kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

হুইপ সামশুলের টিকাকাণ্ড

তদন্ত কমিটি অনেক বিষয় এড়িয়ে গেছে

প্রতিবেদনে হুইপের নামও উচ্চারণ করা হয়নি

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তদন্ত কমিটি অনেক বিষয় এড়িয়ে গেছে

করোনার টিকা পেতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক ধরনের হাহাকার রয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া সরকার এখনো কাউকে টিকা দিচ্ছে না। সেখানে সিসি ক্যামেরা অচল করে চট্টগ্রামের পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরের ফ্রিজের মজুদ থেকে প্রায় তিন হাজার টিকা একটি ইউনিয়নে নিয়ে গিয়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে লোকজনকে দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার ঝড় বইছে। ওই ন্যক্কারজনক ঘটনার ছয় দিন পার হলেও গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে আইনগত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় নির্দেশদাতা ও জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

ঘটনা তদন্তে কমিটির প্রতিবেদন গত সোমবার রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে বলে কমিটির সদস্যরা জানান। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর নির্দেশে তাঁর বাড়ির পাশে অবৈধ কেন্দ্র বানিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি ছাড়া প্রায় তিন হাজার টিকা দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় আসেনি বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়।

অনেকে বলেছেন, হুইপ সামশুলের নির্দেশে তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. রবিউল হোসেনের নেতৃত্বে সরকারি ছয়জন কর্মচারী নিবন্ধন ছাড়াই অবৈধভাবে এসব টিকা দিলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কোনো সুপারিশ করা হয়নি প্রতিবেদনে। নির্দেশদাতা হিসেবে সামশুল হক চৌধুরীর নাম এলেও সে বিষয়টিও এড়িয়ে গেছে তদন্ত কমিটি। টিকা দিতে টাকা-পয়সা নেওয়ার বড় অভিযোগ উঠলেও তা নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। রবিউল তদন্ত কমিটির কাছে দুই হাজার ৬০০ টিকা দেওয়ার ব্যাপারে নিবন্ধনের যে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, সেগুলো ভুয়া প্রমাণিত হলেও কমিটি রবিউলসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেনি। সরকারি টিকা নিয়ে জঘন্য ঘটনার জন্ম দিলেও রবিউলসহ ছয় কর্মচারী এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানায়।

ঘটনাটি ঘটার পর চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ ব্যাপারে জানাবেন বলে গণমাধ্যমকর্মীদের বলে আসছিলেন। কিন্তু প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তা নিয়ে তিন তদন্ত কমিটির সদস্যরাসহ স্বাস্থ্য বিভাগের পটিয়া উপজেলা, চট্টগ্রাম জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা মুখ খুলছেন না। অনেকে বলছেন, প্রতিবেদনে অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, সে কারণে হয়তো মুখছেন না। আবার কেউ কেউ বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নির্দেশনা এসেছে প্রতিবেদন নিয়ে কাউকে কিছু না বলার জন্য।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, তদন্ত কমিটি গঠনের পরদিন গত রবিবার কমিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তারা ঘটনাস্থল হুইপ সামশুলের বাড়ির এলাকায় (যে দুটি কেন্দ্রে অবৈধভাবে টিকা দেওয়া হয়েছিল) যায়নি। এ কারণে টিকার গ্রহীতা, টিকা নিয়ে বাণিজ্যসহ অনেক অভিযোগের যথাযথ তথ্য প্রতিবেদনে আসেনি। টিকা নিয়ে যাওয়ার মূল হোতা মো. রবিউল হোসেন গণমাধ্যমে প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, হুইপের সম্মতি ও নির্দেশে সেখানে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে নির্দেশদাতার নাম-নিশানাও উল্লেখ করা হয়নি।

