কয়েক শ মিটার এখনো ভাঙা। যেন খোলপেটুয়া নদী থেকে আরো একটি ছোট নদীর সৃষ্টি হয়েছে। সেখান দিয়েই হু হু করে জোয়ারের পানি ঢুকছে লোকালয়ে। প্লাবিত হচ্ছে বন্যাতলা গ্রামসহ আশপাশের এলাকা।

স্পিডবোট থেকেই দেখা যায়, নদী-তীরবর্তী বেড়িবাঁধের ওপরে শত শত বিভিন্ন বয়সী অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশু যেন কিসের অপেক্ষায় আছে। বোট থেকে নামতেই দেখা গেল বাঁধের ভেতরের ভয়াবহ চেহারা। কোনো বাধা ছাড়াই জোয়ারের পানি ঢুকছে বসতভিটায়। আধাপাকা বাড়িগুলোর বেশির ভাগেরই দরজা-জানালা নেই। খসে পড়েছে দেয়াল। ভেঙেছে কোনো কোনো ঘরের বাঁশের বেড়াও। যে দুই-একটা বাড়ির অবস্থা কিছুটা ভালো সেগুলোতে ঘরের ভেতর মাচান বেঁধে অবস্থান করছে লোকজন। তবে বেশির ভাগ লোকজনই বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে।

ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেগমের সঙ্গে বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে কথা হয়। কোলে চার বছরের নাতি। কী অবস্থা, কেমন আছেন? এমন প্রশ্ন করতেই আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘কেমন আর থাকব বাবা, জোয়ার এলেই ঘর থেকে বের হয়ে এই ভাঙা বাঁধের ওপর আসি। আবার পানি নামলে ঘরে যাই। রান্নাবান্না করি। দিনে দুইবার জোয়ারের পানিতে ঘর ভেসে যায়।’

পাশে থাকা পঞ্চাশোর্ধ্ব নুরজাহান বেগম বললেন, ‘বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে এই পানি আমাদের সঙ্গী। বাঁধ নির্মাণ না করায় গত ১৬-১৭ মাস ধরে আমরা এই বাঁধের ওপরই হাঁটাচলা করি। রান্নাবান্না সবই এখন চলে জোয়ার-ভাটার নিয়মে। ভাটার সময় পুরুষরা দূরে গিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলেও নারীদের অপেক্ষা করতে হয় রাতের আঁধারের জন্য।’

সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তামিম হোসেন গেল দেড় বছরে করোনার কারণে স্কুলে যায়নি। সে জানায়, এমনিতেও স্কুল তলিয়ে আছে। সবচেয়ে সমস্যা প্রস্রাব-পায়খানার। মানুষ মারা গেলে কবরের জন্য জোয়ার-ভাটা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলে জানালেন স্থানীয় আশরাফ উদ্দিন।

বন্যাতলা গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, ভাঙা বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে। গোসল, ধোয়া-মোছাসহ নিত্যদিনের সব কাজ নোনা পানিতেই সারতে হয়।

একই অবস্থা খুলনার কয়রার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরী এলাকার। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের চার মাস পার হলেও শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ না হওয়ায় প্রতিদিন দুবার করে জোয়ারে ডুবছে ওই এলাকা। জোয়ার-ভাটার খেলায় ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে বেড়িবাঁধে খুপরি ঘর বেঁধে বাস করছে স্থানীয়রা। কেউ বা আবার নোনা পানির ওপর টংঘর বেঁধে বাস করছে। সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে পানিবন্দি মানুষ।

বাঁধের ওপর বসবাসকারী গাতিরঘেরী গ্রামের অলোকা রানী বলেন, ‘ঘরবাড়ি হারিয়ে চার মাস রাস্তায় আছি। যেটুকু জমি ছিল, ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে তা ভেঙে নদীতে চলে যায়। কয়দিন আগে তিন কাছা জমি কিনে একটা ঘর বাঁধা শুরু করেছিলাম। সেই ঘরে এক রাতও থাকতে পারিনি। সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বাঁধ না হলে ঘরে ফিরতে পারব না।’

বাঁধে আশ্রয় নিলেও জীবিকা বন্ধ একই গ্রামের সুব্রত সরকারের। তিনি বলেন, ‘ঝড়ের পর থেকে সুন্দরবনে পাস পারমিট বন্ধ, দিনমজুরের কাজও হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন পার হচ্ছে।’

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গেল ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে প্রবল জোয়ারে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানিতে তলিয়ে যায় কয়রার চারটি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রাম। শাকবাড়িয়া ও কপোতাক্ষ নদীর প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ছাপিয়ে লোকালয়ে লবণ পানি ঢুকে যায়। ভেঙে যায় বেড়িবাঁধের ১২টি পয়েন্ট। বিধ্বস্ত হয় এক হাজার ২৫০টি ঘরবাড়ি। তলিয়ে যায় আড়াই হাজারের বেশি মাছের ঘের। নষ্ট হয়ে যায় ১৫ হেক্টর জমির কৃষি ফসল। এরই মধ্যে ভেঙে যাওয়া বাঁধের ১০টি পয়েন্টে বাঁধা সম্ভব হলেও দুটি পয়েন্ট এখনো অরক্ষিত। এই দুই জায়গায় দেড় শতাধিক পরিবার বেড়িবাঁধে বাস করছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় যারা ঘরবাড়ি হারিয়ে উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে তাদের সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। গাতিরঘেরীর ভেঙে যাওয়া বাঁধের কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই মানুষগুলো ঘরে ফিরতে পারবে।’

খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা) আসনের সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘কয়রার ভেঙে যাওয়া গাতিরঘেরী এলাকা কয়েকবার পরিদর্শন করেছি। সেখানকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে গাতিরঘেরীর বাঁধের কাজের ব্যাপারে দরপত্র আহবান করা হয়েছে।’

শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আতাউল হক দোলন বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত আম্ফানসহ বড় বড় পাঁচটি দুর্যোগ মোকাবেলা করেছি। প্রতিনিয়ত জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দুর্দশা লাঘবের চেষ্টা করেছি। এরই মধ্যে পদ্মপুকুরের বন্যাতলা এলাকায় জাইকার অর্থায়নে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আগামী মাসে কাজ শুরু হতে পারে।’

শ্যামনগর ও কয়রায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) লির্ডাস। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় জীবন-জীবিকা রক্ষায় প্রয়োজন টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। একই সঙ্গে জোয়ারের পানিতেও টিকে থাকে এমন শৌচাগার করতে হবে। এরই মধ্যে লির্ডাসের পক্ষ থেকে উপকূলীয় এলাকা গাবুরা, কাশিমারী ও আশাশুনিতে ৪৫০টি টয়লেট তৈরি করা হয়েছে, যা ইয়াসের আঘাতেও টিকে আছে। একইভাবে ঘরগুলোও দুর্যোগ সহনীয় করা দরকার।’



সাতদিনের সেরা