kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

অনলাইনে বেশি লাভের টোপ

হাজার কোটি টাকা লোপাট

জহিরুল ইসলাম   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনলাইনে বেশি লাভের টোপ

গুগল প্লে স্টোর বা আইফোনের অ্যাপ স্টোরে তাদের অ্যাপস পাওয়া যায় না। অ্যাপ চালাচালি চলে ইউটিউব, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে তা ইনস্টলের পর রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা মাত্র আপনি তাদের ফাঁদে পা দিলেন। জিরো লেভেল বা শূন্য ধাপ থেকে অ্যাপ অনুযায়ী থাকে বেশ কয়েকটি ধাপ। প্রতিটি ধাপে বিনিয়োগ অনুযায়ী দেওয়া হয় ১২ গুণ পর্যন্ত লাভের টোপ। প্রথম কয়েকটি ধাপে আপনি লাভসহ বিনিয়োগ ফেরতও পাবেন। এর ধারাবাহিকতায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করার পর অ্যাপ অকার্যকর দেখাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উধাও এসংক্রান্ত সব লিংক।

গত দুই মাসে এমন অন্তত আটটি অ্যাপভিত্তিক কম্পানি উধাওয়ের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক লাখ সদস্যের কাছ থেকে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এসব প্রতারকচক্র। সম্প্রতি এই বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তৎপর হলেও কাউকে ধরা যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই ভিন্ন নামে পুরনো চক্রসহ নতুন প্রতারকচক্র অনলাইনে ফাঁদ পাতছে।

গত দুই মাসে উধাও হওয়ার তালিকায় রয়েছে গোল্ডরাশ, টুলাইক, গোল্ডলাইন, এসপিসি ওয়ার্ল্ড, ওয়ার্ল্ডবিজ ও সানটোন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এমন প্রতারণা নতুন নয়। গত এক বছরে এমন প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক নাম। এখনো অর্ধশতাধিক কম্পানি নানা উপায়ে প্রচার চালিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে। এদের মধ্যে রয়েছে বিডি লাইক, ইফোর্ডবিডি, জিওনেস, লাইক এইচএমপি ওয়ার্ল্ড, টুলাইক ওয়েব, বিডি ক্যাশ রিওয়ার্ডস, স্টারস ফেয়ার২৫.কম, ওয়ালমার্ট গ্রুপ, জিএসসিবিডি, ইউকে লাইক প্রভৃতি। গত কয়েক দিনে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে টুলাইকসিজি, এয়ারড্রপ, ল্যাকবিটসহ আরো কয়েকটি।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিন মাস আগে অনলাইনে মার্কেটিং শুরু করে গোল্ডরাশ। লোভনীয় অফারে দুই মাসে তাদের সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬০ হাজার। অ্যাপভিক্তিক এই কম্পানিটি গ্রাহকের বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। এতে শুরু থেকে নেতৃত্ব দেন শোভন প্রিন্স নামের একজন বাংলাদেশি ইউটিউবার। ‘ইনকাম বাংলা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে প্রচার চালান তিনি। কম্পানি উধাও হওয়ার পর চ্যানেল থেকে সব ভিডিও মুছে ফেলেন; ফেসবুকও অকার্যকর করে রাখেন শোভন। তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি।

