kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

‘জিরো টলারেন্সে’ সাফল্য মাদকবিরোধী অভিযানে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি ও র‌্যাব ডিজির নির্দেশনায় গতি

এস এম আজাদ   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




‘জিরো টলারেন্সে’ সাফল্য মাদকবিরোধী অভিযানে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে ক্রমেই গতি পেয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। গত ১২ বছরে আট লাখ ৩১ হাজার ১৩৩টি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৬৮ জনকে। অভিযানের সঙ্গে বেড়েছে মাদকদ্রব্য উদ্ধার, আসামি গ্রেপ্তার ও মামলার সংখ্যা। অভিযানের কারণে গাঢাকা দিয়েছে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা। অনেকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে, কেউ কেউ অভিযানে নিহত হয়েছে।

পুলিশ ও র‌্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশনায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ ও র‌্যাবের মহাপরিদর্শক (ডিজি) আবদুল্লাহ আল মামুন মাদকবিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের নির্দেশে সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিদিন ব্যাপক অভিযান চলছে। কারবারিরা নতুন কৌশলে নতুন ধরনের মাদকদ্রব্যের কারবার শুরু করলেও কঠোর নজরদারিতে তা ধরা পড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়ন, ডোপটেস্ট চালুসহ বেশ কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত থেকে মাদকদ্রব্য পাচার বন্ধ করতে যৌথ সভা, চিঠি বিনিময় এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তিসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে বর্তমান সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। বাংলাদেশে কোনো মাদকদ্রব্য উৎপন্ন হয় না। আশপাশের দেশ ও অন্যান্য মাদক উৎপাদনকারী দেশের উৎপাদিত মাদক পাচার হয়ে আমাদের দেশে আসে। অবৈধ মাদকপাচার রোধে আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। চুক্তি অনুযায়ী দেশ দুটির সঙ্গে আমরা নিয়মিত বৈঠক করছি। পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’

আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক সব ধরনের নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করেন। গত ২৬ জুন মাদকবিরোধী দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার জন্য কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করেন। বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে মাদক নিয়ে যে তোলপাড় হচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই জাতির পিতার চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে মাদকদ্রব্য প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের সুচিকিৎসা এবং তাদের পুনর্বাসন বিষয়েও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।’

গত বছরের ১৫ এপ্রিল পুলিশপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন সভা, আলোচনা ও নির্দেশনার বক্তব্যে ড. বেনজীর আহমেদ ‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে’ কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ২০১৮ সালে তিনি র‌্যাবের ডিজি থাকা অবস্থায় তাঁর নেতৃত্বেই ‘চলো যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগান নিয়ে বিশেষ অভিযান শুরু করে র‌্যাব। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, যোগদানের পরই পাঁচটি মূলনীতি ঘোষণা করেছেন আইজিপি। এর প্রথমটিই হলো দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। পুলিশ বাহিনীর কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও নেওয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশেরই অর্ধশতাধিক সদস্যকে চিহ্নিত করে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গত সোমবার জাতীয় শোক দিবসের নিরাপত্তাবিষয়ক এক নির্দেশনায় আইজিপি পুলিশের ইউনিটপ্রধানদের বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। মাদকের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতিসহ তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতিতে আমরা মাদকের জোগান বন্ধ করার কাজ করছি। একই সঙ্গে চাহিদা বন্ধ করতে হবে।’

