kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিমানবন্দর দিয়ে নির্বিঘ্নে বেরোচ্ছে স্বর্ণ

১৪ কেজির পর এবার ৭ কেজি

ফরিদ আহমেদ   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৪ কেজির পর এবার ৭ কেজি

ঘটনা এক। ২০ জুলাই, ২০২১। দেশের প্রধান বিমানবন্দর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১৫ কেজি ওজনের তরল স্বর্ণ নিয়ে তিন চোরাকারবারি কাস্টম এরিয়া নির্বিঘ্নে পার হয়ে যায়। তাদেরকে ঢাকা কাস্টম হাউসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা বা কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তাদের তল্লাশিতেই পড়তে হয়নি। ওই দিন ভোর ৫টায় টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট থেকে তিনজন যাত্রী স্বর্ণ নিয়ে নামেন। আর তার কিছু সময় আগে ভোর সাড়ে ৪টায় ঘটে রহস্যজনক এক ঘটনা। ওই দিন বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা কাস্টমস কর্মকর্তার মোবাইল ফোন হারিয়ে যায়। তিনি চেকপোস্ট ছেড়ে নিজের ফোন খুঁজতে চলে যান। এই ফাঁকে বেরিয়ে যান চোরাকারবারিরা। অবশ্য বিমানবন্দর থেকে নির্বিঘ্নে বেরোতে পারলেও এসব স্বর্ণ পরে বাইরে যাত্রীদের গাড়ি পার্কিং এলাকায় ধরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-এপিবিএন।

ঘটনা দুই। বিদেশ থেকে অবৈধভাবে আনা ৫৮টি স্বর্ণবার কাস্টমস কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের করে আনে চোরাকারবারিরা। যদিও সাড়ে চার কোটি টাকা মূল্যের এসব সোনার বার সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। গত মঙ্গলবার রাতে সাতক্ষীরা সীমান্তের দিকে নেওয়ার সময় এগুলো আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলের আইডিইবি ভবনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ।

এভাবেই অবৈধ পথে বিদেশ থেকে আনা স্বর্ণ নির্বিঘ্নে বের হয়ে যাচ্ছে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ওই স্বর্ণের একটি অংশ দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আরো একটি বড় অংশ বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে স্থলপথে পাচার করা হচ্ছে ভারতে। বছরের পর বছর এই চোরাচালান চললেও তার মূলোৎপাটন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। জানা যায়, এই চক্রের সঙ্গে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কাস্টম ও বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বিমানের মেকানিকের দায়িত্বে থাকা কিছু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে। এ কারণেই সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে না।

কিভাবে এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ নিয়ে অপরাধীরা বিমানবন্দর পার হয়ে যাচ্ছে? কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধান সেল মুঠোফোনে এ প্রশ্ন রাখে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রউফের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, ‘আইনের শতভাগ প্রয়োগ কোথাও করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।  শুল্ক গোয়েন্দার চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয়েছে।’

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা ও ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রধান কাজই হলো অঘোষিত পণ্য বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া। এটি যদি তারা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ধরে নিতে জবে সরষেতে ভূত আছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কাস্টম কেন মালিবাগে স্বর্ণ আটক করবে? এপিবিএনকে কেন স্বর্ণ ধরতে হবে?

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ২০ জুলাই তরল করে আনা প্রায় ১৫ কেজি স্বর্ণ আটকের পর আমরা এগুলো কাস্টমে জমা দিয়েছি। এ ঘটনায় ধরা পড়া তিনজন মোহাম্মদ আমিন, রাজিউল হাসান রিন্টু ও মোকারম খানের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে।’

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রউফ বলেন, রাজধানীর মালিবাগ থেকে সাতক্ষীরার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৫৮টি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়েছে। যার ওজন ছয় কেজি ৭২৮ গ্রাম। এই স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এসব স্বর্ণ পাচারে জড়িত তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

আব্দুর রউফ আরো বলেন, গাড়িটিতে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশির পর স্বর্ণের বারগুলো চালকের আসনের নিচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। এসব স্বর্ণ বিদেশ থেকে এনে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে পাশের দেশে পাচার করা হচ্ছিল। উদ্ধার এই স্বর্ণের আসল মালিক কে জানতে চাইলে মো. আব্দুর রউফ বলেন, ‘কাস্টম আইনে মামলা দায়েরের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মামলার প্রক্রিয়া শেষ হলে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তখন তারা তদন্ত করে তথ্য বের করবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে মো. আব্দুর রউফ বলেন, ‘এই স্বর্ণের বারগুলো দীর্ঘদিন ধরে মজুদ করা হচ্ছিল। আমাদের কাছে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের মধ্যে আটটি কম্পানির বার রয়েছে। আমাদের দেশে আসা বেশির ভাগ স্বর্ণ পাশের দেশে পাচার হয়ে যায়। তাই কাস্টমস গোয়েন্দাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পাচারকারীদের মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের অনুমতি প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’



সাতদিনের সেরা