kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ফের দখল বুড়িগঙ্গাপার মাস্টারপ্ল্যান বাধাগ্রস্ত

জহিরুল ইসলাম   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফের দখল বুড়িগঙ্গাপার মাস্টারপ্ল্যান বাধাগ্রস্ত

বেশ ঘটা করেই নদীপারের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। ওই সময়ের অভিযান দেখে আশাবাদী হয়েছিল সাধারণ মানুষ। এখন ‘উচ্ছেদমুক্ত’ বুড়িগঙ্গা আবার দখলবাজদের পেটে। কামরাঙ্গীর চর এলাকা থেকে গতকাল তোলা। ছবি : শেখ হাসান

বুড়িগঙ্গা নদীর আদি স্রোতধারা বা চ্যানেলের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাধার মুখে পড়েছে দখলবাজদের ফের দৌরাত্ম্যে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বুড়িগঙ্গার দখল হওয়া জায়গাগুলো উদ্ধার করে নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বাস্তবায়নে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরই মধ্যে সংস্থাটি হাতিরঝিলের আদলে মাস্টারপ্ল্যানও (খসড়া) তৈরি করেছে। এই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আদি চ্যানেল খনন ও অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে, যাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ডিএসসিসি সূত্র জানায়, এরই মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাউন্সিলর থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে চলছে বৈঠক।

তবে এত আয়োজনের মধ্যে সবার ভয় দখলদারদের দৌরাত্ম্য। নদী ও এর শাখা-উপশাখার জমি দখলবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। উদ্ধারের পর পুনরায় সেসব জমি কৌশলে ভাড়া দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। দেখা যায় যে একদিকে উচ্ছেদ হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন নতুন জায়গা দখল হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই দখলের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীরাও দখলদারিতে আছেন এগিয়ে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, লালবাগ, কামরাঙ্গীর চর, হাজারীবাগ এলাকার বিভিন্ন মৌজা ঘিরে বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেল। এখন এই চ্যানেলটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। চ্যানেলে পানিপ্রবাহ নেই। জমে থাকা কালো পানিতে মশার লার্ভার স্তর বসেছে। এর মধ্যে কামরাঙ্গীর চরের সেকশন থেকে হাজারীবাগের কালুনগর পর্যন্ত আদি চ্যানেল খালে রূপ নিয়েছে। কিন্তু কালুনগর থেকে রায়েরবাজার পর্যন্ত আদি চ্যানেলের তেমন কোনো অস্তিত্ব বা চিহ্ন নেই। শুধু ছোট একটি খাল ঘুরে রায়েরবাজারের দিকে গেছে। এর পরও দখলে অস্তিত্বহারা বুড়িগঙ্গার পারে নগরবাসীর প্রশান্তির প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে দখলকৃত জায়গায় গড়ে উঠেছে পার্ক, বহুতল ভবন, শিল্প-কারখানা, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা অবকাঠামো।

দেখা যায়, বাবুবাজার ব্রিজ থেকে গাবতলী পর্যন্ত রাজধানীর দক্ষিণ-পশ্চিমের বেড়িবাঁধের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ-পশ্চিমের শাখা নদীর লালবাগ, কামরাঙ্গীর চর, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর অংশের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ কাঠা (৩৫০ একর) জমি এরই মধ্যে দখল হয়ে গেছে। লালবাগ-চকবাজারের বেড়িবাঁধসংলগ্ন কামালবাগ-আলীরঘাট, শহীদনগর, আমলীগোলা, কামরাঙ্গীর চরের মুসলিমবাগ ঠোঁটা থেকে বেড়িবাঁধঘেঁষা লোহারপুল, রহমতবাগ, ব্যাটারিঘাট, কুড়ারঘাট, পূর্ব রসুলপুর, নবাবগঞ্জ সেকশন, কোম্পানীঘাট পাকা ব্রিজঘেঁষা এলাকায় বালু আর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলে নদী ভরাট করে দোকানপাট ও ট্রাক-লেগুনাস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে।

কোথাও আবার ময়লা দিয়ে ভরাট জায়গার ওপর মাটি ফেলে দখল পাকাপোক্তের কাজ চলছে।

কামরাঙ্গীর চর লোহার ব্রিজের পাশে ভরাট জায়গার নদীর প্রান্তে দেখা যায়, একচালা একটি ছাউনিতে চার নারী ইট ভাঙার কাজ করছেন। কাদের কাজ করছেন—জানতে চাইলে রহিমা নামের একজন বলেন, ‘বাবারে ইট ভাইঙ্গা বিক্রি করি। এই জায়গায় কারোর কাম করি না।’ এ জায়গার ভাড়া কত দেন, কাকে দেন—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাগো নাম কইলে আমার জান থাকবে? আমি এখানে থাকতে পারমু?’। শরীয়তপুরের এই নারী দীর্ঘ ৩০ বছর থাকেন কামরাঙ্গীর চর এলাকায়।

আপনাদের বসা জায়গায় যে নদী ছিল সেটা কি জানেন—প্রশ্নে আয়েশা নামের একজন বলেন, ‘আল্লাহ কী কন! জানমু না। এই পারের থেইক্কা চারানা (২৫ পয়সা) দিয়া চইলা যাইতাম। অষ্টাশির (১৯৮৮) বন্যার আগেও এই জায়গায় নৌকা চলত।’ স্থানীয়রা জানায়, তিন যুগ আগেও আটানা (৫০ পয়সা) দিয়ে শহীদনগর দারার বাড়ি যাওয়া যেত।

