kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

কাল সকালে তাড়াতাড়ি আসো

তোয়াব খান

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাল সকালে তাড়াতাড়ি আসো

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকা কাজের সূত্রে। আমার ব্যক্তিগত পেশা তো সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার সত্যিকারের যে দর্শন, সেটাই আমি মেইনটেন করার চেষ্টা করেছি। আমার যেটা মনে হতো এবং এখনো মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কটা ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের।

তিনি তো শুধু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সবার। আরো ওপরে, তিনি জাতির পিতা। এ হিসেবে সবাই একটা ছত্রচ্ছায়া পেয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে গর্বের বিষয়, আমি তাঁর ছায়ায় থেকেছি।

বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অনেক আগে থেকেই দেখেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দেখা হয় স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্মীরা যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান, তখন।

প্রধানমন্ত্রীর ওখানে আমি যোগ দিয়েছি ১৯৭৩ সালের মে মাসে। এর আগে কিছু ঘটনা আছে। দৈনিক বাংলা থেকে চাকরি গেল আমার। আমাকে ওই সময় ইনফরমেশন মিনিস্ট্রি থেকে ওএসডি করা হলো। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখো, এখন নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত আছি। যদি নির্বাচনে জিততে পারি, তাহলে আমি প্রধানমন্ত্রী হব। যদি মেজরিটি না পাই, তাহলে আমি জাতির পিতা হিসেবে থাকব। তখন তুমি তোমার মতো কাজ কোরো। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে তোমাকে আমার কাছে আসতে হবে। আমার কিছু কাজ আছে, সেগুলো তোমাকে করে দিতে হবে।’

তারপর নির্বাচন হয়ে গেল। সাতটা আসন বাদে বঙ্গবন্ধুর দল ২৯৩টা আসনে জিতল। একদিন দুপুরে আমার মেয়েদের স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফিরেছি। আমার স্ত্রী বললেন, গণভবন থেকে দুইবার টেলিফোন করেছিল। তোমাকে এক্ষুনি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আমি যোগাযোগ করলাম। আমাকে যেতে বলা হলো। তখন দুপুর ২টা কিংবা আড়াইটা বাজে। গণভবনে গেলাম। বঙ্গবন্ধু তখন সবেমাত্র লাঞ্চ করেছেন।

তিনি বললেন, ‘কোথায় ছিলে তুমি? ইলেকশন হয়ে গেছে। এখন তো তোমাকে যোগ দিতে হবে। আমার কাজ করতে হবে।’ আমি কাজে যোগ দিলাম মে মাসে। তারপর বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, তিনি একটা আত্মজীবনী তৈরি করবেন। দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতা এই আত্মজীবনী তৈরি করেন, তখন এটা তাঁরা ডিকটেশন দিয়ে যান। এগুলো চেক করা। ট্রান্সক্রাইব করা। এডিট করা। এ সময় বঙ্গবন্ধু ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক পেয়েছেন। তিনি একটি বক্তৃতা দেবেন। আমাকে বললেন, ‘বক্তৃতা লিখে ফেলো।’ বক্তৃতা লিখে দিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘তুমি যদি আগে আসতে, তাহলে আমার অনেক কাজ বেঁচে যেত। ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতাম। তোমাকে এখানে নিয়ে আসার আগে ঘটনাগুলো যে ঘটল সেটাও ঘটত না।’

১৫ই আগস্ট আমি ছিলাম গণভবনের পাশে সরকারি বাসভবনে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ১৪ আগস্ট রাতের বেলা। ১৪ আগস্ট রাতের বেলা গণ্ডগোল হলো। হঠাৎ টেলিফোন এলো। একটা ভারতীয় হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সেটা ফেনীতে ক্র্যাশ করে। তখন রটে যায়, উইদাউট পারমিশনে সেটা যাচ্ছিল। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সেটাকে গুলি করে নামিয়েছে। এটা মিথ্যা কথা। হেলিকপ্টারটা দুর্ঘটনায় পড়েছে। তখন তো দেশে ইমার্জেন্সি চলছে। রেডিও-টেলিভিশন থেকে সবাই জানতে চাচ্ছে ঘটনাটা কী। আমি তখন চিন্তা করছি কাকে ধরা যায়। যেহেতু হেলিকপ্টার বিমানবাহিনীর। আমি প্রথমে আমার বন্ধু খাদেমুল বাশার, উপপ্রধান, বিমানবাহিনী; তাঁকে ফোন করলাম, জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই কিছু জানিস কি না।’ সে বলল, ‘এই ঘটনা।’ তারপর খন্দকার সাহেবকে ফোন করলাম। তখন তিনি বিমানবাহিনীর প্রধান। তিনিও বললেন, ‘ঘটনা এই। যেটা রটেছে সেটা ঘটনা না।’

তখন আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম। এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি বললেন, ‘আমি খবর পেয়েছি।’

এরই মধ্যে খবরের কাগজ থেকে এগুলো জানতে চাচ্ছে। টিভি জানতে চাচ্ছে এ নিউজটা আমরা দেব কি না।

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘নিউজ চাপা দিলে গুজব বাড়ে। গুজবকে মারতে হলে সত্যি ঘটনাটা জানানো উচিত। তুমি সত্যি ঘটনাটা দাও।’

আমাদের ওখানে তিনজন—মনোয়ার হোসেন, জয়েন্ট সেক্রেটারি; মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন; মসিউর রহমান, এখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা—এই তিনজন উচ্চতর পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাবেন। ১০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে তাঁদের জন্য একটা ডিনারের ব্যবস্থা করেছি ১৪ আগস্ট রাতের বেলা।

আমার মনে আছে, ডিনার থেকে ফিরে ১৪ আগস্ট রাতে আমি বসে কাজ করছিলাম। বঙ্গবন্ধু পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। বিশেষ কনভেনশনে বক্তব্য দেবেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওই বক্তব্য এক্সটেম্পোর দেবেন। কারণ বঙ্গবন্ধুর কতকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। যেমন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করেছিল। সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুকে একটা ডক্টরেট ডিগ্রি দেবে। আমাকে বললেন, ‘তোমার যে ডাটা ইনফরমেশন যোগ করার দরকার হয়, এটা মোটা কার্ড পেপারে লিখে আমাকে দেবে।’ তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, মোকাম্মেল সাহেব তখন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষাসচিব। তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটা কার্ডে বাসায় বসে লিখছি। রাত তখন প্রায় ১২টা হবে। হঠাৎ লাল টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু ফোন করলেন, ‘কাল সকালে তুমি তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে আসবা। আর কার্ড নিয়ে আসবা। মোটা মোটা অক্ষরে। আমি এক্সটেম্পোর বক্তৃতা করব। প্রয়োজনে এই কথাগুলো বলব।’ বললাম, আমি ওই কাজই করছি। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। কাল সকালে তাড়াতাড়ি আসো।’ এই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা।

পরদিন ভোর হয়েছে। সবাই যেমন শুনেছে। আমিও গোলার আওয়াজ শুনেছি। মর্টারের আওয়াজ শুনেছি। তারপর রেডিও অন করা হয়েছে। সব জায়গায় কান্নার রোল পড়েছে।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান সাংবাদিক। দৈনিক জনকণ্ঠ’র উপদেষ্টা সম্পাদক। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫-এর ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেসসচিব হিসেবে কাজ করেছেন