kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

শেষটা আরো দাপুটে আরো মধুর

মাসুদ পারভেজ   

১০ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শেষটা আরো দাপুটে আরো মধুর

অবিশ্বাস্য! অস্ট্রেলিয়া দল ঢাকায় পা রাখার পর কে ভেবেছিল সিরিজ শেষের ফল ৪-১ হবে? অবশ্য সিরিজের ফল ৫-০ হলেও অবাস্তব কিছু মনে হতো না। প্রথম ম্যাচ থেকেই যে সফরকারীদের ওপর কর্তৃত্বের ছড়ি ঘুরিয়েছে বাংলাদেশ। আর পেছন থেকে ধারাবাহিকতার চিরায়ত ছবি সেই সাকিব আল হাসানকে ঘিরেই। গতকাল ৯ রানে ৪ উইকেট নেওয়া অলরাউন্ডার ম্যাচসেরার সঙ্গে জিতেছেন সিরিজসেরার পুরস্কারও। অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহ তো অভিনন্দন জানাবেনই দলের চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটারকে! ছবি : মীর ফরিদ

এবার আর মুস্তাফিজুর রহমানকে লাগলই না। এই সিরিজের আগের চার ম্যাচে দলকে জেতাতে কিংবা নিশ্চিত হারের মুখ থেকে ফিরিয়ে ম্যাচ জমাতে শেষের দিকে তাঁকে আক্রমণে আসতেই হয়েছে। শেষ ম্যাচে সেই সুযোগই হলো না এই বাঁহাতি পেসারের।

বলা ভালো, সুযোগ রাখলেন না সাকিব আল হাসান ও সিরিজে প্রথমবার খেলার সুযোগ পাওয়া মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। ষষ্ঠ ওভারে মুস্তাফিজকে আক্রমণে এনেছিলেন মাহমুদ উল্লাহ। এই সিরিজে পেসারের রূপ ধারণ করে স্পিনারের মতো চাতুরীতে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের ভুগিয়ে আসা বোলার মাত্র ৩ রান দিলেন ওই ওভারে। শেষে ব্যবহার করার জন্য অধিনায়ক তাঁর ওভারগুলো জমিয়ে রাখেন সাধারণত। এই ম্যাচেও তেমনই ভেবে রাখার কথা।

কিন্তু শেষ ঘনিয়ে আসার আগেই অস্ট্রেলিয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় মুস্তাফিজের ৩ ওভার অব্যবহৃতই থেকে গেল।

আগের ম্যাচে বল হাতে বেদম মার খাওয়ার পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও ছন্দহীন সাকিব স্বরূপে ফিরতেও সময় নিলেন না একদমই। অবশ্য এই ম্যাচেও ব্যাটিংয়ে যথেষ্টই ভুগেছেন তিনি। ১১ রান করতে ২০ বল খেলে ফেলা অলরাউন্ডার এরপর বোলিংয়ে ভাসলেন অনন্য এক কীর্তির ডানায়। লাসিথ মালিঙ্গার পর টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক পেরোতে দরকার ছিল দুই শিকার। তা তো ধরলেনই, ৩.৪ ওভারে মাত্র ৯ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেওয়া পারফরম্যান্সে ম্যাচের সেরাও। উইকেট শিকারের লড়াইয়ে তাঁর সঙ্গে এবার পাল্লা দিলেন প্রথম খেলতে নামা সাইফ উদ্দিনও। ৩ শিকার ধরলেন ১২ রানে।

ব্যাটসম্যানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারও কোনোমতে স্কোরবোর্ডে ৮ উইকেটে ১২২ রানের পুঁজি ডিফেন্ড করতে নামা বাংলাদেশ দেখল, একদিক থেকে সাকিব উইকেট তুলে নিচ্ছেন তো আরেক দিক থেকে সাইফ। মুস্তাফিজ তাই আরেকবার আক্রমণে আসার আগেই সাকিব-সাইফ মিলে স্বল্প পুঁজিকেও যথেষ্ট বলে প্রমাণ করে গুঁড়িয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়াকে। গুঁড়িয়ে দেওয়াই বলতে হয়। ৯ রানে সফরকারীরা হারাল তাদের শেষ ৬ উইকেট। এর তিনটি নিলেন সাকিব, তিনটি সাইফ। ১৩.৪ ওভারেই প্রতিপক্ষ গুটিয়ে গেল মাত্র ৬২ রানে। এটি অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে সর্বনিম্ন তো বটেই, বাংলাদেশের বিপক্ষেও কোনো দলের সবচেয়ে কম রানে অলআউট হওয়ার লজ্জা। ৬০ রানের বিশাল জয়ে বাংলাদেশও তাই সিরিজ জিতে নিল ৪-১ ব্যবধানেই।