স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে সুরক্ষা অ্যাপ হ্যাক করে বিভিন্নজনকে (নিবন্ধনকৃতদের) টিকা গ্রহণের ভুয়া খুদে বার্তা পাঠানো হচ্ছে—এমন অভিযোগে তাত্ক্ষণিক চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নগরের পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ করোনার টিকা গায়েব হওয়ার ঘটনা ঘটলেও অদ্যাবধি জিডি কিংবা মামলা করা হয়নি।

পটিয়ায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোর থেকে কাউকে না জানিয়ে টিকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করার পর দ্রুত তারা প্রতিবেদনও দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। অধিদপ্তর আমলে নিলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব। অধিদপ্তর থেকে এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও যেতে পারে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন একটি গোপন বিষয়। কমিটি তাদের প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দিয়েছে। পটিয়ার বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।’

সিসি ক্যামেরা অচল করে কাউকে না জানিয়ে টিকা নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সব্যসাচী নাথ বলেন, ‘ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দেশনা দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এদিকে ওই ঘটনায় মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. রবিউল হোসেনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ছয় কর্মচারীকে শোকজ করা হয়েছিল। এর মধ্যে রবিউলসহ চারজন গতকাল জবাব দিয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডা. সব্যসাচী নাথ বলেন, ‘তাঁরা জবাবে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের চাকরিজীবনে এটা প্রথম ঘটনা। কর্তৃপক্ষের অনুমতি যে নিতে হয় তা তাঁরা জানতেন না। তাঁরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন। এটি এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

টিকা গায়েব হওয়ার ঘটনায় জিডি কিংবা মামলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পটিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম মজুমদার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি।’

তদন্ত কমিটির কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর তদন্তকাজ সম্পন্ন করেছেন। তিন পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণসহ আরো ৩৫ পৃষ্ঠা সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। এসব টিকা প্রদানে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না; টিকা প্রদানের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না এবং এর সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—মূলত এ তিনটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হয়। প্রতিবেদনে কমিটি কোনো সুপারিশ করেনি। তারা শুধু ওই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেছে।

রবিউল তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, তিনি দুই হাজার ৬০০ টিকা দিয়েছেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, এর বাইরে স্টোরে আরো ২৬৪ ডোজ টিকা নেই। গত ৩০ ও ৩১ জুলাই দুই দিন হুইপের বাড়ির পাশে রশিদাবাদে দুটি স্কুল ও কলেজে এসব টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম দিন শুরুতেই হুইপ অবৈধ এই টিকাকেন্দ্র পরিদর্শনও করেন। ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে হুইপ সামশুল নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। তবে তাঁর অনুসারী রবিউল গণমাধ্যমের কাছে বলেন, ‘মানুষ যখন টিকা দেওয়ার জন্য তাঁর কাছে আসছিল তখন তিনি বলেছেন—হুইপের কাছে গিয়ে বলেন। তিনি বললে ব্যবস্থা নেব। হুইপ মহোদয় সম্মতি দিলে আমি টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।’

রশিদাবাদে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে টিকা সংরক্ষণ, তাপমাত্রা মনিটরিং ও বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি।

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দেশে সরকার নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে কোথাও টিকা দেওয়ার নজির নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে সারা দেশে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ৭ আগস্ট। কিন্তু এর আট দিন আগে পটিয়ার রশিদাবাদ এলাকায় হুইপের বাড়িসংলগ্ন স্কুল ও কলেজে টিকাদান শুরুর ঘটনাটি ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রথম ও অবৈধ। হুইপ কিছুতেই এ দায় এড়াতে পারেন না।

শোভনদণ্ডীর রশিদাবাদ এলাকার লোকজন জানায়, গত শুক্রবার টিকা কার্যক্রম শুরুর আগে এলাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে এবং যেখানে টিকা দেওয়া হয় সেখানে ডিজিটাল ব্যানারের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। প্রচারপত্রে লেখা ছিল—‘হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এমপির একান্ত প্রচেষ্টায় এ টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’

 



সাতদিনের সেরা