kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

চার টিকায়ই ঘুরপাক

তৌফিক মারুফ   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চার টিকায়ই ঘুরপাক

করোনা ঘায়েলের এখন বড় অস্ত্র টিকা। এই মহামারির সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে টিকা নিয়েও চলছে আরেক লড়াই। কোনো কোনো দেশ রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে, কত ধাঁচের টিকা আবিষ্কার করা যায়। কোনো কোনো দেশের নজর টিকা মজুদের দিকে। আবার কেউ কেউ কত টিকা বিক্রি করা যায়, তা নিয়ে মহাব্যস্ত। এর মধ্যে বেশি কাড়াকাড়ি চলছে কার আগে কোন দেশ কতসংখ্যক টিকা নিজের দেশে মজুদ রাখতে পারে, সেটা নিয়ে। ছোট দেশের পাশাপাশি বড় দেশগুলোও টিকা নিজেদের হাতছাড়া করতে চায় না এখনই। এমনকি আবিষ্কারক দেশগুলোও টিকা বাইরে ছাড়ার ক্ষেত্রে নিজ দেশের সুরক্ষা স্বার্থ দেখছে সবার আগে।

এমন প্রেক্ষাপটে অনেক দেশ টিকার বেশ বড় জোগান রেখেছে নিজেদের হাতে। এখন পর্যন্ত বিশ্বে মানব শরীরে প্রয়োগ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে ১০২ ধরনের টিকা। এ ছাড়া আরো ৩৩ ধরনের টিকা এখনো প্রাণী পর্যায়ে পরীক্ষা চলছে। মানব শরীরে ব্যবহার হওয়া টিকাগুলোর মধ্যে ৫১টির প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল, ৪৫টির দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে, যা নির্দিষ্ট পর্যায়ের ট্রায়ালের বাইরে ব্যবহার হচ্ছে না। তবে মোট ৩৩ ধরনের টিকা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের আওতায় দেশভেদে বড় পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে। ওই সব দেশে নিজ সরকারের মাধ্যমে টিকা অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি আছে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া। আর ১২ টিকার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ ও খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ফলে এই টিকাগুলো ব্যবহারে আর কোনো বাধা নেই।

এদিকে বাংলাদেশ কোনোভাবেই এই টিকার লড়াইয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। শুরুর দিকে অনেক দেশকে পেছনে ফেলে আগে টিকা সংগ্রহ ও দেওয়া শুরু করলেও পরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশ টিকা সংগ্রহ, আমদানি এবং উৎপাদন কোনো ক্ষেত্রেই আর এগিয়ে থাকতে পারছে না।

উল্টো চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ঠিকমতো টিকা না পেয়ে বারবার ধাক্কা খেতে হয়। এর প্রভাবে বিঘ্নিত হয় টিকা কার্যক্রম। চাহিদা অনুসারে টিকার জোগান না পাওয়ায় নিবন্ধন করেও দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। এ অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের টিকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় নিয়োজিত নীর্তিনির্ধারকদের দুষছেন। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা এবডিএ অনুমোদিত ১২ ধরনের টিকার মধ্যে বাংলাদেশ কেন এখন পর্যন্ত মাত্র চারটি টিকার দেখা পেল, তা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্নের ডালপালা মেলছে।

ন্যাশনাল ইম্যুনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ নাইটাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার টিকা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো অবস্থানে পৌঁছতে পারেনি। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেমন এমনটা হচ্ছে, তা আমরাও বুঝতে পারছি না। কেন আমরা শুধু চার টিকাতেই পড়ে থাকছি, তা-ও বোধগম্য নয়। এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে কি না, সেটাও দেখা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই সবার আগে দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখার কৌশলটিই বড় করে দেখা প্রয়োজন। অন্য সব রাজনীতি কিংবা কূটনীতি এ ক্ষেত্রে দূরে রেখে এগিয়ে চলা খুবই জরুরি। নয়তো সামনে করোনা সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে টিকাই আমাদের বড় অস্ত্র হবে।’