মাদকবিরোধী অভিযানের গত ১২ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় সরকারের পদক্ষেপের প্রতিফলন দেখা গেছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও কোস্ট গার্ড ২০০৯ সাল থেকে সারা দেশে ও সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১২ বছরে সব সংস্থা মিলে মাদক আইনের আট লাখ ৩১ হাজার ১৩৩টি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৬৮ জনকে। এখন বছরে লাখো মামলা হচ্ছে। ২০০৯ সালে মাদকের ২৭ হাজার ৪৪১ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৩৪ হাজার ৩১৫ জন; ২০১০ সালে ২৯ হাজার ৬৬৪ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৩৭ হাজার ৫১০ জন; ২০১১ সালে ৩৭ হাজার ৩৯৫ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৪৭ হাজার ৪০৩ জন; ২০১২ সালে ৪৩ হাজার ৭১৮ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৫৪ হাজার ১০০ জন; ২০১৩ সালে ৪০ হাজার ২৫০ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৪৭ হাজার ৫৩১ জন; ২০১৪ সালে ৫১ হাজার ৮০১ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৬২ হাজার ৮০ জন; ২০১৫ সালে ৫৭ হাজার ১৩৪ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৭০ হাজার ১৫৯ জন; ২০১৬ সালে ৬৯ হাজার ৭৩৯ মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৮৭ হাজার ১৪ জন; ২০১৭ সালে এক লাখ ছয় হাজার ৫৪৬ মামলায় গ্রেপ্তার হয় এক লাখ ৩২ হাজার ৮৯৩ জন; ২০১৮ সালে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৭৮ মামলায় গ্রেপ্তার হয় এক লাখ ৬১ হাজার ৩২৩ জন; ২০১৯ সালে এক লাখ ২৪ হাজার ৯৮ মামলায় গ্রেপ্তার হয় এক লাখ ৬২ হাজার ৮৪৭ জন এবং ২০২০ সালে ৮৫ হাজার ৭১৮ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৩৪৩ জনকে। আর  চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৭৫১টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৯ হাজার ২৫০ জনকে।

মাদকদ্রব্য উদ্ধারের হিসাব মতে, গত ১২ বছরে ২৪ কোটি ৩১ লাখ ৭৪ হাজার ২৬১ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে পাঁচটি সংস্থা। ২০০৯ সালে এক লাখ ৩২ হাজার ২৮৭ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছিল। ২০১০ সালে উদ্ধারের পরিমাণ বেড়ে হয় আট লাখ ১২ হাজার ৭১৬ পিস; ২০১১ সালে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৩০১ পিস, ২০১২ সালে ২১ লাখ ৩৪ হাজার পিস, ২০১৩ সালে ২৮ লাখ ২১ হাজার ৫২৮ পিস, ২০১৪ সালে ৬৫ লাখ ১২ হাজার ৮৬৯ পিস, ২০১৫ সালে দুই কোটি এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৮১ পিস, ২০১৬ সালে দুই কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ১৭৮ পিস, ২০১৭ সালে চার কোটি ৭৯ হাজার ৪৪৩ পিস, ২০১৮ সালে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮ পিস, ২০১৯ সালে তিন কোটি চার লাখ ৪৬ হাজার ৩২৮ পিস এবং ২০২০ সালে তিন কোটি ৬৩ লাখ ৮১ হাজার ১৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। আর চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই জব্দ হয়েছে দুই কোটি এক লাখ ৭০ পিস। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ হচ্ছে।

পাঁচ সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১২ বছরে দুই হাজার ৭১৯ কেজি হেরোইন জব্দ হয়েছে। ২০২০ সালে ২১০ কেজি এবং চলতি বছরের পাঁচ মাসে ১৭৪ কেজি হেরোইন জব্দ হয়েছে। বছরে গড়ে সাত থেকে আট লাখ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার হচ্ছে। ২০২০ সালে ১০ লাখ সাত হাজার ৯৭৭ বোতল এবং চলতি বছরের পাঁচ মাসে তিন লাখ ২৮ হাজার ৬৩৬ বোতল ফেনসিডিল জব্দ হয়েছে। ১২ বছরে ২২ লাখ ১৮ হাজার ৮৩৯ বোতল ও ১১ হাজার ৮৩২ লিটার বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে দেশে আসা মাদক খাত, আইস এবং চলতি বছর এলএসডি, ডিএমটি ও ম্যাজিক মাশরুম জব্দ করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। কারবারিরা নতুন ধরনের এ মাদকের কারবার শুরু করলেই ধরা পড়ছে নজরদারিতে। 

র‌্যাবের ডিজি আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে আমরা কঠোর নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখছি। অনলাইনে বা নতুন কৌশলে—যেভাবেই কারবার হোক না কেন, আমরা সেদিকে গোয়েন্দা নজরদারি করছি। এ কারণে এলএসডিসহ নতুন আনা মাদকগুলোও ধরা পড়ছে। আমরা নতুন প্রযুক্তি ও কৌশলে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাব।’



সাতদিনের সেরা