kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কূলহারা মানুষ ছাড়ছে উপকূল

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



কূলহারা মানুষ ছাড়ছে উপকূল

সুন্দরবনের কাছেই দাকোপ। সেখানেই ঢাকি নদীর থইথই জল। নদীর তীরেই ছোট জালিয়াখালী গ্রাম। ওই গ্রামে ছিল সত্তর পেরোনো মনোরঞ্জন রায়ের বাস। ঢাকির পারেই ছিল তাঁর সাজানো বিত্তবৈভব। সারি সারি ফলদ আর বনজ গাছের বাগিচা। ৬০ বিঘারও বেশি ফসলি জমি, ধানের গোলা। ছিল একাধিক সুরম্য বাড়ি। ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার দংশনে মনোরঞ্জনের জীবনের গল্পটাই বদলে যায়। ঝড়ের এক বছরের মধ্যেই চোখের সামনে আগ্রাসী ঢাকি নদী একটু একটু করে গিলে ফেলে মনোরঞ্জনের সব কিছু। এর পর থেকেই ফিকে মনোরঞ্জনের মনের রং, সেখানে শুধু বিষাদেরই কালো ছায়া। সব হারানো মনোরঞ্জনের এখন পাশের গ্রাম কামারখোলায় বাস। ধার করে জমি কিনে কোনো রকমে সেখানে তুলেছেন একটি বাড়ি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদ। সেখানে মনোরঞ্জনের মতো অনেকেই ভুগছে কষ্টের গোপন ব্যাধিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকতে না পেরে অনেকেই ছাড়ছে উপকূল। সর্বস্বান্ত এসব মানুষ জীবিকার অন্বেষণে তাদের দীর্ঘদিনের বসতি ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। কেউ কেউ হচ্ছে দেশান্তরি।

প্রাথমিকভাবে আইলার ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব ভয়ংকরভাবে পড়ে। ওই সময় খুলনার দাকোপ ও কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়। ১২টি ইউনিয়নের ২২৫টি গ্রাম পুরোপুরি নোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি ও পেশা হারিয়ে উপদ্রুত এলাকা থেকে বাস্তুহারা হয়ে পড়ে দুই লাখ ৯৭ হাজার মানুষ।

বসতি গেছে কাজ নেই, শহরমুখো মানুষ :  দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের কালাবগি গ্রাম। সেখানে ভদ্রা (সুতারখালী) ও শিবসা নদী এক হয়ে দক্ষিণে সাগরমুখো হয়েছে। নদীর দক্ষিণ পারে সুন্দরবন। উত্তরে মাটির বাঁধ দিয়ে প্রমত্তা ভদ্রা-শিবসাকে আটকে রেখে চলছে জনপদ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। জোয়ারের পানির দাপটে বারবার ভাঙছে বাঁধ। আর কমছে বসতি। আইলা আঘাত হানার পর এই ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। জীবনধারণ এখানে কষ্টের। কাজ নেই, ফসল নেই। নেই তালিকায় আছে খাবার পানিও। আছে নোনা পানির চিংড়ি চাষ। তা-ও এটি নিয়ন্ত্রণ করে গুটিকয়েক মানুষ। ফলে উপায়হীন অনেকেই এখনো ছাড়ছে এলাকা।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যার যেমন সুযোগ আছে, সেদিকে চলে গেছে। পাশের কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে ২৬টি পরিবার নতুন বসতি গড়ে তুলেছে। তারা ওই নতুন বসতির নাম দিয়েছে ‘অতিথিপাড়া’। এদের সবারই বাস ছিল কালাবগিতে। সামর্থ্যমতো জমি কিনে অনেকেই বসতি গড়েছে। তবে এখানকার পুরুষ সদস্যরা বেশির ভাগ এখনো কাজের জন্য সুন্দরবন বা কালাবগির ওপর নির্ভর করে। ভোরের আলো ফুটতেই তারা নৌকা নিয়ে মাছ, চিংড়ি পোনা, কাঁকড়া সংগ্রহে বেরিয়ে পড়ে।

কামারখোলার ঠাকুরবাড়ী খেয়াঘাট পার হলেই অতিথিপাড়া। কিছুটা এগোলেই চোখে পড়ে রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠা বাড়ির সারি। এখানে ঘর তুলেছে কেনা সরদার, মোতালেব মোড়ল, পুলিন মণ্ডল, গৌরপদ মণ্ডল, নীহার মণ্ডল, ললিত চন্দ্র মণ্ডলের পরিবার। আইলার পর ধীরে ধীরে তারা কালাবগি ছেড়ে এখানে এসে বসতি গড়ে তুলেছে। তারা জানায়, কালাবগিতে বাস করার সুযোগ কমে আসছিল। ভাঙনে সব কিছু যাচ্ছিল নদীর পেটে। এখনো ভাঙন বেশ তীব্র। আইলার পর থেকে ভিটামাটি আঁকড়ে বেঁচে থাকার কোনো উপায় ছিল না, তাই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে তারা।