কে বা কারা বুড়িগঙ্গার জায়গা দখল করে ভাড়া নিচ্ছে সে বিষয়ে দোকানিরা কিছু বলতে চান না। জানা যায়, আগের দখলদাররাই কৌশলে রিকশার গ্যারেজ, ভাঙ্গারির দোকান, পাইকারি বাঁশের দোকান, বালু, সিমেন্টের দোকান থেকে শুরু করে চায়ের অস্থায়ী দোকান হিসেবে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। কামালবাগ থেকে শুরু দখলদারদের দৌরাত্ম্য। কোম্পানীঘাটের পর দখলের আরো ভয়াবহ অবস্থা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা, শিশু পার্ক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে দখলদাররা। নদী পারে ‘নৌকার ঘাট’ নাম থাকলেও বেশির ভাগ ঘাটেই এখন আর নৌকা নেই। হয়ে গেছে পাকা সড়ক। কামালবাগের পর ইসলামবাগ ঘাট, শহীদনগর ঘাটেই শুধু নৌকা চলতে দেখা গেল। আর কোম্পানীঘাট এলাকায় এখন প্রায় ৩০ ফুট চওড়া সড়ক।

কামরাঙ্গীর চর ব্রিজের গোড়া থেকে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চালানো হচ্ছে পিকআপ, ট্রাকসহ কাভার্ড ভ্যানের স্ট্যান্ড। মাঝখানে ‘নূরে মদিনা’ নামে একটি জামে মসজিদ।

স্থানীয় কয়েকজন জানায়, প্রভাবশালী কয়েকজন মিলে শুরুতে এই জায়গায় ময়লা ফেলা শুরু করে। পরে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। আরেকটু সামনে শহীদনগর বউবাজারসংলগ্ন বেড়িবাঁধে ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ড। কয়েক হাত সামনেই দেখা মেলে সরু হয়ে আসা বুড়িগঙ্গার শহীদনগর নৌকাঘাট। লালবাগ বড় মসজিদ ঢাল ও পূর্ব রসুলপুর ২ নম্বর গলির সংযোগস্থল হাফেজ মুসা ব্রিজ, নবাবগঞ্জ সেকশন ও কামরাঙ্গীর চর রনি মার্কেটের সংযোগস্থলে নির্মিত পাকা ব্রিজঘেঁষা বিশাল এলাকা দখল করে মার্কেট ও বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। আমলীগোলা ঢালসংলগ্ন বেড়িবাঁধঘেঁষা বুড়িগঙ্গার বুকে ময়লা-আবর্জনা ফেলে স্তূপ করে সেখানে ট্রাকস্ট্যান্ড এবং পাশেই নদীর বুকে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নদীর বুক দখল করে পাঁচতলা পাকা দালান ও টিনশেড ঘরবাড়ি বানানো হয়েছে। তবে বালুঘাট স্ট্যান্ডের পর ময়লার ভাগাড় পার হয়ে নদীর দিকে গেলে ১৫ ফুটের বুড়িগঙ্গার দেখা মেলে।

দেখা যায়, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের অফিসের পর একটি বলপেন কম্পানির গড়ে তোলা শিশু পার্ক আর নিজস্ব কারখানার কারণে সেখানে অস্তিত্ব হারিয়েছে বুড়িগঙ্গা। সামনে গিয়ে স্থানীয় একটি মাদরাসা ও পাশের ভরাট জায়গার মাঝখানে দেখা মেলে বুড়িগঙ্গার। তবে সেখানেও লাগানো হয়েছে মালিকানার সাইনবোর্ড। এম এ সায়েদ নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জায়গাটি নিজের চিহ্নিত করে সাইনবোর্ডটি লাগিয়েছেন।

এভাবেই মোহাম্মদপুর পর্যন্ত বেড়িবাঁধের পাশে দখলকৃত জায়গায় দেড় শতাধিক রিকশার গ্যারেজ, ভাঙ্গারির দোকানসহ বিভিন্ন রকমের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে বুড়িগঙ্গা গিলে ফেলা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, এসব দোকান থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে। জানা যায়, প্রশাসনের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে দখলদাররা মালিকানার কাগজপত্র বানিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করার পর তা দখলে নিয়ে পর্যায়ক্রমে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে সটকে পড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী উদ্ধার করা জমি কাজে লাগাতে নদীর দুই পারে নাগরিকদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তৈরি করতে হাতিরঝিলের আদলে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে আদি বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানীর আশপাশের সব নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীসহ ঢাকার দুই মেয়রকে নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। এরই মধ্যে একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘লালবাগ-নবাবগঞ্জ পার্কসংলগ্ন বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলটি দখল হয়ে গেছে। আগে এখানে লঞ্চ, স্টিমার, ইঞ্জিনবোট নোঙর করত। সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে স্বল্প খরচেও নদীর নাব্যতা ফেরানো যায়। ড্রেজিং দরকার হয় না। এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি তুলে নদীর স্রোতের স্বাভাবিক ধারা ফিরিয়ে আনা যায়।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার দখল-দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নৌ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। এরপর চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি সোয়ারীঘাট থেকে দখল-দূষণ রোধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডাব্লিউটিএ ও পাউবো। টানা তিন মাস উচ্ছেদ অভিযান চললেও হঠাৎ তা থেমে যায়। এখনো নদীর বুক দখল করে গড়ে ওঠা অসংখ্য আবাসন ও শিল্প-কারখানা উচ্ছেদ করা হয়নি।



সাতদিনের সেরা