kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

আবারও প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ

বুঝেশুনে শ্রমিকদের ধোঁকা

এম সায়েম টিপু   

১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বুঝেশুনে শ্রমিকদের ধোঁকা

‘এতদ্দ্বারা এজেআই গ্রুপ ও এবি গ্রুপে কর্মরত সব কর্মকর্তা এবং শ্রমিক ভাই-বোনদের উদ্দেশে জানানো যাইতেছে যে আগামী ১ আগস্ট থেকে আমাদের ফ্যাক্টরি সম্পূর্ণভাবে খোলা থাকবে। তাই সবাইকে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হলো।’ সরকারের শর্ত উপেক্ষা করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য এই নোটিশ দিয়েছেন পোশাক মালিক ও অভিনেতা অনন্ত জলিল। তাঁর মতো দেশের আরো অনেক কারখানা মালিক ফোন করে, মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) দিয়ে পোশাক শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে ঢাকায় আসতে বলেছেন।

শিল্প-কারখানা খুলে দিতে ব্যবসায়ীদের আবেদনের পর সরকারের সঙ্গে তাঁদের আলোচনায় এমন নির্দেশনাই দেওয়া হয়েছিল যে ঈদের সময় যেসব শ্রমিক গ্রামে চলে গেছেন তাঁদের ছাড়াই কারখানা চালাতে হবে। কঠোর বিধি-নিষেধ শিথিল হলে তাঁরা কাজে যোগ দেবেন। সে জন্য তাঁদের যেন ছাঁটাই করা না হয়। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকেও বলা হয়, যাঁরা কর্মস্থলের আশপাশে অবস্থান করছেন তাঁদের দিয়ে কারখানা চালানো হবে। যাঁরা গ্রামে গেছেন তাঁদের এখনই আসতে হবে না। বিধি-নিষেধ শিথিল হলে তাঁরা কাজে যোগ দেবেন। তাঁদের চাকরি যাবে না। কিন্তু সরকার ও তৈরি পোশাক মালিকরা সে কথা রাখেননি।

সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহল বলছে, সরকারের সঙ্গে মালিকদের আলোচনায় শর্ত দেওয়া হয় যে সীমিত পরিসরে কারখানা চালু করা হবে। তাঁরা বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে শ্রমিকদের ফোন করে এবং খুদে বার্তা পাঠিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে কাজে যোগ দিতে। অন্যথায় তাঁদের কাজ থাকবে না। মুনাফার লোভে মালিকদের এমন চাতুরিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন শ্রমিকরা। উদ্যোক্তাদের কাছে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ প্রত্যাশিত নয় বলেও মনে করেন তাঁরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর আগেও গত বছর হঠাৎ করে শ্রমিকদের কর্মস্থলে আসতে বলায় ব্যাপক বিড়ম্বনার শিকার হন তাঁরা। এবার মালিকপক্ষ শর্ত ভঙ্গ করে শ্রমিকদের ধোঁকা দিয়েছে।

এর পরিণতিতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে পরামর্শকদের পক্ষ থেকে।

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে চলমান কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যে আজ রবিবার থেকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার। এতে শিল্পমালিকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও শ্রমিকরা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। কারণ গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে থাকা শ্রমিকরা রিকশা, মোটরসাইকেলের মতো স্বল্পগতির যানবাহনে ও হেঁটে রাজধানী, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কর্মস্থলে ফিরছেন।

এই বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার ও মালিক উভয়ই শ্রমিকদের বুঝে-শুনে ধোঁকা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, মালিক ও সরকার জানে পোশাক খাতে কাজের অর্ডার আছে। এ জন্য লোকেরও দরকার আছে। কিন্তু সেই পরিমাণ লোক ঢাকায় নেই। ঈদের ছুটিতে প্রায় এক কোটি লোক রাজধানী ছেড়েছে। এর বেশির ভাগই শ্রমিক। তাই কারখানা খোলার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল সরকারের। আর এটা সরকারের দায়িত্ব। কেননা সরকার কারখানা খুলে দিয়েছে।

অনন্ত জলিলের ওই পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনন্তর এই স্ট্যাটাসে ফাতেমা আক্তার নামের একজন মন্তব্য লিখেছেন, ‘সব সময় বলেন আপনি শ্রমিকবান্ধব—এই তার নমুনা? আপনার সিনেমায় যেমন ক্ষমতা থাকে, শ্রমিকদের তো তা নেই। একটাবার চিন্তা করলেন না, গণপরিবহন না চললে কিভাবে তারা ফিরবে? শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুন, নয়তো গণপরিবহন চালুর ব্যবস্থা করুন।’

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. ফারুক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, রপ্তানি খাত বলতে শুধু পোশাক কারখানাই নয়, অন্য কারখানাও আছে। তিনি বলেন, ‘আজ কারখানা খুলবে যারা স্থানীয় এবং কর্মস্থলের আশপাশে আছে বা এরই মধ্যে এসেছে, তাদের দিয়ে।’

ফারুক দাবি করেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানার কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে আজ রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সব গণপরিবহন চলাচল শিথিল করেছে সরকার। এ ছাড়া যাঁরা কর্মস্থলে যোগ দিতে পারবেন না তাঁদের চাকরি যাবে না বলে তিনি আবারও আশ্বস্ত করেন।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘শ্রমিকদের আমরা আগাম বার্তা দিয়ে রেখেছিলাম। এখন যারা আসছে তারা সবাই যে পোশাক খাতের কর্মী, তা নয়। এখানে অন্য রপ্তানি খাতের শ্রমিকও থাকতে পারে।’

তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে লকডাউনে শ্রমিকদের ছাঁটাই ও মজুরি কর্তন না করার নির্দেশনা দিলেও মালিকরা তা মানেননি।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার ও মালিকরা জানতেন আজ থেকে কারখানা খোলা থাকবে। তাই শ্রমিকদের পরিবহনের ব্যবস্থা করার দরকার ছিল। এ ছাড়া কাজে যোগ দেওয়ার আগে করোনা পরীক্ষা করা, কেউ আক্রান্ত হলে আইসোলেশনে রাখা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা—এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বনের দরকার ছিল। যদি কোনো শ্রমিক আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তাহলে তাদের সরকারের কর্মীদের মতো ক্ষতিপূরণ দেওয়াও উচিত। কিন্তু কোনোটাই আমলে নেওয়া হয়নি।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল সীমিত আকারে কারখানা খোলার। ফলে ছুটি দিয়ে জোর করে আবার কারখানায় নিয়ে আসা সরকারের সিদ্ধান্তের বরখেলাপ। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনগুলোর উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, যেন শ্রমিকদের জোর করে আসতে বাধ্য না করা হয়। একই সঙ্গে সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উচিত কারখানাগুলোকে নজরদারিতে নিয়ে আসা। এ ছাড়া বিধি-নিষেধের এই সময় কারখানা মালিকরা যাতে ৩০ শতাংশের বেশি শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালাতে না পারেন সেটাও নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে যেন শ্রমিকদের হেনস্তা ও তাঁদের মজুরি না কাটা হয়, সেটাও তদারকি করা।



সাতদিনের সেরা