kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বেশি মুনাফার লোভে প্রতারণার ফাঁদে

► সচেতনতার অভাবে অনিরাপদ জায়গায় টাকা খাটিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেকেই
► জনসচেতনতা বাড়াতে ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি ক্যাম্পেইনের পরামর্শ

জিয়াদুল ইসলাম   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বেশি মুনাফার লোভে প্রতারণার ফাঁদে

দেশে যুবক ও ডেসটিনির প্রতারণার ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হলেও বেশি মুনাফার লোভ দেখিয়ে মানুষের টাকা আত্মসাতের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে। সমবায় প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ব্যাংক শব্দটি ব্যবহার করে, মাল্টিপারপাস কম্পানি বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। সরকারের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতামূলক অভিযান না থাকায় বেশি মুনাফার লোভে প্রতারকদের ফাঁদে পা দিচ্ছে মানুষ। প্রতারণার কবল থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত রাখতে প্রয়োজনে সারা দেশে ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি ক্যাম্পেইন জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যাদের সম্পৃক্ততা আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যদি নেওয়া যায় তাহলে আশা করা যায়, এ প্রবণতা কিছুটা হলেও কমে আসবে।’

চলতি বছরের শুরুতে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ-এর তদন্তে এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস ও সোপান প্রডাক্টস লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে এসপিসি ওয়ার্ল্ড ই-কমার্স ব্যবসার আড়ালে গ্রাহকের ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ বিষয়ে বিএফআইইউর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেড মূলত একটি অনুমোদনহীন এমএলএমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান।

আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো সোপান প্রডাক্টস লিমিটেড। লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে এক হাজার ৩০০ টাকা মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারা আট মাসে এক হাজার ৪২৭ গ্রাহকের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে বিএফআইইউর তদন্তে বলা হয়েছে, পণ্যভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার আড়ালে অনুমোদনহীন এমএলএম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সোপান প্রডাক্টস অস্বাভাবিক লভ্যাংশের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে।

চট্টগ্রামভিত্তিক রূপসা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন মাল্টিপারপাস কম্পানি এমএলএম ধারায় সমবায় সমিতি পরিচালনা করে গ্রাহকের কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বিএফআইইউর তদন্তে উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, মজিবুর রহমান তাঁর সহযোগীদের নিয়ে এই কম্পানি প্রতিষ্ঠা করে গ্রাহকের ওই টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে মানুষের আয় কমে যাওয়া ও বেকারত্ব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মোড়কে এমএলএম ব্যবসা ও ‘হায় হায়’ কম্পানির তৎপরতা বেড়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহক টানতে সুদবিহীন উচ্চ মুনাফার প্রলোভন ও ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগাচ্ছে। বেশি মুনাফার প্রত্যাশায় গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো না বুঝেই পা দিচ্ছে তাদের প্রতারণার ফাঁদে।

সম্প্রতি ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রাগীব আহসান। এক লাখ টাকার বিপরীতে গ্রাহকদের মাসে দুই হাজার টাকা মুনাফার প্রলোভন দিয়ে প্রায় লক্ষাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে এই টাকা নেওয়া হয়েছে। জানা যায়, সুদবিহীন উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে মানুষকে আকৃষ্ট করতে কিছু আলেমকে দিয়ে ওয়াজের ব্যবস্থা করতেন রাগীব আহসান। এমনকি বিদেশ থেকে আলেম এনেও প্রচারণা চালিয়েছেন তিনি।

এর আগে দ্য ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক নামের একটি সমবায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের প্রমাণ পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধে প্রায় চার বছর আগে ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, সমবায় অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরই প্রতিষ্ঠানটি আদালতে রিট করে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ব্যাংকের মতোই অবয়ব। টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য রয়েছে পৃথক কাউন্টার। সঞ্চয় স্লিপের মাধ্যমে টাকা জমা এবং চেক বইয়ের মাধ্যমে গ্রাহকরা টাকা তুলছেন।

গ্রাহক পরিচয়ে ওই শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক অলোক কুমার দাসের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটি একটি ব্যাংক।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘না, আমাদেরটা নন-শিডিউলভুক্ত ব্যাংক। সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত।’ এরপর তিনি তাঁদের বিভিন্ন আমানত প্রকল্প সম্পর্কে একটা ধারণা দেন। তিনি জানান, ১ জুলাই থেকে তাঁদের বিভিন্ন আমানত প্রকল্পের মুনাফার হার কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। এক লাখ টাকা বা তদূর্ধ্ব আমানত পাঁচ বছরের জন্য কেউ রাখলে এখন ৯ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। জুলাইয়ের আগে এই সুদের হার ছিল আরো বেশি। এ ছাড়া যেকোনো প্রাথমিক জমা টাকা সাড়ে সাত বছরে দ্বিগুণ  ও ১২ বছরে তিন গুণ হয়। অথচ ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখলে এখন সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদও মিলছে না।

চলতি বছরের মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশদ তদন্তে স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংকের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের প্রমাণ মেলে। এর পরই প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম বন্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও সমবায় অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক, এসটিসি ব্যাংকসহ যে প্রতিষ্ঠান নামের শেষে ব্যাংক শব্দ যুক্ত করে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্সভুক্ত না হওয়ায় সরাসরি কোনো ব্যবস্থা আমরা নিতে পারি না। তারা যে সংস্থার লাইসেন্সভুক্ত তারা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

অর্থনীবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুদবিহীন উচ্চ মুনাফার লোভ ও সচেতনতার অভাবে অনিরাপদ জায়গায় টাকা রেখে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ। এর দায় সংশ্লিস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি সরকারের ওপরও বর্তায়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, এই ঘটনাগুলো দিন দিন ব্যাপক আকার ধারণ করছে। এগুলোকে যদি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা না যায়, তাহলে এগুলো বাড়তেই থাকবে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত, এগুলোকে শক্ত হাতে দমনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের প্রতারণামূলক ব্যবসা খুলে বসতে না পারে। তবে সরকারের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বড় বিষয় জনগণের সচেতনতা এমন মত প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এগুলোকে পাত্তাই দিতে চাই না। আমরা লোভের বশবর্তী হয়ে এগুলো করে থাকি। কারণ যেখানে বেশি মুনাফা, সেখানেই টাকা খাটাতে চাই, কিন্তু ঝুঁকির কথা মাথায় আনি না।’

জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রাথমিক পর্যায় থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত ফিন্যানশিয়াল লিটারেসির ক্যাম্পেইন করার ব্যাপারে জোর দেন ড. তৌফিক।



সাতদিনের সেরা