kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

কোনো বাঙালি আমাকে গুলি করতে পারবে না

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কোনো বাঙালি আমাকে গুলি করতে পারবে না

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরে। আমি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর সেটি আরো নিবিড় হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেগুলো সব সময় রাজনৈতিক আলাপ ছিল না। আমার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি মন্তব্য করতেন। জানতে চাইতেন, কী কাজ করছি, কেমন করে করছি। হয়তো কখনো তিনিও নিজের কাজ সম্পর্কে বলতেন যে ‘সেলিম, আজ এ কাজটি করলাম’। আমিও কিছু বিষয় তাঁর সঙ্গে শেয়ার করতাম।

এমনই একটি বিষয়ে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কয়েক দিন আগে গণভবনে গিয়েছিলাম। এই মুহূর্তে সঠিক তারিখটি স্মরণ করতে পারছি না। তবে ওই দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হওয়া শেষ কথাগুলো এখনো স্পষ্ট মনে আছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাঙালিদের প্রতি তাঁর প্রবল আস্থা ও ভালোবাসা ছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন, ‘সেলিম, তোমার (অর্থাৎ সিপিবির) নেতারা আমার শারীরিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে এসেছিলেন। আমি মণিদাকে (কমরেড মণি সিংহকে) বলেছি, আমাকে নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন না। কোনো বাঙালি আমাকে গুলি করতে পারবে না। গুলি চালানোর আগে তার হাত কেঁপে যাবে।’

তাঁর সেদিনের এই কথা নিয়ে আমি পরে অনেক ভেবেছি। বঙ্গবন্ধু ‘বাঙালি’ বুঝতে পারলেও তিনি ‘শ্রেণি’ বুঝে উঠতে পারেননি। এর ফলেই ষড়যন্ত্রকারী ঘাতকরা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পেরেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত সেই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার বদলে দু-চারজন বাদে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্যই খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। ‘মুজিব হত্যার’ প্রতিবাদে সবচেয়ে আগে পথে নেমেছিলাম আমরাই। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকার রাজপথে প্রথম সংঘটিত মিছিলটি আমার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম সরাসরি দেখা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ৮ জুন জেলখানায়। আমি বয়সে ছিলাম তাঁর সন্তানতুল্য, একজন ছাত্র আন্দোলনের কর্মী মাত্র। আমি ভিন্ন দল করতাম। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সচেতন ছিলেন। আমি নিজেও সচেতন ছিলাম। এ কারণে কখনো সম্পর্কটা গুরু-শিষ্যের মতো ছিল না। আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ‘ছয় দফা ন্যায্য দাবি, কিন্তু বাঙালির মুক্তির সনদ নয়’। তাই ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা দাবিতে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে জনতার সঙ্গে থাকার জন্য আমাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল। সেই হরতালে পিকেটিং করতে গিয়ে আমি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলাম এবং আমার এক মাসের জেল হয়েছিল। পরের দিন যখন কয়েদিদের ‘কেস টেবিলে’ আমাদেরকে আনা হয়েছিল, তখন চোখে পড়েছিল যে ‘কেস টেবিলের’ চত্বরের পাশে ‘দেওয়ানি এলাকায়’ প্রবেশের দরজা খুলে ভেতর থেকে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা একজন মানুষ আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছেন। তখন আশপাশের হাজতিরা সমস্বরে বলে উঠেছিল, ‘ওই দেখ শেখ মুজিব আমাদের দেখতে এসেছেন’। এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুকে আমার প্রথম স্বচক্ষে দেখার ঘটনা।

স্বাধীন দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু ভুল-ত্রুটি যে কিছু করেননি তা নয়। কিন্তু তাঁর নিজের ও তাঁর দলের স্বাভাবিক ‘শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা’ সত্ত্বেও তিনি ছিলেন ‘জনগণের-মানুষ’। তাঁর ছিল মূল্যবান অনেক অভিজ্ঞতা ও গভীর দূরদৃষ্টি। একটি আলোচনার কথা আমার বিশেষভাবে মনে আছে। বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন, “মোশতাক (খন্দকার মোশতাক আহমেদ) সম্পর্কে সাবধানে থাকবা। ওর মাথার ভেতরে খালি প্যাঁচ। তাঁর মাথায় একটা তারকাঁটা ঢোকালে দেখবা ওইটা বাইর করার সময় ‘স্ক্রু’ হয়ে গেছে!” আমি বললাম, ‘আপনি তাহলে তাঁকে এত কাছে কাছে রাখেন কেন?’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কাছে কাছে রাখি যাতে শয়তানি না করতে পারে। চোখে চোখে রাখতে হয়। মোশতাক আমাকে কালকে কী বলেছে জান? বলেছে, এত সমাজতন্ত্র কইরো না, এত ধর্মনিরপেক্ষতা কইরো না। একটু আল্লাহ আল্লাহ করো, ব্যক্তি খাতকে গুরুত্ব দেও। ওকে আমি বলে দিছি, মোশতাক তোর কথা আমি শুনলাম না। আমার দেশের কৃষক-শ্রমিক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে, জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, আমি সমাজতন্ত্রের পথেই যাব, আমি ধর্মনিরপেক্ষতার পথেই যাব।’

এই মোশতাক গং এবং অন্যরা বঙ্গবন্ধুকে মক্তিযুদ্ধের পথ তথা চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে আপস এবং কনসেশন (সম্মতি) আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এ কথাটি বুঝেছিল যে, তাঁকে (বঙ্গবন্ধুকে) সম্পূর্ণভাবে ‘সরিয়ে দিতে’ না পারলে দেশকে সম্পূর্ণ এবাউট টান করিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল লক্ষ্য এবং কাঠামোর বাইরে নিয়ে আসা যাবে না। এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিধারাকে বহুলাংশে উল্টে দেওয়া হয়েছিল। আজও দেশ সেই প্রতিক্রিয়াশীল ‘উল্টো পথ’ ধরেই চলছে। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে উল্টে দিতে পারলেও তার সবটুকু অর্জন নিঃশেষ করা যায়নি। তার কারণ, মুক্তিযুদ্ধ যেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর কীর্তি, তেমনি তা প্রধানত ছিল জনগণের নির্মাণ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হলেও ঘাতকরা জনগণকে হত্যা করতে পারেনি। কারো পক্ষে সেটা করা কখনো সম্ভবও নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারা তথা চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পরিত্যক্ত হলেও তা নিরন্তর জাগ্রত রয়েছে কোটি মানুষের অন্তরে। ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ উত্তাল জোয়ার সে কথার সত্যতার প্রমাণ দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারার মৃত্যু নেই!

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

অনুলিখন : নিখিল ভদ্র