kalerkantho

রবিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৮। ২৪ অক্টোবর ২০২১। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু ভয়ংকর

৯৬% রোগীই ঢাকায় , মৃত্যুও বাড়ছে

তৌফিক মারুফ   

৭ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু ভয়ংকর

করোনাভাইরাসের পাশাপাশি বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। ডেঙ্গুতে শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। ছবিটি গতকাল রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে প্রায় দুই বছরের মাথায় আবার ভয়ংকরভাবে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। দৈনিক আনুপাতিক হিসাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ করোনা সংক্রমণকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পাওয়া চিত্র অনুসারে, দৈনিক হিসাবে গত জুলাই মাসের তুলনায় চলতি আগস্টের গত ছয় দিনে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ৭০ শতাংশ বা তিন গুণেরও বেশি। জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল দুই হাজার ৪৮৬ জন, গড়ে প্রতিদিন ৭৩ জন। কিন্তু চলতি মাসের গত ছয় দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে এক হাজার ৪৫৭ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ২৪২ জন। অন্যদিকে জুলাই ও চলতি আগস্টে দৈনিক করোনা রোগী শনাক্তের হারে ১ থেকে ২ শতাংশের বেশি পরিবর্তন আসেনি।

পরিস্থিতিকে খুবই উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু করোনাভাইরাস নয়, এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও করোনার মতোই ডেঙ্গু নিয়ে অধিকতর সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এখন একই সঙ্গে অনেকের মধ্যে করোনা ও ডেঙ্গু দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের রোগী দ্রুত বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যায়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য ডেঙ্গু বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সে কারণে তাদের সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই হেলাফেলা করা যাবে না। উপসর্গ বোঝা মাত্রই করোনার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু পরীক্ষা অবশ্যই করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ছিল এক হাজার ১০ জন, যার ৯৬ শতাংশ ঢাকায়। ফলে বিশেষজ্ঞরা ঢাকার সব মানুষকে ডেঙ্গুর ব্যাপারে সতর্ক থেকে যার যার ঘর ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা মুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, এডিসের প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেছে। সিটি করপোরেশন বাইরে ওষুধ ছিটানো বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অভিযান চালালেও ঘরের ভেতরে এডিস মশা মুক্ত করার দায়িত্ব প্রতিটি পরিবারের নিজেদেরই নিতে হবে। কারণ সিটি করপোরেশনের লোকজন ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। অন্যদিকে এডিস মশা ঘরের মধ্যে বিভিন্ন পাত্রে জমানো পানিতে প্রজনন করতে পারে। এটা বেশি বিপজ্জনক ঘরে থাকা মানুষজনের জন্য। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে যেহেতু এখন বেশির ভাগ সময়ই মানুষ ঘরে থাকছে, তাই ঘরে জন্মানো এডিস মশা থেকে ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলেই করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু পরীক্ষাও করতে হবে। তিনি আরো বলেন, হাসপাতালগুলোতে বেশির ভাগই এখন করোনা রোগী। অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এদিকেও নজর দিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট রেখে সেখানে তাদের ভর্তি করাতে হবে। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে যাদের অবস্থা বেশি খারাপ হয় বা রক্তক্ষরণ পর্যায়ে চলে যায় তাদের আইসিইউতে রাখার ব্যবস্থা থাকা দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে গত এক মাসে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য এসেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কাছে। যদিও এখনো সেই তথ্য পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন হাসপাতালে মৃতদের স্বজনদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে দিচ্ছে যে তাদের রোগী ডেঙ্গুতে মারা গেছে। এই ১০ জনের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে দিশাহারা অবস্থায় রয়েছে দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতাল। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু রোগীদের অনেকেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেতে চায় না। অনেকেই নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও করোনা রোগী দিনে দিনে বেড়ে চলেছে।

যদিও এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর চিকিৎসাসেবা দিতে আলাদা প্রস্তুতি রয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা ওই প্রস্তুতিকে পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন। সামনে যেমন ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে তেমনি করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কাও রয়েছে। সে জন্য আগামী দিনগুলোতে দুই ধরনের রোগী নিয়ে হাসপাতালে আরো বেসামাল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালে দেশে ডেঙ্গুর মারাত্মক প্রকোপের সময় প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা করে ডেঙ্গু ইউনিট চালু করা হয়েছিল। এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে শুধু ঢাকায়ই সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৪১টি হাসপাতালে ডেঙ্গুর রোগীর ব্যবস্থা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রায় সব হাসপাতালেই ডেঙ্গু রোগীর জন্য চালু করা সেই ব্যবস্থাপনা এখন করোনা রোগীর ব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনাসহ রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রতিটি হাসপাতালে বারবার নোটিশ করেছি যে জ্বরের উপসর্গ নিয়ে রোগী এলেই আগে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা করাও হচ্ছে।’

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা শাখার পরিচালক ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন করোনা মহামারি মোকাবেলার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। সামনে করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে কিভাবে তা সামাল দেওয়া হবে তা নিয়েও নানা পরিকল্পনা চলছে। তবু এর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আমরা প্রাথমিকভাবে পাঁচটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করে রেখেছি।’ তিনি জানান, এই পাঁচ হাসপাতাল হচ্ছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিরপুর লালকুঠি হাসপাতাল, কামরাঙ্গীর চরের ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, আমিনবাজারের ২০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল এবং টঙ্গীতে আহসানউল্লাহ মাস্টার হাসপাতাল।

এসব হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্য রোগীর পাশাপাশি সব মিলিয়ে বড়জোর ৩০০ থেকে ৪০০ ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে ওই হাসপাতালগুলোতে। ফলে আগামী দিনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বেড়ে গেলে পরিস্থিতি করোনার চেয়েও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

 



সাতদিনের সেরা