সেখান থেকে অনেকেই গেছে খুলনা নগরী কিংবা অন্য কোনো স্থানে। কালাবগির কবির খানের চার সদস্যদের পরিবারটি এখন বাস করে খুলনা শহরের গল্লামারীর জিরো পয়েন্ট এলাকার কাছে। কবির খান বলেন, ‘কালাবগিতে আমাদের বেশি জমি ছিল না। থাকার জায়গাটুকু ছিল। দিনমজুরি ছিল আয়। আইলার পরে কাজের সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে খুলনা শহরে চলে আসি।’

সুতারখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম আছেন খুলনা নগরের বসুপাড়া রহমতপাড়া মসজিদের কাছে। আইলার পর তিনি চলে আসেন এখানে। যখন যে কাজ জোটে, তা-ই করেন। তাঁর ভাষায়, ‘গ্রামে কাজ নেই। এখানে কাজ আছে। ভালো আছি।’

সুতারখালী ইউনিয়নের নলিয়ান গ্রামে ছিল সোনাই মল্লিকের বাড়ি। এখন তিনি পুরো পরিবার নিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন পাহাড়ি জনপদ বান্দরবানে। সোনাই মল্লিকের পরিবারটি আইলার পর খুলনা শহরে চলে যায়। কিছুদিন পর জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে চলে যায় বান্দরবান। সেখানে পাহাড় কেটে বসতি গড়েছে। নলিয়ানের কেওড়াতলী গ্রামে নদীর পারে তাদের সাজানো-গোছানো ভিটা ছিলে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের ভালোই কাটছিল, কিন্তু সর্বনাশা আইলা তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। বসতির জমিটুকুও চলে যায় নদীগর্ভে। খুলনা শহরে গিয়েও দিন কাটানোর মতো স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি করতে না পারায় চলে যায় বান্দরবান।

অনেকেই গেছেন ভারতে : সুতারখালী, কালাবগি ও জালিয়াখালীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার চলে গেছে ভারতে। ২০০৯ সালেই আইলার পর পর নির্মল রায়ের পরিবার ভারত চলে যায়। ভবেশ রায়ের পরিবার গেছে ২০১০ সালে। তিনি এখন থাকেন মহারাষ্ট্রে। একই বছর গেছে অমল রায়, মৃণাল রায় ও প্রকাশ রায়ের পরিবার। অমল ও মৃণাল রায়ের পরিবার থাকে কলকাতা শহরে। প্রকাশ রায়ের পরিবার থাকে বারাসাতের পিয়ালিতে। ২০১২ সালে ভারতে পাড়ি জমিয়েছে জিতেন্দ্রনাথ রায়, শ্যামল মণ্ডল, অমল মণ্ডল ও মহাদেব মণ্ডলের পরিবার। আইলার পর ভদ্রা-শিবসার প্রবল ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে বুদ্ধিশ্বর গাইন ২০১৩ সালে ভারতে পাড়ি জমান। এ ছাড়া ছোট  জালিয়াখালী গ্রামের রণজিৎ রায়, মনোজিৎ রায়, ভূপতি জোদ্দার, ভবেন জোদ্দার, তপন মণ্ডল, সুশান্ত মণ্ডল, স্বপন মণ্ডল, অর্ণব রায়, পূর্ণিমা মণ্ডলের পরিবারও দেশ ছেড়ে গেছে ভারতে।

বাঁধের কোণে ধুঁকছে কিছু পরিবার : দাকোপের বটবুনিয়া বাজারের খেয়াঘাট থেকে নৌকায় ঢাকি নদী পার হয়ে ওপারে গেলেই জালিয়াখালী গ্রাম। পূর্বদিকে কিছুদূর হেঁটে গেলে বিশাল এলাকাজুড়ে ধনুকের মতো বাঁকানো নতুন বাঁধটি দেখে চোখ আটকাবে। বাঁধের বাঁ পাশে বিশাল এলাকায় এখনো আসে জোয়ারের পানি, ভাটায় আবার নামে। এখানেই ছিল ছোট জালিয়াখালী গ্রাম, যা এখন ঢাকি নদীর পেটে।  