জানা যায়, মাত্র ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অফারের বিপরীতে গ্রাহকদের নানা অঙ্কের লাভ দেওয়া হতো। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখানো বাবদ আয়ের কথা বলা হলেও মূলত ফাঁদ পাতা হয়। চম্পট দেওয়ার ১৫ দিন আগে গোল্ডরাশ ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে ৩০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত প্যাকেজের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। হঠাৎ সব ধরনের সেবা বন্ধ করে উধাও হয়ে যায় তারা। একই সময়ে উধাও হয়ে যায় গোল্ডলাইন নামের আরেকটি অ্যাপভিত্তিক কম্পানি। এটির গ্রাহক সংখ্যা ৩০ হাজারের মতো। তবে এই কয়েকটি বন্ধ হওয়ার কিছুদিন আগেই নতুন করে ফাঁদ পাতে টুলাইক নামে আরেকটি অ্যাপ। মাত্র ২৩ দিনে প্রায় ৫০ হাজার সদস্য থেকে কয়েক শ কোটি টাকা হাতিয়ে কেটে পড়ে তারা। টুলাইক বন্ধ হওয়ার দিনই সক্রিয় হয় টুলাইকসিজি ও সানটোন। এরই মধ্যে লাপাত্তা দুটিই। গতকাল সোমবার ট্রাস্টওয়ার্ল্ড নামে আরেকটিকে সক্রিয় দেখা যায়। গত সপ্তাহেই লাপাত্তা হওয়া টুলাইকের কাছে প্রতারিত হওয়া হায়দার বাবু নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘ভাই, এমনটা হবে ভাবি নাই। ভাবছিলাম অন্তত জমা দেওয়া টাকাটা পামু। টুলাইকওয়ালারা আবার সানটোন নামে কাজ শুরু করছে। জানি, কিন্তু কিছু করতে পারতেছি না।’

কয়েকজন গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবার প্রচারপ্রক্রিয়া প্রায় একই রকম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের অ্যাপ শেয়ার করা। লোভনীয় অফার দেওয়া।

বিনিয়োগকারীরা জানান, ২০ ডলার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার ডলারের প্যাকেজ ছিল টুলাইকে। এ ছাড়া বিন্দাসওয়ার্ক ডটকম নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও গ্রাহকদের টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এটির গ্রাহক সংখ্যাও ছিল ৬০ হাজারের বেশি। ২০ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন একেকজন গ্রাহক।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোভের কারণে প্রতারকরা বারবার সুযোগ নিচ্ছেন। আর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় প্রতারকদের সাহস দিন দিন বাড়ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ কেউ ক্ষতি পোষাতে আবারও টাকা বিনিয়োগ করছেন।

জানা গেছে, সম্প্রতি অনলাইন ব্যবহার করে এমএলএম প্রতারণায় জড়িতদের ধরতে মাঠে নেমেছে  র‌্যাব ও সিআইডি।  র‌্যাব সূত্র জানায়, প্রায় একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হচ্ছে নামসর্বস্ব কিছু কম্পানি, যাদের ধরার চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই প্রতারণায় দেশি-বিদেশি চক্র জড়িত। ইনসাফ সেভেন নামে একটি তথাকথিত কম্পানির বিরুদ্ধেও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হাসান মাহমুদ। আট মাসে কম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিনিয়োগকারী। তিনটি ওয়েবসাইট, বেশ কিছু ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ খুলে প্রচার চালায় তারা। দুই হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকার প্যাকেজ ছিল তাদের। একেকজন গ্রাহকের একাধিক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতারিত গ্রাহকরা বলছেন, ইনসাফে প্রায় ১১ লাখ অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সব মিলিয়ে ইনসাফ সেভেন প্রায় ৮০ কোটি টাকা নিয়েছে গ্রাহকদের কাছ থেকে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইনসাফ সেভেনের মালিক হাসান মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। গত বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর কলাবাগান এলাকা থেকে ই-কমার্সের নামে যাত্রা শুরু করে এমএলএম কম্পানি এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাত্র ১১ মাসে তারা ২৬৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে রয়েছেন আল আমিন প্রধান। এমএলএম ব্যবসা ও প্রতারণার দায়ে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আল আমিনসহ প্রতিষ্ঠানটির ছয়জন গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু দুই মাসের ব্যবধানে জামিনে বের হয়ে আবারও এসপিসির কার্যক্রম শুরু করেন আল আমিন প্রধান।

জানতে চাইলে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদর দপ্তরের সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমএলএমের একটি নতুন ধরন শুরু হয়েছে অনলাইনের মাধ্যমে। শর্টকাটে টাকার মালিক হতে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেকে তাদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। কারা কোথা থেকে এগুলো পরিচালনা করছে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিস্তারিত এখনই বলা যাচ্ছে না।’ সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোথাও বিনিয়োগ করার আগে অবশ্যই খোঁজখবর নেওয়া উচিত।

 



সাতদিনের সেরা