kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কাজ করলেই তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

তৃণমূলের বিরোধ মেটানোর তাগিদ

► খোলামেলা কথা নেতাদের
► অপপ্রচার রোধে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রধানমন্ত্রীর

আবদুল্লাহ আল মামুন ও তৈমুর ফারুক তুষার   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তৃণমূলের বিরোধ মেটানোর তাগিদ

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান এখনো আওয়ামী লীগ হতে পারেননি মন্তব্য করে তাঁকে আওয়ামী লীগ হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এই পরামর্শ দেন। বৈঠকে নাটোর থেকে নির্বাচিত দলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। কানাডার ‘বেগমপাড়া’ হিসেবে বিশেষণ পাওয়া অভিজাত এলাকায় এমপি শিমুলের বাড়ি থাকা নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখির বিষয়ও বৈঠকে উঠে আসে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাদের কোন্দলের বিষয়টি শুনে শেখ হাসিনা এমপিদের দলের ওপর খবরদারি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি জেলা, উপজেলায় দলের কমিটিতে এমপিদের মূল পদে না রাখতেও নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার রোধে দলের প্রধান সভায় নেতাদের দেওয়া পরামর্শে বলেন, অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সামনেই বাগবিতণ্ডায় জড়ান কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা। ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম তাঁর বিভাগের ১৭ সাংগঠনিক জেলার সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তিনি মাদারীপুর জেলার নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে এ ব্যাপারে দলের প্রধানের পরামর্শ চান। এ সময় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং একসময়ের জাসদ নেতা শাজাহান খান বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা গিয়ে অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু আমাকে জানানো হয় না। আমার সঙ্গে কোনো আলোচনাও করা হয় না।’

তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা তো ঠিক না। কোনো এলাকায় দলের অনুষ্ঠান হলে সেখানকার কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে অবশ্যই সমন্বয় করতে হবে। আপনি দলের সিনিয়র নেতা। আপনাকে বাদ দিয়ে কেন অনুষ্ঠান করবে।’ এ সময়ে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আমরা বাধ্য হয়েই অনুষ্ঠান করেছি। মাদারীপুরে পুরনো ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয় না। এমনকি কেউ মারা গেলে তার স্মরণসভা পর্যন্ত করা হয় না।’ নাছিমের উদ্দেশে তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো বলেছিলাম উনি (শাজাহান খান) জাসদ করুক। জাসদে থেকে আমাদের সঙ্গে কাজ করুক। কিন্তু তোমরা তো তাঁকে জোর করে আওয়ামী লীগে নিয়ে এলে। এখন তাঁর সঙ্গে এত লাগে কেন?’ এরপর শাজাহান খানের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনি তো ওই এলাকার সবচেয়ে সিনিয়র নেতা। আপনি সবাইকে নিয়ে চলবেন। আপনি এখনো আওয়ামী লীগ হতে পারলেন না? আপনি আওয়ামী লীগ হয়ে যান।’

আলোচনা উঠে এসেছে মাদারীপুরের একটি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ তাঁর উপজেলায় আওয়ামী লীগের একটি কমিটি করেছেন। আবার জেলা আওয়ামী লীগও একটি কমিটি করেছে। তবে সভায় উপস্থিত গোলাপ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কোনো কমিটি গঠন করিনি।’

সভায় রাজশাহী বিভাগের নাটোর ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দলের বিষয়টি তোলেন বিভাগটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক। এ সময়ে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে তীব্র কোন্দলের বিষয়টিও আলোচনা হয়। একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাটোর জেলা কমিটি ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেন। এসব শুনে শেখ হাসিনা খুব দ্রুত নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করার নির্দেশ দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক কালের কণ্ঠকে জানান, নাটোর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের কর্মকাণ্ডে বৈঠকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। কানাডায় ‘বেগমপাড়ায়’ তাঁর বাড়ি আছে—এ ধরনের ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা নিজের মোবাইল ফোন ওপরে তুলে ধরে নেতাদের উদ্দেশে বলেন,  ‘সে অল্প বয়সে অনেক কিছু পেয়ে গেছে। তাই তার মাথা ঠিক নেই। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। কানাডার ব্যাপারে তার নামে লেখালেখি হয়েছে। তার কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রাখতে হবে।’

পাবনা জেলার সম্মেলন আয়োজন নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। শিগগিরই এ জেলার সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ হবে। এ ছাড়া নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দল, নারায়ণগঞ্জে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া, রাজবাড়ী জেলার সম্মেলন আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়। আগামী ১৬ অক্টোবর রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব দেখান দলের প্রধান শেখ হাসিনা। তবে কারো বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ সঠিক কি না সেটি ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন,  ‘যারা দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কাজ করছে বিভিন্ন জায়গায়, তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ব্যাপারে ছাড় দেওয়া যাবে না।’ আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তৃণমূলের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বৈঠক থেকে।

রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান পাবনা পৌর নির্বাচনের বিদ্রোহীদের বিষয়ে কথা বলেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে যাঁরা দলের কাছে লিখিতভাবে ক্ষমা চেয়েছেন তাঁদের মাফ করে দিয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেন শেখ হাসিনা।

সকাল সাড়ে ১০টায় গণভবনে বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা। শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলে এই বৈঠক। বৈঠকে ৫৩ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্যবিধির কথা বিবেচনায় নিয়ে এই সভায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক কালের কণ্ঠকে জানান, বৈঠকে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা হয়। সুমন খান নামে একজন বিতর্কিত নেতাকে দলে রাখার ব্যাপারে স্থানীয় কয়েকজন নেতা চাপ দিচ্ছেন—এই অভিযোগ করেন রংপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক। তিনি এই বিষয়ে শেখ হাসিনার নির্দেশনা চান। জবাবে শেখ হাসিনা সাংগঠনিক সম্পাদককে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন।

ওই নেতা আরো জানান, সৈয়দপুর পৌর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক দীল নেওয়াজকে উপজেলা কমিটি বহিষ্কারের সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশ বৈঠকে উপস্থাপন করেন রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক।  

এমপিদের খবরদারি করতে মানা করলেন সভাপতি

সভায় দেশের সাত বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্টে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের কোন্দলের বিষয়টি উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নানা বাস্তবতায় আমরা এমপিদের মনোনয়ন দিয়ে থাকি। তাঁরা দলের জন্য কাজ করবেন—এটাই চাওয়া। কিন্তু তাঁরা যদি দলের কাজ বাধাগ্রস্ত করেন, খবরদারি করেন, সেটা মেনে নেওয়া হবে না।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে এমপিদের মূল পদে না রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘একেকজন দুই-তিনটা করে পদ নিয়ে খবরদারি করে, নিজেদের মধ্যে বিবাদ করে। এগুলোর দরকার নাই। এমপিরা তাদের কাজ করুক। অন্য নেতারা দল পরিচালনা করুক।’ চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশের বাইরে থাকায় এ বিভাগের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়নি।

অপপ্রচারকারীদের লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

সূত্রগুলো জানায়, সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘সামনে নির্বাচন, এখন আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীরা নানা ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত আছে। তাদের বিরুদ্ধে জবাব দিতে হবে। তথ্য-প্রমাণ, যুক্তি সহকারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা বিষয় তুলে ধরতে হবে। যারা অপপ্রচার করবে, তাদের কাছে সেসব বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ চাইতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।’

 



সাতদিনের সেরা