kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

বাঘের মতোই বিক্রম

মাসুদ পারভেজ   

৭ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঘের মতোই বিক্রম

ছবি : মীর ফরিদ

কত কিছুই তো বদলাল অস্ট্রেলিয়া! কিন্তু সেসবের কিছুই পারল না তাদের ভাগ্য বদলাতে। কারণ মুস্তাফিজুর রহমান যে বদলালেন না!

বরং তাঁর ধারালো স্লোয়ার কাটার নিয়ে এই বাঁহাতি পেসার আরো বিষাক্ত। সেই বিষে আরো বেশি নীল অস্ট্রেলিয়া যথারীতি সেই হারের বৃত্তেই।

সেই বৃত্ত ভাঙার জন্য সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে একাদশে তিন-তিনটি পরিবর্তন এনেছিল ম্যাথু ওয়েডের দল। নেমেছিল নতুন ওপেনিং জুটি নিয়ে। এমনকি কৌশলও বদলেছিল। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ধীরগতির উইকেটে তারা বাংলাদেশের মতোই স্পিন দিয়ে বোলিংও শুরু করেছিল। এত বদলের দিনে পেসার নাথান এলিসও ইতিহাস গড়া বোলিং করে ফেললেন। প্রথম বোলার হিসেবে টি-টোয়েন্টি অভিষেকেই হ্যাটট্রিকের অনন্য কীর্তিও বাংলাদেশের ইতিহাস গড়া থামাতে পারল না।

পারল না মুস্তাফিজের আরেক দফা বোলিং চাতুরীর অনুপম প্রদর্শনীতে। তাঁর বলে লং লেগে শরীফুল ইসলাম ওপেনার বেন ম্যাকডারমটের ক্যাচ ফেললেন বলে ম্যাচে উইকেট বঞ্চিতই থেকে যেতে হলো পেসারের রূপ নিয়ে স্পিনারের মতোই বল বাঁক খাওয়ানোর কারিগরকে। কিন্তু উইকেট না পেলেও এমন বোলিং করলেন যে, জয় বঞ্চনার আরো তপ্ত আগুনেই পুড়তে হলো অস্ট্রেলিয়াকে।

অথচ বাংলাদেশকে মাত্র ১২৭ রানেই আটকে রাখতে পেরেছিল তারা। আগের দুটো ম্যাচও লো-স্কোরিংই ছিল। প্রথম ম্যাচে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো সফরকারীরা দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে উইকেট ধরে রাখতে রাখতেও শেষ দিকে তাল হারিয়েছিল। এবার সেই সমস্যা থেকেও মুক্ত। কিন্তু সেই মুক্তির আনন্দও শেষ পর্যন্ত বিষাদেই পরিণত। মুস্তাফিজ নামের রহস্যে আরেকবার হারিয়ে তারা ৪ উইকেটে করল মাত্র ১১৭ রান। ১০ রানের জয়ে তাই দুই ম্যাচ বাকি থাকতেই আরেক ইতিহাসের চৌকাঠ ডিঙালো মাহমুদ উল্লাহর দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যেকোনো সংস্করণেই প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়, পাঁচ ম্যাচের সিরিজের স্কোরলাইনও কী অবিশ্বাস্যই না দেখাচ্ছে, ৩-০!

একটি করে বল হয়ে যাচ্ছে, খেলছেন কিন্তু ব্যাটে-বলে করতে পারছেন না, ম্যাচের শেষাঙ্কে মুস্তাফিজের একেকটি ডেলভারির পর রাজ্যের অবিশ্বাস নিয়ে তাকাচ্ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ড্যান ক্রিশ্চিয়ান। এমন বিস্ময়মাখা দৃষ্টি এই ম্যাচ দেখেছে এর আগেও। নিজের প্রথম দুই ওভারে যে মাত্র ৪ রান দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ। তাঁকে আক্রমণে ফেরানো হলো এমন সময়, যখন জেতার জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরকার ২৪ বলে ৩৮ রান। মিচেল মার্শ ও অ্যালেক্স ক্যারির জুটি ওই ওভার থেকে তুলতে পারে মাত্র ৪ রান। সমীকরণটা তখন কঠিন হয় ১৮ বলে ৩৪ রানের!

