kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

জামিনে বেরিয়েই চেম্বারে ভুয়া ডাক্তার সালাউদ্দিন

‘হাজত খেটেছি সত্য তবে সব ঠিকঠাক করেছি’

সেরাজুল ইসলাম   

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জামিনে বেরিয়েই চেম্বারে ভুয়া ডাক্তার সালাউদ্দিন

হাতেনাতে ধরা খেয়েছিলেন র‌্যাবের হাতে, হাজত খেটেছেন ২৪ দিন। জামিনে বেরিয়ে এসে আবার ভুয়া ডাক্তারিতে নেমে পড়েছেন, তা-ও সেই আগের ঠিকানায়ই। ভুয়া ডেন্টাল অ্যান্ড ওরাল সার্জন মো. সালাউদ্দিন মজুমদারের চেম্বারের নাম ঢাকা ডেন্টাল। ঠিকানা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শ্যামপুর থানার ৪৪/১ করিমউল্লাহবাগ (ঢাকা কটন মিল স্কুলের বিপরীতে)। অবৈধভাবে বাহারি সব ডিগ্রি উল্লেখ করেছেন সাইনবোর্ড ও প্রেসক্রিপশনে। বিডিএএস (কলকাতা), ডিএম (ঢাকা) ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন, সিপিআর (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) দেখে সহজ-সরল মানুষ তাঁর ফাঁদে পড়ছে।

তাঁর পুরো চেম্বার নিয়েই রয়েছে ধোঁয়াশা। সাদিয়া ইসলাম নামের অপর এক নারী ডাক্তার রোগী দেখেন ঢাকা ডেন্টালে। তাঁর সনদও ভুয়া বলে মনে করেছে স্থানীয় লোকজন। সাইনবোর্ডে উল্লেখ রয়েছে ডা. রফিক আহমেদের নাম। ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রফিক আহমেদ অনেক আগেই মারা গেছেন; কিন্তু তাঁর নামও রয়েছে ঢাকা ডেন্টালের সাইনবোর্ডে।

সাইনবোর্ডে আরেকজন ডাক্তারের নাম রয়েছে—কাজী সোহরাব হোসেন সোহেল। মুখ ও দন্ত রোগ বিশেষজ্ঞ। জানা যায়, তাঁর কাগজপত্র বৈধ রয়েছে। নামের পাশের রেজিস্ট্রেশন নম্বরটিও যথার্থ। কিন্তু তাঁকে কোনো দিন এই চেম্বারে রোগী দেখতে দেখা যায়নি। আইনি জটিলতা এড়াতে ডাক্তার সোহেলের নাম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমনই সন্দেহ এলাকাবাসীর।

কুমিল্লার চান্দিনা থানার বেলাশ্বর গ্রামের শাহজাহান মজুমদারের সন্তান সালাউদ্দিন একসময় একজন দন্ত চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন একটি চেম্বারে। কয়েক বছর পর শ্যামপুর থানা এলাকায় ‘ঢাকা ডেন্টাল’ নামে চেম্বার দিয়ে বসেন। তাঁর ভুল চিকিৎসায় আয়েশা খাতুন (৭০) নামের এক বৃদ্ধা চরম বিপদাপন্ন হয়ে পড়েন। অসুস্থতা বেড়ে গেলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আয়েশা খাতুনের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-১০ কেরানীগঞ্জ ক্যাম্প ইনচার্জ গত ১ ফেব্রুয়ারি অভিযান পরিচালনা করেন। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন সালাউদ্দিন। এরপর তিনি কোনো প্রকার বৈধ ডিগ্রির কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হন। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের বিএমডিসির কোনো সদস্য নন বলেও স্বীকার করে সালাউদ্দিন বলেন, তিনি ভুয়া ডাক্তারি করে থাকেন। ওই দিনই তাঁকে শ্যামপুর থানার মাধ্যমে কোর্টে চালান করা হয়। অভিযোগ আনা হয় ভুয়া কাগজ তৈরির।

