kalerkantho

শুক্রবার । ৬ কার্তিক ১৪২৮। ২২ অক্টোবর ২০২১। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

লংজাম্পার থেকে বিশ্বের দ্রুততম মানব

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লংজাম্পার থেকে বিশ্বের দ্রুততম মানব

অলিম্পিকের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের নতুন চ্যাম্পিয়ন ইতালির লামন্ত মার্সেল জ্যাকবস। ছবি : এএফপি

চার বছর পর পর সারা বিশ্ব একসঙ্গে ১০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য থমকে যায়, অলিম্পিকের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট এতটাই আকর্ষক। কিন্তু উসাইন বোল্ট তো অবসরে, অতটা আকর্ষক কি হবে? খুব হয়েছে। বরং নাটকীয়তায় এবারের স্প্রিন্ট যেন বোল্ট-যুগকেও পেছনে ফেলেছে। ২০০৮ সালে প্রথম অলিম্পিক সোনা জেতার পর ১০০ মিটারে অপ্রতিরোধ্য বোল্ট যে ট্র্যাকে নামতেন, সবাই ধরেই নিত তিনিই জিতবেন। হয়েছেও তা-ই। তাই টোকিও অলিম্পিকের এই ইভেন্ট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হয়েছে—কে জিতবেন বোল্টের মুকুট। অনেক নাম আলোচনায় এসেছে। তাই বলে লামন্ত মার্সেল জ্যাকবস হবেন বিশ্বের দ্রুততম মানব, যিনি কিনা আবার ইতালিয়ান! যেকোনো থ্রিলারের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে গতকাল অনুষ্ঠিত টোকিও অলিম্পিকের পুরুষদের ১০০ মিটার।

কোথা থেকে শুরু করা উচিত—নাটকীয়তার তোড়ে সেটা ঠিক করাই কঠিন। জ্যাকবসের আগে অলিম্পিক স্প্রিন্টে ইতালির জেতা একমাত্র পদকটি পিয়েত্রো মেনিয়ার, সেটিও ১৯৭২ সালে জেতা ব্রোঞ্জ। কিন্তু এই নামের কেউ ইতালিয়ান হয় কী করে? হয়। জ্যাকবসের মা নিখাদ ইতালিয়ান, বাবা টেক্সান। তবে জ্যাকবসের বয়স এক মাস না ছুঁতেই আমেরিকার বাবা চাকরির সূত্রে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি দিলে মা ফিরে যান ইতালিতে। তাই ভাষার দখল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জ্যাকবস লাজুক হেসে বলেন, ‘আমি ইংরেজি ভালো জানি না।’ এখন বান্ধবী নিয়ে রোমে থাকেন। তার মানে অভিবাসী কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ে মার্সেল জ্যাকবসের ইতালিয়ান আভিজাত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

১০ বছর বয়সেই স্প্রিন্টে ঝোঁক কিশোর জ্যাকসবের। কিন্তু অ্যাথলেটিকস জগতে তাঁর খ্যাতি আছে কিন্তু লং জাম্পে। ইতালির স্প্রিন্ট মুকুট জয়ের আগে কলেজজীবনে হাইজাম্পার জ্যাকবসের পরিচিতি ছিল। ১৯৯৪ সালে জন্মগ্রহণকারী এই ইতালিয়ান স্প্রিন্ট দুনিয়ায় প্রথম চিহ্ন আঁকেন ২০১৯ ওয়ার্ল্ড মিটে। তা-ও সেমিফাইনাল থেকেই ছিটকে গিয়েছিলেন। তবে ওটুকু অনুপ্রেরণার খোঁজেই যেন ছিলেন মার্সেল জ্যাকবস। ১৯৯২ অলিম্পিকে যুক্তরাজ্যের লিনফোর্ড ক্রিস্টির পর স্প্রিন্ট মানেই যুক্তরাষ্ট্র আর জ্যামাইকার জয়জয়কার, ইউরোপ অনেক পিছিয়ে। এতটাই পিছিয়ে যে হিটের পর সম্ভাবনার তালিকায় জ্যাকবের নামটা উঠেছিল স্রেফ ‘ইউরোপীয় কোটা’য়! এমনকি সেমিফাইনালে নিজের সেরা ৯.৯৫ সেকেন্ডে দৌড়ানোর পরও জ্যাকবসের ব্যাপারে কোনো উচ্চাশার কথা শোনা যায়নি।

