kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

করোনা ছাপিয়ে উৎসবের রং

বন্যাকবলিত ৭০০ স্কুল প্রথম দিন খোলেনি

শরীফুল আলম সুমন   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনা ছাপিয়ে উৎসবের রং

দীর্ঘদিন পর প্রিয় ক্যাম্পাসে এসে আনন্দে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তোলা। ছবি : শেখ হাসান

এক হাতে স্যানিটাইজার, আরেক হাতে লাল গোলাপ। সহপাঠীর হাতেও তা-ই। চেনা মুখ শুধু মাস্কে ঢাকা। স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার প্রথম দিন গতকাল রবিবার রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন দৃশ্য ছিল অবিরল। কোনো স্কুলে ফুল দিয়ে, কেউ বা বেলুন ও রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে স্কুলের ফটক ও প্রাঙ্গণ। কোনো কোনো স্কুল তাদের ক্লাসরুমও সাজিয়েছে। ছোটদের স্কুলের দেয়ালে পড়েছে তুলির নতুন আঁচড়।

দীর্ঘ দেড় বছর পর শিক্ষার্থীরা ফিরেছে তাদের চেনা অঙ্গনে। তাদের বরণ করে নেওয়া হয় সাদরে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হয়েছে সবাইকে।

রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইব্রাহীমপুর শাখায় সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ। শিক্ষার্থীদের সবার মুখে ছিল মাস্ক। প্রবেশের সময় মাপা হলো তাপমাত্রা। শিক্ষকরা স্বাগত জানালেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর ১২টার মধ্যে শেষ হলো মর্নিং শিফট। এরপর শুরু হলো ডে শিফট।

মর্নিং শিফটের ক্লাস শেষে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিক জানায়, ‘স্যাররা শুধু গল্প করেছেন। এত দিন কী করেছি, তা জিজ্ঞাসা করেছেন। মাস্ক পরার কথা বলেছেন। ক্লাসের শেষ দিকে কিছুটা পড়িয়েছেন।’

পাশেই দাঁড়ানো আরিকের বন্ধু শোয়েব বলেন, ‘অনেক দিন পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। অনেককেই ভুলে গেছি। স্কুলে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’

দেশের সব স্কুল-কলেজই তাদের শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেয়। কোনো স্কুলে ড্রাম বাজিয়ে, কোনো স্কুলে ফুল দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। কেউ বা বেলুনসহ নানা ধরনের রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে ফটক ও প্রাঙ্গণ। কোনো কোনো স্কুল তার ক্লাসরুমও সাজিয়েছে।

স্কুলের বাইরে স্বাস্থ্যবিধি উধাও : স্কুলের ভেতর গিয়ে সারিবদ্ধ হয়েছে শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষেও তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসেছে। অর্থাৎ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থবিধি মানানোর চেষ্টা করেছেন শিক্ষকরা। তবে স্কুলের গেটের বাইরে ছিল সেই চিরচেনা ভিড়, অভিভাবকদের জটলা। স্বাস্থবিধির বালাই নেই। অভিভাবকরা গেটের বাইরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে জড়ো হয়েছেন। এ ছাড়া ছুটির সময় বড় জটলার সৃষ্টি হয়। অভিভাবকরা গেটের বাইরে জড়ো হন। এর পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ দোকান, কোচিং ও টিউশনির জন্য কার্ড বিতরণকারীদের কারণে জটলা বেড়ে যায় আরো বেশি। রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়।

মনিপুর স্কুলের ইব্রাহীমপুর শাখার সামনে শারমিন আক্তার নামের এক অভিভাবক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাত্র দুটি ক্লাস হচ্ছে। এই সময়ে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আবার পরে এসে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই স্কুলের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। আবার ছুটির সময় যদি গেটের সামনে না থাকি, তাহলে বাচ্চা বের হলে ভয় পাবে। যদি স্কুল কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নিয়ে অভিভাবকদের সারি করে দাঁড়িয়ে বাচ্চা পৌঁছে দেয়, তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব।’

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অভিভাবকদের মুখে মাস্ক থাকলেও ছিল না সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব, যা করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন অনেকেই।

দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশ : স্কুল খোলার প্রথম দিনে রাজধানীর আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এ সময় একটি কক্ষ অপরিচ্ছন্ন থাকায় কলেজের অধ্যক্ষ হাছিবুর রহমান এবং ওই প্রতিষ্ঠানে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন তিনি।

মাউশি সূত্র জানায়, আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের উপপরিচালক সেলিনা জামান এবং মাধ্যমিক উইংয়ের (সেসিপ) সহকারী পরিচালক কাওছার আহমেদ। তবে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে শুধু সেলিনা জামানকে বরখাস্তের অংশ হিসেবে শুরুতে শোকজ করা হচ্ছে। কাওছার আহমেদকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে একটি গ্রুপ। তিনি আগে থেকেই একটি সিন্ডিকেটের অংশ হয়ে মাউশিতে নানা অনিয়ম করে যাচ্ছেন। কাওছার আহমেদ আজিমপুর গভর্নমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দায়িত্বে ছিলেন না বলে এরই মধ্যে মহাপরিচালকে জানানো হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে অপরিচ্ছন্ন কক্ষ দেখতে পেয়ে অধ্যক্ষ এবং মাউশি অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা এই স্কুলে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সবাইকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। যদি মাউশির একাধিক কর্মকর্তা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তাঁদের সবাইকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। মাউশি মহাপরিচালক এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।’

