kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

উপকূল বৃক্ষশূন্য করছিল বনদস্যুরা মাঝরাতে ধরা

বসুন্ধরার প্রহরীরা আটকালেন ট্রাক

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




উপকূল বৃক্ষশূন্য করছিল বনদস্যুরা মাঝরাতে ধরা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড বাঁশবাড়িয়া সাগর উপকূলে একটি বনদস্যুচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই চক্রের সদস্যরা প্রতিদিন লাখ টাকার উপকূলীয় সরকারি গাছ কেটে পাচার করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সব শেষ সোমবার রাত ও গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে কাঠ পাচারকালে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বসুন্ধরা গ্রুপের সিকিউরিটি গার্ডরা কাঠবোঝাই ট্রাক আটক করে বন বিভাগে খবর দিলে বন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছগুলো জব্দ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের দক্ষিণ নড়ালিয়া মৌজায় উপকূলীয় বন বিভাগের বনভূমিতে হাজার হাজার আকাশমণি, কেওড়া ও গেওয়া গাছ রয়েছে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তীতে উপকূলবাসীকে রক্ষায় গাছগুলো সরকারি উদ্যোগে রোপণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে এই গাছগুলো এখন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এতে গাছগুলোর ওপর কুনজর পড়েছে বনদস্যুদের।

এলাকাবাসী জানায়, বাড়বকুণ্ড ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় একাধিক বনদস্যুচক্র সক্রিয়। এই দস্যুচক্র কয়েক দিন ধরে দিন ও রাতে মূল্যবান আকাশমণিগাছ কেটে ট্রাকে করে পাচার করছিল। সব শেষ সোমবার বিকেলে ও রাতে চক্রটি বাড়বকুণ্ডের নড়ালিয়া মৌজার উপকূলীয় বন থেকে বড় বড় অনেক আকাশমণিগাছ কাটে এবং মঙ্গলবার ভোররাতে ট্রাকে করে গাছগুলো পাচার শুরু করে। শুনতে পেয়ে কাছাকাছি থাকা এলাকাবাসী ও বসুন্ধরা গ্রুপের সিকিউরিটি গার্ডরা এগিয়ে আসেন। তাঁরা ট্রাকসহ গাছগুলো আটক করে বন বিভাগকে খবর দিলেও কেউ আসেনি। এক পর্যায়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং উপকূলীয় বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে গিয়ে আটক করা কাঠবোঝাই ট্রাকটি নিজেদের জিম্মায় নেন।

সরেজমিনে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিণ নড়ালিয়া-বাঁশবাড়িয়ায় সড়কের ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, তখনো কাঠবোঝাই ট্রাকটি আটকাবস্থায় আছে। উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার মো. কামাল হোসেন, বাঁশবাড়িয়া বিট অফিসার মো. আবদুস সালামসহ বনরক্ষীরা সেখানে উপস্থিত থেকে অন্য একটি ট্রাকে কাটা গাছগুলো নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

সীতাকুণ্ড উপকূলীয় রেঞ্জ অফিসার মো. কামাল হোসেন আশ্বাস দেন, গাছ কাটার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাছ কেটে ট্রাকে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে আমি ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে গাছগুলো জব্দ করেছি।’ এসব গাছ কাটার সঙ্গে বনকর্মীরা জড়িত আছেন—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে কামাল হোসেন বলেন, ‘বনের কেউ এই গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত আছে বলে আমি মনে করি না। তবে যেহেতু বাঁশবাড়িয়া বিট অফিসার আব্দুস সালাম এর সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠছে আমরা বিষয়টি তদন্ত করব।’

বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী বলেন, ‘বাড়বকুণ্ডের উপকূলীয় বন থেকে প্রচুর গাছ কেটে পার্শ্ববর্তী বাঁশবাড়িয়া সড়ক দিয়ে তা নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছিল বলে আমি জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় আমার এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির নাম শুনে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি নিশ্চিত হয়েছি যারা গাছগুলো কেটেছে তারা আমার এলাকার না। তারা অন্য এলাকা থেকে এসে এসব করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অভিযোগ উঠেছে এসব গাছ কাটায় বন বিভাগের লোকজনও জড়িত। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, গাছগুলো নড়ালিয়া মৌজায় অবস্থিত উপকূলীয় বন থেকে কেটে ট্রাকে করে বাঁশবাড়িয়া সড়ক হয়ে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ওই ট্রাকে ২০ থেকে ২৫টি মাঝারি আকারের আকাশমণি গাছ ছিল। পরে আরো প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে সাগরপারে গিয়ে দেখা যায় সেখানে বেড়িবাঁধের ওপর এবং উপকূলীয় বনের চারদিকে প্রচুর কাটা গাছ ও ডালপালা পড়ে আছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন উত্তর বাঁশবাড়িয়া গ্রামের মো. জাফর ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে কখনো দিনে, কখনো রাতে একদল বনদস্যু এসব গাছ কাটছে। মোহাম্মদ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির নেতৃত্বে চারজনের একটি দল ১০-১৫ জন শ্রমিক লাগিয়ে গাছগুলো কেটে পাচার করছিল। সোমবার রাতভর অনেকগুলো ট্রাকে গাছ পাচার করা হয়েছে। সর্বশেষ ট্রাকটি এলাকাবাসী আটক করে।

মো. জাফর আরো বলেন, এখানে বিশাল উপকূলীয় বনে ’৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর প্রচুর গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। পরেও বহু গাছ লাগানো হয়েছে। তিনি নিজেও এই বনে অনেক গাছ লাগিয়েছেন। এখন বনদস্যুচক্র নির্মমভাবে গাছগুলো কেটে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। এই ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেকটা প্রকাশ্যে শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। লাখ লাখ টাকার কাঠ বিক্রি করছে বনদস্যুরা। এখানে উপকূলীয় বিট কার্যালয়ে বিট অফিসার ও বনরক্ষী আছেন। তাঁদের কাজ কী? তাঁরা কেন বাধা দিতে আসেননি? তাঁদেরকে খবর দেওয়া হলেও তাঁরা যথাসময়ে সাড়া দেননি।’ এখানে সুবিশাল বনের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক আকাশমণি ও অন্যান্য গাছ কাটা হয়েছে বলে জানান নড়ালিয়ার অধিবাসী মো. শফি আলমও। তিনি গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দাবি করেন।

 



সাতদিনের সেরা