কিন্তু এবারের অলিম্পিক স্প্রিন্টের দেয়াল লিখনটাই তো অদ্ভুত। ভাবা যায়, আট ফাইনালিস্টে কোনো জ্যামাইকানের ঠাঁই হয়নি! যে দুজনকে সম্ভাব্য ফেভারিট ধরা হয়েছিল সেই ব্রোমেল আর ইয়োহান ব্লেক ফাইনালেই উঠতে পারেননি। তবে এ বছর এই ইভেন্টে সেরা টাইমিং করা যুক্তরাষ্ট্রের রনি বেকার আছেন, রিও অলিম্পিকের ব্রোঞ্জজয়ী কানাডার আন্দ্রে ডি গ্রাস, নাইজেরিয়ার আদেগোকে ইনোচও দারুণ দৌড়েছেন ফাইনালে ওঠার পথে। তাই চূড়ান্ত মঞ্চে উঠেও জ্যাকবস আলোচনার পেছনের সারিতে।

কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ে আরো বেশি আকর্ষণ ১০০ মিটার স্প্রিন্টে একটা স্টেপই ব্যবধান গড়ে দেয়। প্রথমবার ফলস স্টার্ট করে বেরিয়ে যেতে হয় যুক্তরাজ্যের হার্নেল হিউজেসকে। পরেরবার পিস্তলের গুলি হতেই সবার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে জ্যাকবসকে আর কেউ পেছনে ফেলতে পারেনি। ৯.৮০ সেকেন্ডে ফিনিশিং লাইন পেরিয়েই উল্লাসে মেতে ওঠেন জ্যাকবস। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে ইতালির খুব সুনাম নেই। তবে ১০০ মিটার স্প্রিন্টের কিছুক্ষণ আগেই শেষ হওয়া পুরুষদের হাই জাম্পে যুগ্মভাবে সোনাজয়ী ইতালির জিয়ানমার্কো তামবেরি তখনো জাতীয় পতাকা জড়িয়ে ট্র্যাকের আরেক প্রান্তে। প্রথমবার দেশকে দ্রুততম মানবের খেতাব এনে দেওয়া মার্সেল জ্যাকবসকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই যেন অপেক্ষা করছিলেন তামবেরি।

দ্বিতীয় ব্যক্তির সেভাবে নজর পড়ে না। তবে ফ্রেড কার্লের রুপা জয়েও বিশেষত্ব আছে, ৪০০ মিটার বিশেষজ্ঞ যে তিনি। বেচারা ডি গ্রাস! রিও অলিম্পিকে টানা তৃতীয়বার অলিম্পিকের দ্রুততম মানব উসাইন বোল্ট নিজের পাশে বসা এই কানাডিয়ানের ঘাড়ে স্নেহের হাত রেখে বলেছিলেন, ‘আমার উত্তরাধিকার হওয়ার সামর্থ্য ওর আছে।’ কিন্তু বাজে শুরুর পর এবারও গ্রাসকে ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আনন্দ-বেদনার এমন অবিশ্বাস্য সব গল্প নিয়েই হাজির হয় অলিম্পিক।

লামন্ত মার্সেল জ্যাকবসের ১০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিক্রিয়াতেও তাই উচ্ছ্বাসের বাঁধভাঙা ঢেউ, ‘এটা অসাধারণ, এটা দুর্দান্ত, এটা যেন স্বপ্ন, ১০০ মিটারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন...আমি আর কিছু বলতে পারছি না!’ একটু নিঃশ্বাস নিয়ে অবশ্য আবার বলেছেন তিনি, ‘এটা সোনার মেডেল, সারাজীবনের জন্য। আমি খুবই খুশি।’ এই খুশির উপলক্ষ তৈরির পেছনে নীরবে ঘাম ঝরিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত মঞ্চে আরেক ইতালিয়ানই স্বপ্ন দেখিয়েছেন জ্যাকবসকে, ‘জিয়ানমার্কোকে সোনা জিততে দেখে দারুণ অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল ফাইনালের ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে সবটুকু মনোযোগ দিয়ে দৌড়টা শেষ করব।’ এরপর কি? ‘কী অসাধারণ দিন ইতালির জন্য। আমার মনে হয় আজ ইতালি ফুটবল দলের মতো আমরাও জমিয়ে পার্টি করব’, উৎসবে গা ভাসিয়ে দেওয়ার অনুমোদন পেতেও জ্যাকবসের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।



সাতদিনের সেরা