kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ঐক্যে লাভবান হয়েছে দেশ

হাসানুল হক ইনু সভাপতি, জাসদ

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ঐক্যে লাভবান হয়েছে দেশ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু মুক্তিযুদ্ধের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। তাঁর দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির অতীত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছেন, জাসদ ও আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ফিরছে। লাভবান হয়েছে দেশ। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠ’র তৈমুর ফারুক তুষার।

কালের কণ্ঠ : ১৯৭২ সালে আপনারা আওয়ামী লীগ ছেড়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধিতায় নেমে জাসদ গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় দলটির সঙ্গে জাসদের দূরত্ব কমেনি। এখন এই দূরত্ব কিভাবে কমল? আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠনের

বিষয়ে জানতে চাই।

ইনু : ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে জাসদ ও আওয়ামী লীগসহ ১০ দলীয় জোট হয়েছিল। এই জোটে সাম্যবাদী দলের কমরেড তোয়াহা, আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি (ন্যাপ-মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টি—সবাই ছিল। পিকিংপন্থী, মস্কোপন্থী, জাসদ—সবার সঙ্গেই আওয়ামী লীগ ঐক্য করেছিল। এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। ওই জোটে আওয়ামী লীগ, জাসদসহ অন্যরা ছিল। পরবর্তী সময়ে জাসদসহ পাঁচদলীয় জোট, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট হয়। তিন জোটের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন হয়।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তৎকালীন জাসদের সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সমর্থনে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর জাসদের উদ্যোগী ভূমিকায় প্রথমে আওয়ামী লীগ ও জাসদ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ দলীয় জোট গড়ে ওঠে। ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত জাসদ ও আওয়ামী লীগের পরস্পরবিরোধী অবস্থান কখনোই দুই দলের মধ্যে ঐক্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এ ছাড়া জাসদ প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধিতা করেছে। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাতের পরিকল্পনা বা রাজনীতি করেনি। ফলে বঙ্গবন্ধুর আমলে জাসদের ভূমিকা মূল্যায়ন করেই, সব কিছু বিবেচনা করেই শেখ হাসিনা জাসদের সঙ্গে ঐক্য করেছেন। গড়ে উঠেছে ১৪ দলীয় জোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই জোট ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে গঠন করা মহাজোটের কারণেই বিপুল বিজয় হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঐক্য। যারা এই ঐক্যকে ধ্বংস করে দেওয়ার চক্রান্ত করছে তারা শেখ হাসিনার ক্ষমতাকেই ধ্বংস করে দেওয়ার চক্রান্ত করছে।

জোট করে আওয়ামী লীগ জাসদকে দয়া করেনি, জাসদও আওয়ামী লীগকে দয়া করেনি। রাজনৈতিক প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ, জাসদকে নিয়ে জোট হয়েছে। যদি কেউ একাই ক্ষমতায় যেতে পারতেন, একাই সরকার গঠন করতে পারতেন তাহলে ঐক্য করতেন না। পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে আওয়ামী লীগ লাভবান হয়েছে। দেশও লাভবান হয়েছে। সামরিক সরকার-খালেদা-বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক নির্বাসিত বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন। দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ফিরছে।

 

কালের কণ্ঠ : ১৪ দলের নেতৃত্বে থাকলেও আওয়ামী লীগ কি এখন ‘একলা চলো’ নীতিতে চলছে?

ইনু : আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক দল। তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড আছে, আবার জোটের কর্মকাণ্ডও আছে। করোনাকালে সমগ্র রাজনৈতিক তৎপরতা স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জোটের কাজও ধীরগতিতে চলছে। আওয়ামী লীগের নিজের দলীয় তৎপরতাই তো স্থবির হয়ে আছে। ফলে জোটেও তাদের ভূমিকা স্থবির। এটা নিয়ে পর্যবেক্ষকরা নানা রকম মন্তব্য করেন। তবে এখন পর্যন্ত আমার জানা মতে, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি জোট ধরে রাখার পক্ষে। জোটের শরিকরা যার যার দল করে। ফলে সব বিষয়ে যে তারা একমত হবে, এমন নয়। এমনকি পরস্পর পরস্পরের সমালোচনাও করতে পারে। কিন্তু ঐক্য যে কারণে করা হয়েছে সে কারণ বিদ্যমান থাকলে ঐক্যটা রক্ষা করার দায়িত্ব সবারই। ফলে পরস্পরের সমালোচনা দেখলে মনঃক্ষুণ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমরা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছি। আমরা প্রশাসনের অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে ১৪ দলকে আমরা ভেঙে দিতে চাই।

 

কালের কণ্ঠ : জাসদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা কেন সামনে আসছে, আপনি কী মনে করেন?

ইনু : এই মুহূর্তে অতীত নিয়ে বিতর্ক বর্তমান শত্রু-মিত্র-বিপদ-আপদকেই আড়াল করছে। বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গিবাদীদের সুবিধা দিচ্ছে।

 

কালের কণ্ঠ : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক অবসানের পথ কী?

ইনু : বিতর্কের অবসানের জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর সব ঘটনা, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, খুনিদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক কারা ছিল তা উদঘাটনের জন্য জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা দরকার। জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক শক্তি এখনো এ দেশে সক্রিয়। এই বিতর্কে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিগোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে। এখনকার রাজনৈতিক পর্ব হলো, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাকিস্তানপন্থা থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে প্রত্যাবর্তন পর্ব। এই পর্বটা এখনো টেকসই হয়নি, স্থায়ী হয়নি। এখনো বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত, জঙ্গিগোষ্ঠী চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। প্রশাসনে দুর্নীতির সিন্ডিকেট উন্নয়নের সুফল খেয়ে ফেলছে। বৈষম্য বাড়ার ফলে জনগণ উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি পাচ্ছে না। বাঙালিয়ানার পুনর্জাগরণ ভালোভাবে হয়নি। তাই এই প্রত্যাবর্তন পর্ব যতক্ষণ টেকসই না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজাকার সমর্থিত সরকার, হত্যা-খুনের রাজনীতি ও চক্রান্তের মধ্য দিয়ে অবৈধ সরকার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থেকে যায়।



সাতদিনের সেরা