তাত্ক্ষণিক পরিদর্শন চলবে : আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন শেষে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, ‘এখন থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সারপ্রাইজ ভিজিট চলবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা পেলে প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, করোনা ও ডেঙ্গু থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে গিয়ে কোথাও যদি কোনো নিয়মের ব্যত্যয় দেখি, তাহলে সংশ্লিষ্ট যাঁরা থাকবেন শিক্ষক বা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা যে-ই হোন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সবার সচেতনতা এক রকম নয়। যাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যাবেন, তাঁদের একটু সচেতন থাকতে হবে। স্কুলের আনাচে-কানাচে খুঁজে দেখতে হবে, কোথাও যেন ময়লা না থাকে।

সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে না নিয়ে অনলাইনে পাঠদান এবং অ্যাসাইনমেন্টে ফিরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘যদি কোনো আশঙ্কা দেখা যায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার, সে ক্ষেত্রে আমাদের তো সুযোগ রয়েছে শ্রেণিকক্ষে না রাখার। সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে, সবার মধ্যে একটা সাজ সাজ রব আছে। একই সঙ্গে শত শত মেসেজ, ই-মেইল আমার কাছে এসেছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবেন না।’

অভিভাবকদের জটলা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জনপ্রতিনিধিরা, সুধীসমাজ, গণ্যমান্য লোকজন আছেন; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের বিঘ্ন না করে সবাই মিলে তদারকি করতে হবে, যেন অভিভাবকরা ভিড় না করেন। এ ছাড়া প্রতি জেলায় আমাদের একটি কন্ট্রোল রুম আছে। এগুলো প্রচারও করা হবে। যে কেউ যদি বলেন, এই স্কুলে-মাদরাসায় এই সমস্যা আছে, তাহলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।’

স্কুলের সামনে জটলা না করার আহ্বান : স্কুলের সামনে অভিভাবকদের জটলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। গতকাল মতিঝিলের আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে তিনি এই আহ্বান জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাসে আছে। শিক্ষার্থীরা শারীরিক দূরত্ব মেনে পাঠদানে অংশ নিচ্ছে। তারা নিজেরাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে এসেছে, মাস্ক পরেছে। সেই সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের হ্যান্ড থার্মাল দিয়ে তাপমাত্রা মেপে দেখছেন। তিনি বলেন, আজ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও বন্যাকবলিত এলাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সেগুলো চালুর বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনে উপস্থিতি কম : মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনে উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। তবে শিক্ষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, সবেমাত্র স্কুল খুলেছে, আগামী সপ্তাহেই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।

রাজধানীর হাজারীবাগ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণিতে দুই শাখা মিলে মোট শিক্ষার্থী ৭০ জন। কিন্তু গতকাল উপস্থিত ছিল ৪০ জন। উপস্থিতির হার ৫৩। আর তৃতীয় শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ৮৯ জন। উপস্থিত ছিল ৫৬ জন। উপস্থিতির হার ৬৩ শতাংশ।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলেও উপস্থিতি ছিল অনেক কম। রাজধানীর মাটিকাটায় স্কাইলার্ক মডেল স্কুলের অধ্যক্ষ মো. সাফায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রেণি হিসেবে তার স্কুলে উপস্থিতির হার ছিল ১৫ শতাংশের কিছুটা বেশি। তবে কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ কালের কণ্ঠ বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার ছিল ৮২ শতাংশ। মাস্ক ছাড়া শুধু একজন ছাত্রী স্কুলে এসেছে। তাকে স্কুল থেকে মাস্ক দেওয়া হয়েছে। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার তাঁর ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞানের ছয়টি, বাণিজ্যের একটি, মানবিকের একটিসহ মোট আটটি শাখা রয়েছে। এতে মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ২০০ জন। গতকাল উপস্থিত হয়েছে এক হাজার ৯২ জন।’

গতকাল মাউশি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিদিন বিকেল ৪টার মধ্যে আঞ্চলিক পরিচালক, উপপরিচালক ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উপস্থিতি ও সমস্যার বিষয়ে জানাতে হবে।

বন্যার কারণে খোলেনি ৭০০ স্কুল : বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে অনেক স্কুলের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকেছে। বেশির ভাগ স্কুল প্রাঙ্গণ তলিয়ে গেছে। অনেক স্কুল থেকে পানি নেমে গেলেও কর্দমাক্ত হওয়ার ক্লাস করার উপযোগী হয়নি। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি স্কুল এই বছর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

মাউশি অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে বন্যাকবলিত সাত শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেগুলোতে গতকাল ক্লাস শুরু করা সম্ভব হয়নি। এসব স্কুল থেকে পানি নেমে গেছে। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই ক্লাস শুরু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 



সাতদিনের সেরা