নাইট্যাগের আরেক সদ্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা তো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এফডিএ অনুমোদিত টিকাগুলো ব্যবহার করতেই পারি। এর বাইরেও অনেক দেশ নিজস্ব দায়িত্বে বেশ কিছু টিকা ব্যবহার করছে। সেখানে তো আমরা সুফলও দেখছি, কিন্তু আমরা শুধু চার টিকাতেই আটকে আছি। আমরা এখন পর্যন্ত অন্য কোনো টিকার ট্রায়ালও করতে পারলাম না, আবার আনতেও পারলাম না।’ তিনি বলেন, ‘চীনের মাত্র একটি টিকাই আমরা পাচ্ছি, কিন্তু চীনের আরো তিনটি টিকা ভালোই কাজ করছে বলে দেখছি। ওই টিকার অনুমোদনও আছে। রাশিয়ার দুটি টিকা বিভিন্ন দেশে দেওয়া হচ্ছে, আমরা দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েও তা এখানো পেলাম না। আরো কয়েকটি দেশেই বেশ কয়েকটি করে টিকা দেওয়া হচ্ছে।’

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা তো খুব সহজ করেই বলতে পারি তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শেষ করা বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পাওয়া সব টিকাই কার্যকর ও নিরাপদ। কারণ এমন কোনো টিকা নিয়েই এখন পর্যন্ত কোনো বড় বিপদ দেখা যায়নি। তবে আমরা অন্য টিকাগুলো আনার ব্যাপারে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছি না কেন—এই প্রশ্ন তো যৌক্তিক।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘যথেষ্ট সুযোগ পেয়েও আমরা কয়েকটি ভালো টিকার ট্রায়াল হাতছাড়া করেছি। আমরা চীনের ও রাশিয়ার টিকার সঙ্গে প্রথম দিকে তৎপর হয়েও এখন ৫০-৬০টি দেশের পেছনে পড়েছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় থাকা টিকার সংখ্যা দেশে আরো বাড়াতে পারলে টিকা কার্যক্রমে আরো গতি আসবে।’ ওই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এখন কোনো কোনো টিকার দ্বিতীয় জেনারেশন শুরু হয়েছে। ফলে আমাদের নীর্তিনির্ধারকদের উচিত, আগেভাগেই সেদিকে নজর রাখা এবং দ্বিতীয় জেনারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় বুকিং নিশ্চিত করে রাখা। নয়তো আমাদের আবার পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত দেশে এসেছে শুধু অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার, মডার্না ও সিনোফার্মার টিকা। এর বাইরে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা আগামী বছরে পাওয়া যাবে চুক্তির ভিত্তিতে। বাকি অনুমোদিত টিকার মধ্যে রাশিয়ার স্পুিনক ভি ও স্পুটনিক লাইট, চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম-উহান, ক্যানসিনো, কিউবার নোভাভ্যাক্স ও ভারতের কোভ্যাকসিন টিকাগুলো অনেক দেশে দেওয়া হলেও বাংলাদেশ এখনো তার নাগাল পায়নি। এমনকি জরুরি ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া আরো অনেক টিকা বিভিন্ন দেশে দেওয়া হলেও বাংলাদেশ তা করছে না। অন্যদিকে দফায় দফায় ট্রায়ালের নানা উদ্যোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েও সেটা আবার থেমে যায়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বে এখন পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ মানুষ পূর্ণ ডোজ টিকা পেয়েছে। আংশিক পেয়েছে ১২ শতাংশ। এর মধ্যে মোট টিকা দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৭৫ কোটি ডোজ। দুই ডোজ পূর্ণ করেছে ২৩৫ কোটির বেশি মানুষ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট টিকা দেওয়া হয়েছে সাড়ে তিন কোটি ডোজের মতো। এ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের বেশি বয়সী ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষকে টিকার দেওয়া যে টার্গেট করা হয়েছিল এর মধ্যে দুই ডোজ পূর্ণ করা মানুষের সংখ্যা দেড় কোটির কাছাকাছি বা ১২ শতাংশ। এক ডোজ পেয়েছে ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে মোট জনগোষ্ঠী হিসাবে এখন পর্যন্ত টিকা পেয়েছে ৫ শতাংশের কাছাকাছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (টিকা ব্যবস্থাপনা) ডা. সামসুল হক বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত চার ধরনের টিকা হাতে পেয়েছি। সামনে আরো টিকা পাব, সেই আশা আছে।’



সাতদিনের সেরা