ঢাকি নদীর পারে ছিল বাঁধ, এটি ভেঙে যায় আইলার আঘাতে। এর ফলে তৈরি হয় একটি নালা। বাঁধের ভাঙন যখন ছোট ছিল, তখন কেউই তা পাত্তা দেয়নি। পরে যখন ভাঙন এলাকাটি মেরামত করে বাঁধ আবারও তৈরির চেষ্টা করা হলো, তখন আর নদীর স্রোত আটকানো যায়নি। ওই সময় ভাঙন অনেক বড় হয়ে যায়। নদীর জোয়ারের প্রবল চাপে সেই নালা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। পানি হু হু করে ঢুকতে থাকে, আর ভাঙনের স্থান বড় হতে থাকে। একসময় তা বিশাল নদীর আকার ধারণ করে। এ রকম প্রেক্ষাপটে আশপাশের জনপদ ভাঙতে শুরু করে। ফলে ছোট জালিয়াখালী গ্রামটি পুরোটাই নদীগর্ভে চলে যায়। এতে একেবারে পথে বসে গ্রামের মানুষ। অবশ্য বিশাল এলাকা বাদ দিয়ে সেখানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। গ্রামটির কিছু পরিবার এখনো বাঁধের এক কোনায় বসতি গেড়েছে, আর অন্যরা চলে গেছে নিজেদের সুবিধামতো জায়গায়।

ওই বাঁধেরই কোনায় পাওয়া গেল পরিতোষ বাইনকে (৫০)। তিনি জানান, এখনো বাঁধের কোনায় ২২টি পরিবার বাস করছে। তাদের আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনিও পারেননি যেতে। ছোট জালিয়াখালী গ্রামে বাস করত ৮০টি পরিবার। মানুষ ছিল প্রায় ৫০০। ভাঙনের ওই স্থানে বাঁধ ছিল খুবই দুর্বল। বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য কাটা হয়েছিল বাঁধ, সেখানেই তৈরি হয়েছিল ক্ষত। আইলায় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ওই ভাঙা স্থানটি বড় হয়, যা পরে আরো বড় হয়ে ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটায়। ওই সময় থেকেই সবাই বাঁধের ওপরে ছিল। বছরের পর বছর পার হলেও পুনর্বাসনের কোনো আশা না দেখে একে একে সবাই এলাকা ছেড়ে যায়।

আইলা-পরবর্তী নদীভাঙনে কালাবগি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম ঢালীর (৭০) ভিটেমাটি চলে গেলেও তিনি এলাকা ছাড়েননি। এখনো বাস করেন বাঁধে। কালাবগি বিলে তাঁর ৫০ বিঘা জমি ছিল। কিন্তু আইলার পর একটু একটু করে সব জমিই চলে গেছে নদীগর্ভে। তাঁর অভিযোগ, সরকার অনেক অনুদান দিলেও তিনি কিছুই পাননি। নলিয়ান গ্রামের বাসিন্দা নগেন্দ্রনাথ ঢালী (৬৫) ও গুনারী বাজার এলাকার আবুল কাশেম গাজীর (৫৫) অবস্থাও তথৈবচ। তাঁরা উভয়ে একসময়ের সচ্ছল কৃষক। উৎপাদিত ধানে তাঁদের বছর চলে যেত। কিন্তু আইলার দাপটে সব কিছু খুইয়ে এখন রাস্তার ওপর বাস করেন।

জনপ্রতিনিধিরা যা বলছেন : এ ব্যাপারে দাকোপ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান গৌরপদ বাছাড় জানান, পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করার জন্য তিনি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনেক আলোচনা করছেন। কোথাও খাসজমি না পাওয়ায় তাদের পুনর্বাসন করা যায়নি। 

তাঁর মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চারদিকে নদীবেষ্টিত কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। বাঁধ ভেঙে নদীর নোনা পানিতে দুই বছরেরও বেশি সময় এলাকা ডুবে ছিল। এলাকায় কোনো ফসল ফলেনি। ঘরবাড়ি ধসে যায়। ফলে উপায়হীন মানুষ এলাকা ছাড়তে শুরু করে। যাঁর যেখানে সুবিধা আছে, তাঁরা সেখানেই গেছেন। আসলে এখানে মানুষের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ। সরকারকে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এই এলাকায় বাস্তুহারা মানুষের মিছিল ঠেকানো যাবে না। তিনি বলেন, ‘আইলাদুর্গত অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে গেছেন। তাঁদের অনেকে যেমন ভারতে গেছেন, তেমনি বান্দরবান, রাঙামাটিতেও গেছেন। গুটিকয়েক মানুষ এখনো বাঁধের পারে বাস করছেন। তবে কত মানুষ এলাকা ছেড়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোনো তথ্য নেই।’

এদিকে সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য বাসু দেবের মতে, কাজের সুযোগ না থাকা এবং জীবন-জীবিকা চলার উৎস একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ এলাকা ছাড়ছে। কেউ তো আর জন্মভিটা ছেড়ে যেতে চায় না; কিন্তু যাচ্ছে, যেতে বাধ্য হচ্ছে।



সাতদিনের সেরা