শ্যামপুর থানার এসআই আমিরুল ইসলাম আদালতে প্রেরণের সময় নোটে লিখেছেন, গ্রেপ্তারকৃত সালাউদ্দিন মজুমদার সাক্ষীদের সামনে বৈধ কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি। জিজ্ঞাসাবাদে কথিত ক্লিনিকে ভুয়া ডাক্তার সেজে নিজে এবং কিছু লোকের সহায়তায় প্রতারণার কথা স্বীকার করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, কোর্টে চালান হওয়ার পর থেকে মাস দুয়েক বন্ধ ছিল চেম্বার। জামিনে বেরিয়ে আবারও  একই কর্মে নেমে পড়েছেন। কথিত রয়েছে এবার শ্যামপুর থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেই নেমে পড়েছেন।

সালাউদ্দিন মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘র‌্যাব আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল, ২৪ দিন হাজত খেটেছি, এ কথা সত্য। আমি সব কিছু ঠিকঠাক করেই আবার চেম্বার চালু করেছি।’ মামলার অবস্থা জানতে চাইলে বলেন, ‘মামলা চলমান রয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা এখনো রিপোর্ট দাখিল করেনি।’ র‌্যাবের সামনে কাগজপত্র দাখিল করতে না পারা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওই সময়ে আমার স্ত্রী বাসায় ছিল না, বেড়াতে গিয়েছিল। তাই কাগজ দেখাতে পারিনি।’

তিনি দম্ভের সঙ্গে বলেন, ‘র‌্যাব যখন আটক করে, তখন আমার কাছে ইন্টার্নশিপের মূল কপিটি ছিল না। কলেজে তুলতে গিয়েছিলাম। স্যার আমাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, কী খবর সালাউদ্দিন, এত দিন পরে কী মনে করে। আসলে আমি কলেজে বেশ ফেমাস ছিলাম, যে কারণে স্যার আমাকে একনামেই চিনতেন।’ তাঁর সেই স্যারের নাম জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার চেম্বারে চলে আসেন, সেদিন স্যারকে ডেকে আনব, উনি সাক্ষ্য দেবেন। আপনাকে তাঁর নাম বলতে যাব কেন!’ এসএসসি ও এইচএসসি পাসের তথ্য দিলেও কোন কলেজ থেকে ডেন্টাল পাস করেছেন জানাতে অসম্মতি জানান। বলেন, ‘চেম্বারে চলে আসেন, যা প্রয়োজন হয় সব দেব।’ কথার এক ফাঁকে বলেন, তিনি এসএসসি ১৯৯৫ এবং এইচএসসি ১৯৯৮ সালে পাস করেছেন। ‘এইচএসসি ১৯৯৮ সালে কেন?’ এমন প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, ‘আমার এক বছর গ্যাপ ছিল।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্যামপুর থানার এসআই আমিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সালাউদ্দিনকে র‌্যাব আটক করেছিল। আমি মামলাটির তদন্ত করছি, তার কাছে কিছু কাগজপত্র চেয়েছিলাম। কিছু দিয়েছে, কিছু দেয়নি। সব কাগজ পেলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার বলেন বা ডেন্টিস বলেন, বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু তার কোনো নিবন্ধন নম্বর নেই। সে আমাকে দেখাতে পারেনি।’ তাঁর সঙ্গে আঁতাত করেই ফের চেম্বার খোলা হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। কিছুদিন আগে একবার তার চেম্বারে গিয়েছিলাম, সেখানে আরেকজন ডাক্তার রোগী দেখেন।’ ফোনে রোগী সেজে সালাউদ্দিনের সাক্ষাতের সময় নেওয়ার বিষয়ে তাঁকে অবগত করলে কিছুটা থতমত খেয়ে যান তদন্তকারী কর্মকর্তা।

জানা গেছে, হরহামেশাই ভুল চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সালাউদ্দিন মজুমদার গত শনিবার এক শিশুর দুধদাঁত তুলতে গিয়ে স্থায়ী দাঁত তুল ফেলেন। ওই ঘটনায় ৩১ জুলাই দুপুর সোয়া ১টায় স্বজনরা তাঁকে মারধরও করে। এ ছাড়া ঝর্ণা (২৬) নামের এক রোগীর প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ দেন। কিন্তু সঙ্গে এসিডিটির কোনো ওষুধ তিনি লেখেননি। এতে রোগীর বুকে ব্যথাসহ ভয়ংকর জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ মত রয়েছে। তিনি যে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছেন, সেটি সাধারণত সাত দিনের হলেও তিনি পাঁচ দিনের কথা লিখেছেন।