kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে চলছিল ভিওআইপির অবৈধ কারবার

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে চলছিল ভিওআইপির অবৈধ কারবার

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার জাকির হোসেন রোডের একটি বাসা মাসে ১৮ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন সৌদিপ্রবাসী মো. আলী। সেখানে দেড় বছর ধরে একটি সিন্ডিকেটের সহায়তায় বেতনভুক্ত নিজস্ব লোকজন দিয়ে ভিওআইপির (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) অবৈধ কারবার চালাচ্ছিলেন তিনি। র‌্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাঁর সঙ্গে এই অবৈধ কারবারে আরো অনেকে জড়িত, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও রয়েছেন।

গত মঙ্গলবার রাতে জাকির হোসেন রোডের ওই বাসা থেকে সৌদি আরবপ্রবাসী মো. আলীর সহযোগী সফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে এমন তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। এ সময় টেলিটকের এক হাজারের বেশি সিমসহ অন্তত ৩০ লাখ টাকার ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। আলী সৌদি আরব থেকে চোরাইপথে আন্তর্জাতিক কল বাংলাদেশে পাঠাতেন বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। অপকর্মের শিকড় সন্ধানে তদন্ত চলছে।

ঢাকার আরো অনেক বাড়িতে এ ধরনের কারবার হয়ে থাকতে পারে জানিয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, তবে তদন্তে নিশ্চিত হয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। মূল কারবারিদের অনেকেই এখনো ধরা না পড়ায় এ বিষয়ে অনেক তথ্য এখনো অজানা রয়েছে। তাঁদের ধরতে পারলে এই অবৈধ কারবারের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যাবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, ভিওআইপি অবৈধ ফোন কলের মাধ্যমে আলীচক্রের মাধ্যমেই প্রতিবছর পাঁচ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছিল সরকার। চক্রটি দেড় বছর ধরে ভিওআইপির অবৈধ কারবার করে আসছিল। সেই হিসাবে দেড় বছরে সরকারের সাত থেকে আট কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় এ বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার ফরদাবাদ গ্রামের আব্দুল বাতেনের ছেলে মো. সফিকুল ইসলাম (৪০)। এজাহারে তাঁর বর্তমান ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন জাকির হোসেন রোডের ই-ব্লকের এফ/৫ নম্বর বাসা। এ ছাড়া অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার মো. আলী (৪০)। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবপ্রবাসী। এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের মধ্যে মো. শাহীন (২৮) মোহাম্মদপুর থানার বসিলা এলাকায় থাকেন। আর সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া থানার ব্রজবাকসা গ্রামের মো. নেছার উদ্দিনের ছেলে আব্দুস সামাদ আজাদ (৩৭) ও মো. মাসুদ (৩০) ও এজাহারভুক্ত আসামি। গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় জাকির হোসেন সড়কের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে র‌্যাব ও বিটিআরসির যৌথ অভিযানে সফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদের মধ্যে আব্দুস সামাদ আজাদ নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে গতকাল বুধবার টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। কখনো ছিলেন না। অন্যদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে আব্দুস সামাদ আজাদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক র‌্যাব কর্মকর্তা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রেপ্তার সফিকুল ইসলামও ধরা পড়ে প্রথমে নিজেকে নিরপরাধ দাবি করেন। পরে তদন্তে দেখা যায়, তিনি এই কারবারে সংশ্লিষ্ট। বর্তমানে এই  চোরাকারবারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের জড়িত থাকার তথ্য মিলছে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কালের কণ্ঠকে এ বিষয়ে আরো বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সরঞ্জামসহ সফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার সফিকুল ধরা পড়ার পর ওই ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার দাবি করলেও তিনি মূলত ভিওআইপির অবৈধ কারবারে জড়িত। তবে এই ব্যবসার অন্যতম অংশীদার মো. আলী প্রবাসে থেকেই তিনজন কর্মী রেখে  জাকির হোসেন রোডের বাসাটিতে ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এই তিনজনের মধ্যে দুজন সার্ভার মেইনটেইন করতেন। তবে তাঁরা এখন পলাতক।

এদিকে গতকাল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি টেলিটকের ৯০০ সিম জব্দের কথা জানালেও র‌্যাব জানায়  অভিযানে এক হাজারের বেশি টেলিটকের সিম উদ্ধার করা হয়েছে। এই সিম ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ফোন কল অবৈধভাবে কল টারমিনেশন করা হতো। অভিযানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এই সরঞ্জাম ব্যবহার করে একসঙ্গে ১৬০টি কল টারমিনেশন করা হতো।

শাহজালালে তিন হাজার ভিওআইপি কল কার্ডসহ আটক ১ : এদিকে গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক যাত্রীর কাছ থেকে ভিওআইপি কল করার তিন হাজার কার্ড জব্দ করা হয়েছে। হাসান আলী নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করে বিমানবন্দরের এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক)।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন তৌহিদ-উল আহসান বলেন, ওই যাত্রী কার্ডগুলো নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাত ২টা ১৫ মিনিটে বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজ-৬-এ তাঁর কাছ থেকে এগুলো পাওয়া যায়। সে সময় এয়ার অ্যারাবিয়ার (থ্রিএল-০৬৬) ফ্লাইটের বোর্ডিং চলছিল। নিরাপত্তা তল্লাশির সময়ে এভসেক সদস্য তাঁকে চ্যালেঞ্জ করলে তাঁর হ্যান্ডব্যাগ থেকে তিন হাজার ভিওআইপি কল কার্ড পাওয়া যায়। প্রতিটি কল কার্ড ১০ ডলার সমমূল্যের। জব্দ করা তিন হাজার কার্ডের দাম বাংলাদেশি অর্থে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে তাঁকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে সর্বশেষ গত ৩ ও ৪ ফেব্রুয়াারি বিটিআরসি ও র‌্যাব ভিওআইপির অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ওই অভিযানে রাজধানী ঢাকার নিউ মার্কেট, তুরাগ ও শাহআলী থানা এলাকা থেকে ভিওআইপির অবৈধ কারবারে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ১৯টি সিমবক্স ডিভাইস, ৪১৬টি জিএসএম অ্যান্টেনা, তিন হাজার ৪০০টি টেলিটক সিম, সাত মিনি কম্পিউটারসহ অন্য ভিওআইপিসামগ্রী, কিন্তু এই চক্রের মূল হোতাদের খোঁজ নিতে আগ্রহ দেখায়নি বিটিআরসি।



সাতদিনের সেরা