kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বাড়ছে পোস্ট ও লং কভিড রোগী

বেশি ভুগছে নারীরা

তৌফিক মারুফ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাড়ছে পোস্ট ও লং কভিড রোগী

করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৭০ বছরের মমতাজ বেগম পর্যায়ক্রমে রাজধানীর দুটি হাসপাতালের কভিড ইউনিটে ভর্তি ছিলেন ১৮ দিন। দুই দফা কভিড টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ আসার পর এবং জটিল উপসর্গগুলো কমে যাওয়ায় চিকিৎসকরা হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে তাঁকে বাসায় পাঠিয়ে দেন। বাসায় যাওয়ার পর এক সপ্তাহ না যেতেই মমতাজ বেগমের আবার আগের মতো উপসর্গ শুরু হয়। অক্সিজেন সেচুরেশন ৮৮-৮৯-তে নেমে যায়। স্বজনরা বাসায় সিলিন্ডার অক্সিজেন এনে দেওয়া শুরু করলেও খুব একটা উন্নতি না হওয়ায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার তাঁর বুকের এক্স-রে করে ফুসফুসে আগের মতো জটিল সংক্রমণ দেখতে পান। তাঁকে পোস্ট কভিড ও লং কভিডের রোগী হিসেবে দ্রুত আবারও ভর্তি করা হয়েছে রাজধানীর আরেকটি হাসপাতালে।

রওশন আরা নামের ষাটোর্ধ্ব আরেক রোগীরও ১৫ দিন হাসপাতালে থেকে সুস্থ হওয়ার পর আবারও আগের মতোই শ্বাসের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁকেও শেষ পর্যন্ত আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। হাসপাতালের পাশাপাশি মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের চেম্বারেও বাড়ছে লং কভিড ও পোস্ট কভিড রোগীর ভিড়। কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসকরা এখন এ ধরনের রোগীদের প্রথমেই পাঠাচ্ছেন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের কাছে।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লং কভিড হিসেবে বাড়ছে মানসিক ও স্নায়ুতান্ত্রিক সমস্যাও। অনেকেই ভুগছে ক্ষণে ক্ষণে মেমোরি লসের সমস্যায়। পাশাপাশি শারীরিক দুর্বলতা, অল্পতেই ঠাণ্ডা-সর্দি জ্বরে ভোগে কভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষ। এ ছাড়া পুনরায় কভিডে আক্রান্ত হওয়ার হারও বাড়ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এ দিকে নজর রেখে হাসপাতালগুলোতে লং কভিড রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থা সাজানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো হাসপাতালে পোস্ট কভিড ইউনিট চালু করা হয়েছে। পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি পোস্ট কভিডে ভুগছে বলেও জানান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, “করোনায় আক্রান্তরা সুস্থ হওয়ার পরও অনেকেই ‘পোস্ট কভিডে’ আক্রান্ত হয়। তাই আমরা আরো আগেই আমাদের হাসপাতালে আলাদা করে পোস্ট কভিড ইউনিট চালু করেছি এবং সেখানে রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসাও চলছে। অনেকে ভর্তি হয়েই চিকিৎসা নিচ্ছে।”

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘আমরা পোস্ট কভিড ও লং কভিডের রোগীদের তথ্য পাচ্ছি। এটা বাড়ছেও। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে নারী রোগীদের সমস্যা বেশি হচ্ছে।’ এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, প্রথম দফায় কভিডমুক্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর অনেকেরই ১৫ দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে পোস্ট কভিডের প্রভাবে আগের মতোই উপসর্গ দেখা দেয়। কারো শ্বাসের সমস্যা, কারো জ্বর-সর্দি-কাশি দেখা দেয়। ফলে তাদের অবশ্যই দ্রুত সময়ের মধ্যে কাছের হাসপাতাল বা মেডিসিনের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। ৬-৯ মাস পর্যন্ত এমন অবস্থা অনেকেরই চলতে পারে। এর পর ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো ঠিক হয়ে আসতে পারে।

এ এস এম আলমগীর বলেন, এ ছাড়া লং কভিডের প্রভাবে অনেকেরই ঘুমের সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে, কিছুক্ষণের জন্য মনে না থাকা, অল্পতেই ঠাণ্ডা-হাঁচি-কাশি, শরীর ব্যথা, পায়ে ব্যথার উপসর্গ দেখা দেয়। যাদের ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হার্টের রোগ ছিল তাদের সেগুলো আবার মাঝে-মধ্যেই দেখা দিচ্ছে। ফলে তাদেরও সব সময়ের জন্য নিজ নিজ ক্ষেত্রের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা দরকার। পাশাপাশি তাদের নিয়মিত চেকআপ ও ফলোআপও করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া বলেন, ‘আমরা সব কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালকে চিঠি দিয়েছি, কভিড রোগীদের পাশাপাশি নন-কভিড রোগীদেরও সেবা শুরুর জন্য। সেটা করাও হচ্ছে। যেহেতু পোস্ট কভিড রোগীরা সাধারণত নন-কভিড হিসেবেই বিবেচিত হয় তাদের কভিড টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ থাকার কারণে, তাই তারা যাতে কোনো হাসপাতালে গিয়ে সেবাবঞ্চিত না হয় সেদিকে নজর রেখেই এটা করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো হাসপাতালে আলাদা পোস্ট কভিড ইউনিটও চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনে অন্যগুলোতেও করা যাবে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর বলেন, ‘আমরা এখন প্রতিদিনই পোস্ট কভিডের রোগী পাচ্ছি এবং সেটা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে অনেকেরই আগের মতো ফুসফুসের সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এর যথাযথ কারণ এখনো বলা যায় না। ধারণা করা যায়—কভিড যেভাবে আক্রান্তদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সংক্রমিত করে, তাতে প্রথম দফায় সুস্থ হওয়ার পরও অনেকের ক্ষেত্রে অন্তর্গত ক্ষতির প্রভাব থেকেই যায় এবং দীর্ঘদিন থেকে যাবে হয়তো। এর মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সাপেক্ষে কারো উপসর্গ বেশি, কারো কম দেখা দিতে পারে।’

এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, অনেক সময় করোনামুক্ত হওয়ার পর অনেকে সিটি স্ক্যান করায় না বা তার ফুসফুসের পরিস্থিতি কেমন আছে সেটা দেখে না, কেবল ওষুধ ব্যবহার করতে থাকে। অনেক চিকিৎসকও রোগীকে হাসপাতাল থেকে বিদায় দেওয়ার সময় সিটি স্ক্যান করেন না বিভিন্ন কারণে। কিন্তু এটা জরুরি। কারণ ওষুধে সাময়িক স্বস্তিবোধ হলেও বা উপসর্গ কমে গেলেও ভেতরে সংক্রমণ সুপ্ত অবস্থায় কিছুদিন থেকে আবার জেগে উঠতে পারে আগের চেহারায়।



সাতদিনের সেরা