kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

বিএনপির রুদ্ধদ্বার বৈঠক

নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়

দ্বাদশ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তিন দিনের বৈঠক শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রথম দিনের বৈঠকে ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টারা অংশ নিয়েছেন। বিকেল পৌনে ৪টায় গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শুরু হওয়া এই বৈঠক চলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। এতে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন নেতারা। একই সঙ্গে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে এবং নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় না যাওয়ার বিষয়ে মতামত এসেছে বৈঠক থেকে।

নেতারা বলেছেন, প্রতিবারের মতো এবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার নানা ফন্দি আঁটবে, কৌশল করবে। কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। দলকে এক দফার আন্দোলনে নিয়ে যেতে হবে। এর পাশাপাশি দল পুনর্গঠন, চেয়ারপারসনের মুক্তি, জোটের রাজনীতি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলাসহ সাম্প্রতিক নানা ইস্যুও উঠে আসে বৈঠকে।

বৈঠকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মিলে উপস্থিত ৬২ জনের মধ্যে ২৮ জন বক্তব্য দেন। ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য শোনেন। তারেক রহমান নেতাদের বলেন, এক দফার আন্দোলন শুরু হলে দলের সবাইকে তিনি রাজপথে দেখতে চান।

ধারাবাহিক এ বৈঠকের অংশ হিসেবে আজ বুধবার নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহসম্পাদক এবং শেষ দিন কাল বৃহস্পতিবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেবেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এ বৈঠকের পর দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হবে, পরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গেও একই প্রক্রিয়ায় বৈঠকের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সবার মতামতের পরই চূড়ান্ত করা হবে আন্দোলনের কৌশল।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশানের কার্যালয়ের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে দলের করণীয় সম্পর্কে সিনিয়র নেতাদের মতামত নিয়েছেন তারেক রহমান। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর বেশি কিছু এখন বলার নেই।

তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে আমাদের কী করণীয়, সেসব বিষয়ে নেতাদের মতামত নিতে এই বৈঠক ডাকা হয়েছে। বুধ ও বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর তিন দিনের বৈঠক নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে গণমাধ্যমকে।’

বৈঠকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া বোকামি। ছয়বারের এমপি হয়ে আমি নির্বাচনের সময় ঘর থেকে বের হতে পারিনি। ঘোষণা দিতে হবে, হাসিনার অধীনে ‘নো’ নির্বাচন। সংসদ বহাল রেখেও নির্বাচন হবে না। তবে আওয়ামী লীগ যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায় কথা বলা যাবে না। কারণ ভদ্রলোকরা বিএনপি করে, আওয়ামী লীগে ভদ্রলোক নেই। আমাদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো বিদেশে প্রচার হচ্ছে না। প্রতিবেশী দেশ চেপে বসেছে। তাই সীমান্ত হত্যাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলতে হবে। আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই।”

ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ বলেন, ‘এক দফা এক দাবি—হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব না। যে নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান অংশগ্রহণ করবে না—সে নির্বাচনে কেন যাব? আগে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন, তারপর নির্বাচন।’

ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীও একই সুরে কথা বলেন, ‘হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। আমাদের বহির্বিশ্বে বন্ধু ও শত্রু চিহ্নিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, আন্দোলনের মূল শক্তি ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষক। দলকে রণকৌশল তৈরি করতে হবে।

বর্তমান সরকারকে পুলিশ, বিদেশি ও আমলাদের সরকার দাবি করে ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দেশের মানুষ নির্বাচনপাগল, কিন্তু আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘জোটের দরকার নেই। আমরা রাজপথে দাঁড়াতে পারলে সবাই আমাদের সঙ্গে আসবে। যুগপৎ আন্দোলন করাটাই ভালো। হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার আগে রাজপথে আমাদের জিততে হবে।’ নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে না যেতে মত দেন তিনি।

ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর বীর-উত্তম বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কী? নির্বাচন। নির্বাচনে জিততে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ভীতি সঞ্চার করতে হবে।’ দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শ্রমিক দল ও কৃষক দল তো নেই।

বৈঠকে ফখরুল ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অংশ নেন। ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে অংশ নেন মীর নাসির, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, শওকত মাহমুদ, মাহমুদুল হাসান, অধ্যাপক শাজাহান মিয়া, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকতউল্লা বুলু, শাহজাহান ওমর, আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রমুখ অংশ নেন। উপদেষ্টাদের মধ্যে মনিরুল হক চৌধুরী, মশিউর রহমান, আমানউল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, হাবিবুর রহমান হাবিব, লুত্ফর রহমান খান আজাদ, আবদুস সালাম, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, ফজলুর রহমান, শাহজাহান মিয়া, সুকোমল বড়ুয়া, খন্দকার মুক্তাদির আহমেদ, এস এম ফজলুল হক, আবদুল হাই, ভিপি জয়নাল আবেদীন, গোলাম আকবর খন্দকার, অধ্যাপক শাহেদা রফিক, আফরোজা খানম রীতা, তাহসিনা রুশদীর লুনা, অধ্যাপক তাজমেরী এস ইসলাম, ইসমাইল জবিল্লাহ, একরামুজ্জামান, তৈমূর আলম খন্দকার, মইনুল ইসলাম শান্ত, মাহবুবুর রহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, আবদুল হাই শিকদার, আতাউর রহমান ঢালী, বোরহান উদ্দিন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, নজমূল হক নান্নু প্রমুখ।

এদিকে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠককে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়। বৈঠককে কেন্দ্র করে অনেক দিন পর সরগরম হয়ে উঠেছে গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়। দলীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি পরিপাটি করে গোছানো হয় পুরো কার্যালয়। ভবনের নিচতলার হলরুমে নেতাদের সাদা কাপড়ে মোড়ানো আসন দেওয়া হয়েছে। ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চের সারিতে বসেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। রবিবার দুপুর ২টা থেকেই বৈঠকে অংশ নিতে একে একে উপস্থিত হন নেতারা। করোনার কারণে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর বৈঠকে এসে নেতারা একে অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটিতে ৩৫ জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা হচ্ছে ৭৪।



সাতদিনের সেরা