প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করার দিনে ম্যাথু ওয়েডকে বোল্ড করে মাইলফলকের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ান সাকিব। এরপর অ্যাস্টন টার্নারকে নিজের শততম শিকার বানিয়ে আরেক কীর্তির নতুন পাতাও খুলে বসেন এই অলরাউন্ডার। টেস্ট ও ওয়ানডেতে এক হাজার রান এবং ১০০ উইকেটের ‘ডাবল’ অর্জন করা ক্রিকেটারদের লম্বা তালিকায় তাঁর ঠাঁই হয়েছিল আগেই। তবে টি-টোয়েন্টিতে তিনিই প্রথম। আর তিন সংস্করণেই এমন ‘ডাবল’ পূর্ণ করা একমাত্র ক্রিকেটারও সাকিবই, এই সিরিজে যাঁর ব্যাট হাতে খুব ভালো সময় যায়নি। তবু সিরিজ শেষে দেখা যাচ্ছে, সর্বোচ্চ ১১৪ রান তাঁরই। সেই সঙ্গে পাওয়া ৭ উইকেট তাঁর সিরিজ সেরা হওয়া নিয়েও রাখেনি কোনো সংশয়।

সিরিজের সপাপ্তিও টানলেন সাকিবই, চতুর্দশ ওভারে ৪ বলের মধ্যে জোড়া শিকার ধরে। প্রথম বলে নাথান এলিসকে বোল্ড করেন। দুই বল পর অ্যাডাম জাম্পাকে শর্ট কাভারে মাহমুদ উল্লাহর ক্যাচ বানালে শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। এর আগে অষ্টম ওভারে আক্রমণে এসেই ফেরান অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েডকে। ওই ওভারে রানও দেন মাত্র ৩! যদিও সফরকারীদের ইনিংসে প্রথম ধাক্কাটি দেন নাসুম আহমেদ। তা-ও সেটি পর পর দুই ওভারে। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলেই সাফল্য পান এই বাঁহাতি স্পিনার। আগের ম্যাচে তিনে নেমে ঝড় তোলা ড্যান ক্রিশ্চিয়ান এবার ওপেন করতে নেমে তা পারলেন না। পুল করতে যান, কিন্তু বল স্কিড করে আঘাত হানে স্টাম্পে। নাসুমের পরের ওভারে তুলে মারতে গিয়ে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে পড়েন সফরে অস্ট্রেলিয়ার সেরা ব্যাটসম্যান মিচেল মার্শও।

ওয়েডের বিদায়ের পরের ওভারে সফরকারীদের বিপদ বাড়ে আরো। ছক্কা মেরেই আবার মাহমুদের অফস্পিন ওড়ানোর চেষ্টায় রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বেন ম্যাকডারমটও। ৪৮ রানে ৪ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়ার জন্য যে কী বিভীষিকা অপেক্ষা করছে, সেটি তখনো অজানাই, সাইফের অফ কাটারে অ্যালেক্স ক্যারির বোল্ড হওয়ার মাধ্যমে যার শুরু। এক বল পর বাজে শটে এই পেস বোলিং অলরাউন্ডারকে জোড়া শিকারের আনন্দ দিয়ে যান মোয়েজেস হেনরিক্সও। সেখান থেকেই সাইফে শুরু আর সাকিবে শেষ অস্ট্রেলিয়ার।

শেষ ম্যাচে স্বাগতিকদের রুখতে তারাও নেমেছিল ছক বদলে। নিজেদের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো দুই স্পিনার দিয়ে বোলিং শুরু করা অস্ট্রেলিয়া বিশেষজ্ঞ পেসার খেলায় মাত্র একজন। শুরুতে কিছু আলগা বলের ফায়দা তুলে পাওয়ার প্লেতে সর্বোচ্চ ৪৬ রান তোলে বাংলাদেশ। এর মধ্যে প্রথম ৩ ওভারেই ৩৩, পরের ৩ ওভারে মাত্র ১৩! ১৫ ওভারে ১০২ রান তোলা বাংলাদেশের ইনিংস শেষ ৫ ওভারেও গতি হারিয়েছে। ২০টি ডট বল দিয়ে রান তুলেছে মাত্র ২০! গোটা ইনিংসে ডট বলের সংখ্যাও ৬১! তবে এত কিছুর পরও সিরিজের আগের চারটি ম্যাচ এই বার্তা দিচ্ছিল যে এই স্কোরেও জেতা সম্ভব। সাকিব আর সাইফের বোলিংয়ে যা হলো, সেটি অবশ্য কল্পনাকে হার মানানোই। গত রাত ১টায় চার্টার্ড ফ্লাইটে ফিরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার এই সফরে ব্যর্থতার এমন অতল দেখার ব্যাপারটিই যে কেবল বাকি ছিল!



সাতদিনের সেরা