মুস্তাফিজ তাঁর শেষ ওভার করতে আসার আগেই অবশ্য ক্যাচ ফেলার যথেষ্ট প্রায়শ্চিত্ত করা হয়ে গেছে শরীফুলের। ১৫তম ওভারে মোয়েজেস হেনরিক্সকে বিদায় করার পরও ছিলেন মার্শ। আগের দুই ম্যাচেই যিনি ৪৫ রান করে আউট হয়েছিলেন। এই ম্যাচে তাঁর সাধ্যসীমা বাড়ল, করলেন এই সিরিজে নিজের এবং দলের প্রথম ফিফটিও। মার্শ (৫১) যখন উইকেটে আছেন, তখন অস্ট্রেলিয়ার জেতার স্বপ্নও ভালোভাবেই টিকে ছিল। মুস্তাফিজের ৪ রান দেওয়া সেই ওভারের পর এসেই মার্শকেও তুলে নিলেন শরীফুল। কিন্তু টি-টোয়েন্টি ম্যাচে সময়ের দাবি মেনে ব্যাটসম্যানরা মারদাঙ্গা ব্যাটিংয়ে কত ম্যাচই তো জেতান। তাই বাংলাদেশ শিবিরও ঠিক সুস্থির হতে পারছিল না।

মার্শকে বিদায় করা ওভারেও তো ১১ রান খরচ করেছেন শরীফুল। ১২ বলে ২৩ রানের সমীকরণ মেলানোও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে অসম্ভব নয় বলে অস্ট্রেলিয়ার আশা তখনো আছে। কিন্তু আশার কফিন তৈরি করে পেরেকও ঠুকে দিলেন মুস্তাফিজ। ১৯তম ওভারে তাঁর প্রথম দুই বলে ১ রান নিয়ে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে গেলেন ক্যারি। স্ট্রাইক পাওয়া ক্রিশ্চিয়ানোর জন্য এরপর একের পর এক ধাঁধা। স্লোয়ারে স্লোয়ারে ব্যতিব্যস্ত এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাট চালান কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। না পারেন ব্যাটে-বলে ঠিকঠাক করতে, না পারেন রান তুলতে। ওভারের শেষ ৪ বলে তাই কোনো রানই ওঠে না। মুস্তাফিজের ৪ ওভার শেষ, কোনো উইকেট না থাকলেও খরচ মাত্র ৯ রান! এমন বোলিংয়ে ৬ বলে ২২ রানের প্রায় দুঃসাধ্য মনে হওয়া সমীকরণ দাঁড়ায় অস্ট্রেলিয়ার সামনে। দুঃসাধ্য এ জন্যই যে বাংলাদেশের ধীরগতির উইকেটে স্নায়ুচাপ সামলে ওই রান করা কঠিন ছিল ক্যারি ও ক্রিশ্চিয়ানের পক্ষে। ক্যারি তবু শেষ ওভারের প্রথম বলেই অফস্পিনার শেখ মেহেদী হাসানকে ছক্কা মেরে আশা জাগান। কিছু গোলমাল বাদ দিলে প্রবলভাবে ফিরে আসা বোলিংও অবশ্য করেন মেহেদী। তাতে উইকেট বাঁচিয়ে রেখেও হারের নিয়তিই লেখা হয় অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্যে।

অথচ দারুণ বোলিংয়ে সৌভাগ্য বয়ে আনা বাংলাদেশকে এদিন চেপে ধরেছিল অস্ট্রেলিয়াও। ১৬ রানে ২ উইকেট নেওয়া দুর্দান্ত বোলিং পেসার জশ হ্যাজলউডের। সেই সঙ্গে দুর্দান্ত দুটো থ্রোতে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি জয়ের দুই নায়ক আফিফ হোসেন ও নুরুল হাসানের রান আউটে বাংলাদেশের ইনিংস প্রত্যাশিত রূপও পায়নি। তবু যা পেয়েছে, অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর সংগ্রামী ইনিংস না হলে তা-ও হয় না। ৫২ বলে এই সিরিজের প্রথম ফিফটি করেছেন তিনি, যা বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের মন্থরতম ফিফটিও। তাতেও পুঁজি জেতার জন্য যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হওয়াতেই বোধহয় ম্যাচ সেরার পুরস্কারও উঠল বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের হাতে।

সিরিজ জেতানো হাতটি অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাঁর নয়। সেই কৃতিত্ব মুস্তাফিজের বাম হাতের। ধীরগতির উইকেটে তাঁর ধীরলয়ের বাঁক খাওয়ানো একেকটি ডেলিভারি আরো বিষাক্ত হয়ে ধেয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের দিকে। তাতে হারের হতাশায় বিলীন সফরকারীদের সামনেই বিজয়োৎসব বাংলাদেশের!



সাতদিনের সেরা