kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জিয়ার লাশ নিয়ে বিতর্ক সংসদেও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জিয়ার লাশ নিয়ে বিতর্ক সংসদেও

রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানের কবরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের লাশ থাকা না থাকা নিয়ে জাতীয় সংসদে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে ‘বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস বিল-২০২১’ পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা এ বিষয়ে কথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলের ওপর যাচাই-বাছাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে ইস্যুটি নিয়ে কথা শুরু করেন বিএনপির সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন। এরপর বিএনপি ও জাতীয় পার্টির এমপিরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ জিয়ার লাশ থাকার বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের প্রস্তাব দেন। পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

বিএনপির সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য বলেছেন সঠিক ইতিহাস আসতে নাকি শত বছর লাগে। মৃত্যুর ৪০ বছর পরে সঠিক ইতিহাস বের হলে সমস্যা কোথায়? জিয়ার লাশ আছে কি নাই—এটা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণের ব্যবস্থা আছে। আপনারা (বিএনপি) নিরপেক্ষ একটা কমিটি করেন। সরকার সহযোগিতা করবে। সত্য উদঘাটনে ভয়ের কী আছে?’ তিনি আরো বলেন, ‘আপনাদের দলের নেত্রীকে বলেন, যদিও তিনি সাজাপ্রাপ্ত। প্রধানমন্ত্রীর অনুকম্পায় সাজা স্থগিত নিয়ে কারাগারের বাইরে বাস করছেন। আইনে সুযোগ থাকলে তাঁর নেতৃত্বে কমিটি করেন।’

শুরুতে বিএনপির সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের লাশ সেখানে (চন্দ্রিমা উদ্যান) আছে কি নাই—সেটা বড় বিষয় নয়। সেখানে যে লাশ নাই, তা আপনারা (আওয়ামী লীগ) কিভাবে জানলেন? এত বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে এটা নিয়ে আগে কথা বলেন নাই কেন? এখন কেন বলছেন?’

জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘ইতিহাস বিকৃতি তো বিএনপিও করে। তারা বলে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। এ বিষয়ে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। আর তিনি (জিয়াউর রহমান) বেঁচে থাকতে কখনোই বলতে শুনিনি, উনি নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেছেন। তাদের প্রথমে ইতিহাস বিকৃতি বন্ধ করতে হবে। তারপর আওয়ামী লীগ যদি ইতিহাস বিকৃতি করে থাকে, সেটা বন্ধের আহ্বান বিএনপি জানাতে পারে।’

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ তাঁর বক্তব্যে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯৭৯ সালে সংসদ ছিল। সেখানে আওয়ামী লীগও ছিল। মানিক মিয়া এভিনিউয়ে যে জানাজা হয়েছিল, তাতে এমপিরা উপস্থিত ছিলেন। শোক প্রস্তাবের ওপর সংসদে দীর্ঘ আলোচনায় তাঁরা অংশ নিয়েছিলেন। সেগুলো প্রসিডিংসের মধ্যে রয়েছে। আমার কথায় যদি কোনো অপ্রাসঙ্গিক বিষয় থাকে তা এক্সপাঞ্জ করুন।’ তিনি আরো বলেন, ‘কারো যদি অপমৃত্যু হয়। তাহলে তাঁর ময়নাতদন্ত লাগে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। সামরিক আদালতে বিচারও হয়েছে। এটা অসত্য কিছু নয়। আজকে জেনারেল এরশাদ বেঁচে থাকলে তিনি লজ্জা পেতেন।’

বিএনপির রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আর্কাইভস যদি করতে হয়, তাহলে স্বীকার করতে হবে জিয়াউর রহমান ছিলেন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বীর-উত্তম ছিলেন, এটা স্বীকার করতে হবে। তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। ওনারা ওনাদের কথা বলবেন, আর আমরা আমাদের কথা। এইটুকু ধৈর্য যদি তাঁদের না থাকে, তাহলে তাঁরা কী ইতিহাস লিখবেন? চর্চা করবেন? আর্কাইভসে কী জমা করবেন, তা ভালো করেই বুঝতে পারছি।’ তিনি আরো বলেন, ৪০ বছর পরে কেন জিয়াউর রহমানের কবর নিয়ে এই বিতর্ক? সরকারের ব্যর্থতা, ভোট চুরি, গণতন্ত্রহীনতা, লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এই বিতর্ক করা হচ্ছে।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের শেষের দিকে সংসদে উত্তেজনা দেখা দেয়। সরকারদলীয় সদস্যরা হৈচৈ করেন। পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘আজ ৪০ বছর পর লাশ নিয়ে লাফালাফি করা হচ্ছে।  সংসদ ভবন এলাকায় জিয়াউর রহমানের লাশ রয়েছে বিএনপির এমপিরা তা সংসদে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেখানে যে জিয়াউর রহমানের লাশ নেই—সেটা ৪০ বছর আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, “জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর তাঁর লাশ পরিবারের কেউ দেখেননি। খালেদা জিয়া দেখেননি। তারেক জিয়া লাশ দেখার জন্য কান্নাকাটিও করেছিলেন। শাহ আজিজ একটি চালাকি করেছিলেন ‘লাশ পাওয়া যাক না যাক একটা বাক্স পাঠিয়ে দাও’। সেই বাক্স পাঠানো হয়েছিল। জনমনে সন্দেহ ছিল কিসের জানাজা করছি। শুধু বাক্স? নাকি ওখানে জিয়াউর রহমান আছেন?”

বিষয়টি নিয়ে সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ সেলিম বলেন, ‘১৯৮১ সালের ২০ জুন আমি সংসদের নতুন সদস্য। জিয়াউর রহমান তখন মারা গেছেন। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। সংসদে আমি সরকারের কাছে এটা জানতে চেয়েছিলাম। এটা প্রসিডিংস-এ আছে। আমি সেদিন বলেছিলাম, আপনারা প্রমাণ করেন, ওই বাক্সে কোনো লাশ আছে কি না। জনমনে সন্দেহের কথা সেদিন সংসদে বলেছিলাম। আমি দুই দিনের মধ্যে লাশের ছবি ছাপিয়ে জনমনের সন্দেহ দূর করতে বলেছিলাম। আর না পারলে জনমনের সন্দেহই প্রমাণিত হবে। আজ ৪০ বছরেও একখানা ছবি দেখাতে পারেননি।’



সাতদিনের সেরা